শনিবার, ২১-এপ্রিল ২০১৮, ০১:৪৪ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • ভৈরব ও ঘোড়াশাল সেতুর টোল আদায়কারী নিয়োগে সওজের দুর্নীতি-জালিয়াতি
দুর্নীতির মামলার ঝুঁকিতে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি

ভৈরব ও ঘোড়াশাল সেতুর টোল আদায়কারী নিয়োগে সওজের দুর্নীতি-জালিয়াতি

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল, ২০১৮ ১২:৩৪ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য : সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) দুটি সেতুর টোল আদায়কারী নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও চরম জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। এজন্য ক্রয় আইন ও বিধিমালা পিপিএ/পিপিআর এর অপব্যাখা করে পরামর্শক নিয়োগে অনুসৃত ‘গুণগতমান ও ব্যয়-ভিত্তিক নির্বাচন’ (কোয়ালিটি এন্ড কস্ট বেইজড সিলেকশন- কিউসিবিএস) পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও কমিটির সদস্যরা পিপিআর অনুসরণে পৃথকভাবে প্রস্তাব মূল্যায়নের পরিবর্তে যোগসাজশের মাধ্যমে সর্বসম্মতভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ও অন্যদেরকে কম নম্বর দিয়েছেন।
সওজ যে পদ্ধতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ভৈরব) এবং শহীদ ময়েজউদ্দিন (ঘোড়াশাল) সেতুর টোল আদায়ের জন্য প্রস্তাব আহবান করেছে তা মূলত: দাতাসংস্থার অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগের পদ্ধতি। টোল আদায়ে অপ্রযোজ্য পিপিআর এর ১০৫ বিধির ‘কিউসিবিএস’ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও এ পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পিপিআর এর বিধি ১১৭(১১) তে এবং তফসিল-৩ এর ‘অংশ-ছ’ এর ফ্লো চার্ট অনুযায়ী আগেই এ কাজের বাস্তবসম্মত প্রাক্কলিত ব্যয় ও বাজেট তৈরি করা হয়নি। কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস লি: (সিএনএস) কে নিয়োগ দিতে কারিগরি মূল্যায়নে বেশি নম্বর দেয়ার জন্যই ‘কিউসিবিএস’ পদ্ধতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
এছাড়া টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠানকে বলা হচ্ছে ‘পরামর্শক’। টোল আদায়ে  ‘কনসেশন’ পদ্ধতি প্রযোজ্য হলেও পিপিএ/ পিপিআর -এ উš§ুক্ত দরপত্রের অধীনে টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা থাকায় ‘কনসেশন’ পদ্ধতি সওজের পছন্দ নয়। যদিও যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে তাদের মধ্য থেকে সর্বনিম্ম সার্ভিস চার্জ প্রস্তাবকারীকে টোল আদায়ে নিয়োগ দেয়াই নিয়ম। আগে এ নিয়ম অনুসরণ করা হলেও সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি ও জালিয়াতির সুবিধার্থে তথাকথিত ‘কিউসিবিএস’ এর অপকৌশল গ্রহণ করে আদায়কৃত টোল থেকে উচ্চতর শতকরা হারে সার্ভিস চার্জ দেয়া হচ্ছে। এটি সরকারের আর্থিক স্বার্থের পরিপন্থি। সরকারের বহু কোটি টাকা লোপাটের ব্যবস্থা করা হয়েছে. যা স্পষ্টতই দুর্নীতি।
নামে ‘কিউসিবিএস’ বা ‘গুণগতমান ও ব্যয়-ভিত্তিক নির্বাচন’ বলা হলেও সওজের ওয়েবসাইট ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে একে বলা হয়েছে ‘সিলেকশন ফর টাইম বেইজড কন্ট্রাক্ট’ (সময়-ভিত্তিক চুক্তির জন্য নির্বাচন)। অন্যদিকে ক্রয় আইন ও বিধিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা ‘সেন্ট্রাল প্রকিওরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট-সিপিটিইউ’ এর ওয়েবসাইটে সওজের যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে তাতে ‘গুণগতমান ও ব্যয়ভিত্তিক’ পরামর্শক নিয়োগ পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রয় আইনে ‘সময়-ভিত্তিক চুক্তির জন্য নির্বাচন’ বলে কিছু নেই এবং প্রতিটি ক্রয় পদ্ধতির জন্য ‘সিপিটিইউ’ এর নির্ধারিত (প্রমিত বা স্ট্যান্ডার্ড) দরপত্র বিজ্ঞপ্তি থাকলেও সওজ এ ক্ষেত্রে ‘কিউসিবিএস’ এর নির্ধারিত দরপত্র ফরমেট অনুসরণ করেনি। স্বার্থ-সংশ্লিষ্টরা নিজেরা লাভবান হতেই অপ্রযোজ্য ‘কিউসিবিএস’ পদ্ধতিতে উচ্চদরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু এবং কালীগঞ্জের শহীদ ময়েজউদ্দিন সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্ব পছন্দের প্রতিষ্ঠান সিএনএস-কে দিতেই এ ব্যবস্থা করেছে। পুরো প্রক্রিয়ায়ই পক্ষপাত ও জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা সওজ, মন্ত্রণালয় ও রিভিউ প্যানেল হয়ে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সিএনএস ৮/৯ বছর আগেই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে কব্জা করেছে। রেলওয়ের অনলাইনের টিকেটিং এর কাজটি সিএনএস প্রভাব বিস্তার করে নিয়েছিল। বিআরটিএ এর ভেহিকেল রেজিষ্ট্রেশন ও ড্রাইভার লাইসেন্স এবং ফি আদায়ের কাজ উচ্চদরে অনিয়মের মাধ্যমে সিএনএসকে দিতে সম্মত না হওয়ায় তদানীন্তন বিআরটিএ চেয়ারম্যান এহসানুল হককে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান এনে তাকে দিয়ে অনুমোদন করানো হয়। এর পর টোলের দিকে নজর দেয় সিএনএস। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে লালন শাহ সেতুর টোল আদায়ের প্রস্তাবে অংশ নিয়ে কারিগরি প্রস্তাবে ৪ প্রতিযোগীর মধ্যে ৩ নম্বর হয়। আর সর্বনি¤œ ১০.৪ শতাংশ দরের বিপরীতে ২৯ শতাংশ টোল চেয়ে সম্মিলিতভাবে চতুর্থ হয়। প্রতিযোগিতায় সুবিধা করতে না পেরে প্রভাব বিস্তার করে মোক্তারপুর সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্ব পায়। প্রতিযোগিতা ছাড়াই অবৈধভাবে উচ্চদরে ৩ বছর আগে প্রথমে মেঘনা-গোমতী সেতু, পরে ২ বছর আগে বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) প্রধান প্রকৌশলী সিএনএসকে আরও বেশি সময় বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায়ের কাজে বহাল রাখতে আহুত প্রস্তাবের মূল্যায়ন দীর্ঘদিনেও শেষ করছেনা বলে অভিযোগ উঠেছে।
সওজের নরসিংদী বিভাগের আওতায় শহীদ ময়েজউদ্দিন সেতু এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোল আদায়ে ‘পরামর্শক’ নিয়োগের জন্য পৃথক পৃথক ভাবে ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ‘আগ্রহ ব্যক্তকরণ অনুরোধ’ বা ‘এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেষ্ট- ইওআই’ আহবান করা হয়। ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে উভয় সেতুতেই ৭টি করে প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভূক্ত (শর্ট লিষ্ট) করা হয়। মূল্যায়নে আবেদনকারীদের মান অনুযায়ী সর্বোৎকৃষ্ট, অত্যুত্তম, উত্তম ও অনুত্তম- ৪ ভাগে বিভক্ত/ চিহ্নিত করার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে তা করা হয়নি। এমনকি যে ৫টি প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভূক্ত করা হয়নি তাদের নাম এবং বাদ পড়ার কারণও উল্লেখ করা হয়নি। এজন্য কোন মূল্যায়ন প্রতিবেদনই তৈরি করা হয়নি। এর পর ২০১৭ সালের ২৬ জুলাই শহীদ ময়েজউদ্দিন সেতু এবং ৭ সেপ্টেম্বর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর সংক্ষিপ্ত তালিকাভূক্ত ৭টি প্রতিষ্ঠানকে ‘রিকোয়েস্ট ফর প্রপজাল’ বা ‘আরএফপি’ ইস্যু করা হলে এরা প্রস্তাব জমা দেয়। কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়নে ৬টি প্রতিষ্ঠান ৭৫ ও তদুর্ধ নম্বর পাওয়ায় কারিগরিভাবে উত্তীর্ণ হয়। ১টি প্রতিষ্ঠান কম নম্বর পাওয়ায় অযোগ্য হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুতে উত্তীর্ণ ৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্ত নম্বর হচ্ছে: সিএনএস-৯৫.৭, এমএম বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লি:-৭৯.৭৪, বেস্ট ইস্টার্ন-আইএসওএল-৭৮.২৭৫, এনসিই-এটিটি জেভি-৭৭.৭১, জিএসআইসি-এসইএল জেভি-৭৭.৬৯ এবং ইউডিসি-জিআইইটিসি-ভান জেভি-৭৫.৯৯৫। শহীদ ময়েজউদ্দিন সেতুর কারিগরি মূল্যায়নে সিএনএস-কে আরও বেশি- ৯৬.৫ নম্বর দেয়া  হয়েছে। অন্য ৫টি প্রতিষ্ঠানকে নজরুল ইসলাম সেতুর মতই প্রায় একই নম্বর দেয়া হয়েছে।
গত বছরের ৬ ডিসেম্বর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ ৬টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাব খোলা হলে আদায়কৃত টোল থেকে এনইসি-এটিটি জেভি সর্বনি¤œ ৭.৭ শতাংশ এবং অন্য ৪টি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে ৭.৯৯, ৯.৩৬, ৯.৯৬ এবং ১৩.৩৯ শতাংশ সার্ভিস চার্জের প্রস্তাব করে। সিএনএস সর্বোচ্চ ১৭.৭৫ শতাংশ প্রস্তাব করে, যা সর্বনি¤œ প্রস্তাবের ২৩০ শতাংশ বেশি। ‘কিউসিবিএস’ পদ্ধতিতে একটি ফর্মূলায় কারিগরি এবং আর্থিক প্রস্তাবে সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ ৮৫.২৩৬ নম্বর পেয়ে সিএনএস প্রথম হয়। এমএম বিল্ডার্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ার্স ৮৩.০৬৬ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় এবং এনসিই-এটিটি ৮২.১৮৬ নম্বর পেয়ে তৃতীয় হয়েছে। সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া সিএনএসকে নেগোসিয়েশনে ডেকে ১৭.৭৫ শতাংশের স্থলে ১৬.৪৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে টোল আদায়কারী নিয়োগের প্রস্তাব গত ৭ ফেব্রুয়ারি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদনের সুপারিশ করে। সিএনএস এর সাথে সওজ’র ৫ বছরের জন্য টোল আদায়ের চুক্তি হয়েছে। তবে এর আগেই শহীদ ময়েজউদ্দিন সেতুতে কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ ৬টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাব খোলা হয়। এতেও এনইসি-এটিটি জেভি সর্বনিম্ন ৭.৭ শতাংশ এবং সিএনএস সর্বোচ্চ ১৭.৭৫ শতাংশ প্রস্তাব করে। অন্যরা নজরুল ইসলাম সেতুর হারেই প্রস্তাব করে। সম্মিলিত কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নে সিএনএস সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর অনুমোদনে সিএনএস এর সাথে সওজের টোল আদায় চুক্তি হয়েছে।
তবে এর আগেই দুটি সেতুর কারিগরি মূল্যায়নে ১শ’ নম্বরের মধ্যে সিএনএসকে ৯৫.৭/ ৯৭.৬ নম্বর এবং অন্যদেরকে ১৬ থেকে ২০ পর্যন্ত নম্বর কম দেয়ায় বাকি ৫টি প্রতিষ্ঠান অনিয়মের অভিযোগ করে পিপিআর অনুযায়ী সওজের কাছে পৃথক পৃথক ভাবে অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের টোল আদায়ের অভিজ্ঞতা সিএনএস এর চেয়ে দীর্ঘ। ইতিপূর্বে এরা ‘কিউসিবিএস’ পদ্ধতিতে বিভিন্ন সেতুর টোল আদায়কারী নিয়োগের প্রস্তাবে অংশ নিয়ে কারিগরি মূল্যায়নে অধিক নম্বর পেয়েছে। আগে কম নম্বর পাওয়া সিএনএসকে ঢাকা জোনের দুটি সেতুতে বেশি নম্বর দেয়ায় অন্যরা সবাই অভিযোগ করে। সওজ এসব অভিযোগ নাকচ করে দিলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের কাছে আপীল করে। আপীল নামঞ্জুর হওয়ায় দুটি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সিপিটিইউ এর রিভিউ প্যানেলে পৃথক পৃথক ৩টি আপীল করে।
নজরুল ইসলাম সেতুতে অনিয়মের বিষয়ে রিভিউ প্যানেলে বেষ্ট ইস্টার্ন যে অভিযোগ করেছে তার জবাবে সওজ জানায়, মূল্যায়ন কমিটির ৭ জন সদস্যই ৭টি সংক্ষিপ্ত তালিকাভূক্ত প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি মূল্যায়নে সর্বসম্মতভাবে অভিন্ন নম্বর দিয়েছেন। এম শামসুল হকের নেতৃত্বাধীন ৩ নং রিভিউ প্যানেলের রায়ে দেখা যায়, মূল্যায়ন কমিটির সর্বসম্মতভাবে নম্বর দেয়াকে রিভিউ প্যানেল বিধিসম্মত বিবেচনা করে আপীল নাকচ করে দিয়েছে। কিন্তু প্রস্তাব মূল্যায়ন সম্পর্কিত পিপিআর এর বিধি ১১৯(৮) তে বলা আছে:  “প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সকল সদস্য পৃথকভাবে প্রস্তাব মূল্যায়ন করবেন। অত:পর প্রত্যেক প্রস্তাবের অনুকূলে কমিটির সদস্যগণ কর্তৃক প্রদত্ত নম্বরের গড় নির্নয় করে প্রস্তাবের নম্বর নির্ধারণ করতে হবে।” ফলে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পারস্পরিক যোগসাজশে সর্বসম্মতভাবে একই ধরণের নম্বর প্রদানের সুযোগ নেই। মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরা যাতে প্রতিটি প্রস্তাবকে স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করে নিজস্ব বিবেচনায় নম্বর দিতে পারেন সে জন্যই পিপিআর-এ পৃথকভাবে মূল্যায়নের নিয়ম করা হয়েছে। অথচ রিভিউ প্যানেল মূল্যায়ন কমিটির সব সদস্যের সকল প্রতিষ্ঠানকে ‘সর্বসম্মতভাবে’ অভিন্ন নম্বর প্রদানকে সঠিক বলে মেনে নিয়েছেন, যা  পিপিআর এর বিধি ১১৯(৮) অনুযায়ী বৈধ হয়নি।
নজরুল ইসলাম এবং ময়েজউদ্দিন সেতুতে অনিয়মের বিষয়ে শামীম এন্টারপ্রাইজ রিভিউ প্যানেলে পৃথক দুটি আপীল আবেদন করে। শামীম এন্টারপ্রাইজের দাবি, সওজের ইতিপূর্বের অন্য ৪টি টোল আদায়ের দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়নে তারা বেশি নম্বর পেয়েছে। ওই সব দরপত্রের দুটিতে অংশ নেয়া সিএনএস কম নম্বর পেলেও এবার নজরুল ইসলাম সেতু এবং ময়েজউদ্দিন সেতুর কারিগরি মূল্যায়নে বেশি নম্বর পেয়েছে। জবাবে সওজের দাবি, বিভিন্ন দরপত্রে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হয় বলে নম্বর ভিন্ন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মূল্যায়ন পদ্ধতি ও নম্বর বন্টন প্রায় একই। এম শামসুল হকের নেতৃত্বাধীন ৩ নং রিভিউ প্যানেল এবং মুহাম্মদ এনামুল কবীরের নেতৃত্বাধীন রিভিউ প্যানেল-২ সওজের বক্তব্য সমর্থন করে আপীল দুটি নাকচ করে দেন। শামীম এন্টারপ্রাইজ এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রীট করেছে, যা শুনানীর অপেক্ষায় রয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু এবং শহীদ ময়েজউদ্দিন সেতুর টোল আদায়কারী নিয়োগের প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য ৭ সদস্যের যে অভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে সে কমিটির সদস্যরা ৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি প্রস্তাব পৃথক পৃথক ভাবে ১৩টি ক্যাটাগরি ও ৬২টি সাব-ক্যাটাগরিতে মূল্যায়ন করে যে নম্বর দিয়েছেন তা হুবহু একই। বিষয়টি বিস্ময়কর ও নজিরবিহীন। অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল্যায়ন কমিটির প্রধান এবং সদস্য সচিব মিলে কম্পিউটারে নম্বরশীট তৈরি করে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশের কথা বলে এতে কমিটির অন্য সদস্যদেরকে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করেছেন। আর এর ফলেই ৭ জন সদস্য প্রদত্ত ৭টি প্রতিষ্ঠানের নম্বর হুবহু একই হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটির কথিত সভার দিনে সওজ এর তেজগাঁওয়ের এলেন বাড়ি অফিসের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করলে কারিগরি প্রস্তাবে সিএনএস এর অনেক বেশি ৯৫.৭/ ৯৬.৫ শতাংশ নম্বর পাওয়া এবং সর্বনি¤œ দরের প্রায় আড়াই গুণ উচ্চদরে টোল আদায়ের কাজটি পাওয়ার রহস্য উদঘাটিত হবে।
উভয় সেতুতে টোল আদায়ে অংশগ্রহণকারীরা সব ধরনের ব্যয়ের হিসাব টাকার অংকে উল্লেখ করেছে। সিএনএস এর সাথে ১০ শতাংশ ‘মার্ক আপ’ বা মুনাফা যোগ করে আর্থিক প্রস্তাব দিয়েছে। অথচ নির্ধারিত অংকের পরিবর্তে এদেরকে শতকরা হারে আদায়কৃত টোলের একটি বড় অংশ দেয়া হচ্ছে, যা সরকারের আর্থিক স্বার্থের পরিপন্থি। পিপিআর এর বিধি ১১৭ এবং তফসিল- ৩ এর অংশ-ছ এর ফ্লো চার্ট অনুসরণ করে প্রাক্কলিত ব্যয় ও বাজেট তৈরি করা হলে এ কাজের প্রকৃত ব্যয়ের ধারণা পাওয়া যেত এবং এর চেয়ে বেশি টাকা দেয়ার সুযোগ থাকতো না। তাই সওজ এ ক্ষেত্রে ১০৫ বিধি অনুসরণ করেনি।
এদিকে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রেরিত সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সার-সংক্ষেপে সিএনএসএর প্রস্তাবে বর্তমানে দৈনিক ১০ লাখ ৮ হাজার ৫০০ টাকা টোল আদায়ের ভিত্তিতে আগামী ৫ বছরে ১৮৪ কোটি টাকা আয় হবে বলে দেখানো হয়েছে। এছাড়া বছরে ৬ শতাংশ হারে ৫ বছরে ৩০ শতাংশ টোলবৃদ্ধি বাবদ ৫৫ কোটি টাকাসহ মোট ২৩৯ কোটি টাকা আয় হবে বলেও উল্লেখ করেছে। কিন্তু ক্রয় কমিটিতে পাঠানো মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনুমোদিত সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সার-সংক্ষেপে সিএনএসকে টোল বাবদ ৫ বছরে আদায়কৃত ১৮৪ কোটি টাকার ১৬.৪৫ শতাংশ বাবদ ২৯ কোটি টাকার উর্র্ধে দিতে হবে বলে উল্লেখ করে সওজ কৌশলে এ বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। যদিও নিজেদের করা হিসাবেই সিএনএস ৩৯ কোটি টাকা পাবে বলে দেখিয়েছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেন হচ্ছে। সিলেট অঞ্চলে পর্যটন ও অর্থনৈতিক জোন স্থাপনসহ নানা কারণে আগামী ৫ বছরে ঢাকা-সিলেট-তামাবিল সড়কে যান চলাচল অনেক বাড়লে সেতুর টোল আয় আরো অনেক বেশি বাড়বে।
সেতুর টোল আদায়ের জন্য পরামর্শক নয়, সার্ভিস প্রোভাইডার বা সেবাদানকারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ‘কনসেশন’ নির্ধারিত/ প্রযোজ্য পদ্ধতি। সড়ক বিভাগের টোল আদায় নীতিমালা কনসেশন পদ্ধতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।  ওয়েববেইজড টোল আদায় পদ্ধতির সাথে সঙ্গতি রেখে টোল আদায় নীতিমালা হালনাগাদ করে নিলে উন্মুক্ত পদ্ধতিতেই টোল আদায়কারী নিয়োগ করা সম্ভব। কিন্তু সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় টোল আদায়ের জন্য পিপিআর ১০৫ এর আশ্রয় নিয়েছে। পরামর্শক নিয়োগের নিয়মে টোল আদায়কারী নিয়োগ কোন ভাবেই প্রযোজ্য নয়। শুধুমাত্র পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কারসাজির মাধ্যমে উচ্চদরে টোল আদায়ের কাজ দেয়ার জন্যই এটা করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। সরকারি তহবিলের টাকা পছন্দের প্রতিষ্ঠান সিএনএসকে প্রদানের অসৎ উদ্দেশ্যের কারণে বিষয়টিতে দুর্নীতির মামলা দায়েরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। আর মামলা হলে তাতে অনুমোদন-সংশ্লিষ্ট সকলেই আসামী হবেন। যেমনটা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় বেগম খালেদা জিয়া ও সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্য মন্ত্রীরা ‘খনি দুর্নীতি মামলা’র আসামী হয়েছেন।
গণখাতে ক্রয় আইন (পিপিএ) এবং গণখাতে ক্রয় বিধিতে (পিপিআর) টোল আদায়ের জন্য কনসেশন চুক্তি সম্পর্কিত বিধানের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পিপিএ এর ৬৬ ধারায় বলা আছে:
“৬৬। এই আইনের অন্য কোন বিধানে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সরকারী ও বেসরকারী যৌথ অর্থায়নে বা সম্পূর্ন বেসরকারী অর্থায়নে, নির্মাণ মালিকানা পরিচালনা;  নির্মাণ পরিচালনা হস্তান্তর; নির্মাণ মালিকানা পরিচালনা হস্তান্তরের মাধ্যমে জন-উপযোগমূলক এবং তৎসংশ্লিষ্ট সেবার সংস্থান বা পরিচালনার জন্য সরকার তৎকর্তৃক জারীকৃত নির্দেশনা এবং নমুনা চুক্তিপত্র অনুযায়ী কোন ব্যক্তির সাথে কনসেশন চুক্তি করিতে পারিবে।”
পিপিআর এর ১২৯ বিধিতে টোল আদায়ের জন্য কনসেশন চুক্তি সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট এ নির্দেশনা রয়েছে:
“১২৯। কনসেশন চুক্তি সম্পর্কিত বিধান। (১) এই বিধিমালার অন্য কোন বিধিতে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, জন-উপযোগমূলক এবং তৎসংশ্লিষ্ট সেবার সংস্থান বা পরিচালনার জন্য কোন ব্যক্তির সহিত সরকার, তৎকর্তৃক জারীকৃত নির্দেশনা এবং নমুনা চুক্তিপত্র অনুযায়ী, সরকারী ও বেসরকারী যৌথ অর্থায়নে বা সম্পূর্ণ বেসরকারী অর্থায়নে নির্মাণ মালিকানা পরিচালনা (Build Own Operate);; নির্মাণ পরিচালনা হস্তান্তর Build Operate Transfer নির্মাণ মালিকানা পরিচালনা হস্তান্তর Build Operate Transfer ধরনের বা অনুরূপ ধরনের কনসেশন চুক্তি করিতে পারিবে।
(২) নির্মাণ মালিকানা পরিচালনা, নির্মাণ পরিচালনা হস্তান্তর, নির্মাণ মালিকানা পরিচালনা হস্তান্তর চুক্তি বা অনুরূপ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ অধিকার বা সুবিধা ভোগকারী (concessionaire) বা উদ্যোক্তা ( (entrepreneur) †কে সাধারণত উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির অধীন নির্বাচন করিতে হইবে যাহা কতিপয় পর্যায়ে হইতে পারে এবং সর্বাধিক অনুকূল মূল্যায়ন নির্ণায়কের সমাবেশ (entrepreneur) † ঘটানোর লক্ষ্যে, যেমন প্রস্তাবিত অর্থ জোগানের ব্যয় ও ব্যাপকতা, প্রস্তাাবিত সুবিধা বা স্থাপনার কার্যসম্পাদন বিনির্দেশ ( performance specification of the facilities ), ব্যবহারকারী বা ক্রেতা কর্তৃক প্রদেয় মূল্য, প্রস্তাবিত সুবিধা বা স্থাপনা হইতে উদ্ভূত অন্যান্য আয় এবং সুবিধা বা স্থাপনার অবচয়ের ( depreciation ) মেয়াদ ইত্যাদি বিবেচনাযোগ্য হইবে।”
পিপিআর এর বিধি ১০৫ অনুযায়ী ‘কিউসিবিএস’ পদ্ধতিতে প্রস্তাব আহবান করা হলেও প্রস্তাব মূল্যায়নে ১১৯(৮) বিধির নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি বিধি  ১১৭ এবং তফসিল- ৩ এর অংশ-ছ এর ফ্লো চার্ট অনুসরণ করে প্রাক্কলিত ব্যয় ও বাজেট তৈরি করা হয়নি। এটা করা হলে টোল আদায় কাজের প্রকৃত ব্যয়ের ধারণা পাওয়া যেত এবং তাহলে সিএনএস-কে এত বেশি টাকা, সর্বনিম্ন দরের প্রায় আড়াইগুণ টাকা দেয়া যেত না। দেখা যাচ্ছে, নির্ধারিত অংকের পরিবর্তে উচ্চতর শতকরা হারে সিএনএস বেশি টাকা পাবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সওজের বিভিন্ন সেতুর টোল আদায়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের এ বিষয়গুলো ক্রয় আইন ও বিধিমালার আলোকে খতিয়ে দেখা উচিত। সওজের প্রকৌশলী, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব-মন্ত্রী এবং ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থে সিএনএস এর পক্ষে অবৈধ চাপ প্রয়োগের বিষয়টি সরকারের, বিশেষ করে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এবং কমিটির সহায়তাকারী কর্মকর্তা সচিববৃন্দসহ সংশ্লিষ্টদের স্বার্থে অবিলম্বে চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন। সিএনএস এর স্বার্থে যেভাবে একের পর এক দুর্নীতি, জালিয়াতি ও নিয়মনীতি ভঙ্গ হয়েছে তাতে এ বিষয়ে দুর্নীতির মামলা হওয়ার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে।
উল্লেখ্য, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম ইতিপূর্বে চিনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির ৫০ লাখ টাকা ঘুষ ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে দাবি করেন। যা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় বয়ে যায়। ঘুষ প্রদানের দায়ে চায়না হারবারকে কালো তালিকাভুক্ত করার ঘোষণাও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সেই সচিব নজরুল ইসলামের হাত দিয়েই ভৈরব ও ঘোড়াশাল সেতুর টোল আদায়ের ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি হতে চলেছে। সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত কমিটিতে তার স্বাক্ষরেই ঠিকাদার নিয়োগের সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে।
(সাপ্তাহকি শীর্ষকাগজে ১৯মার্চ ২০১৮ প্রকাশতি)