Shershanews24.com
গায়েবি মামলায় ব্যাপক বিতর্কে পুলিশ
সোমবার, ০৫ নভেম্বর ২০১৮ ০৭:২৮ অপরাহ্ন
Shershanews24.com

Shershanews24.com

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দেশজুড়ে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি বা কাল্পনিক মামলায় পুলিশি কর্মকা- ব্যাপক বিতর্কের মধ্যে পড়েছে। ঘটনায় জড়িত না থাকলেও সারাদেশে নাশকতা, হত্যাচেষ্টা, বিস্ফোরক বহনসহ গণহারে মামলার আসামি করা হচ্ছে বিরোধী নেতাকর্মীদের। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দমনের অংশ হিসেবে এসব মামলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে- নজিরবিহীনভাবে বিএনপির মৃত, গুরুতর অসুস্থ, কারাবন্দি, বিদেশ সফররত, হজে থাকা এমনকি প্রবাসে রয়েছেন এমন নেতাকর্মীদেরকেও ঢালাওভাবে এসব মামলার আসামি করা হয়েছে।  শুধু তাই নয় নাশকতার এমন অভিযোগ এনে মামলা দেয়া হচ্ছে যেসব ঘটনা আদতে ঘটেইনি। 
বিএনপি’র অভিযোগ, শুধুমাত্র সেপ্টেম্বর মাসেই দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সারাদেশে ৪ হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। যাতে অন্তত ৩ লাখ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। কাল্পনিক এসব মামলার ঘটনায় বিভিন্ন মহল থেকে পুলিশি কর্মকা- ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। এমনকি সর্বোচ্চ আদালত থেকেও পুলিশের এ ধরনের কর্মকা- নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আদালত বলেছেন, এ ধরনের মামলায় পুলিশের ইমেজ ও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে।
যদিও কাল্পনিক এসব মামলা তদন্তে স্বাধীন কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে করা এক রিটে বিভক্ত আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে আজগুবি ও ভুতুড়ে মামলা দেয়ায় পুলিশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পুলিশ সম্পর্কে জনগণের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। পুলিশ আস্থা ও বিশ্বাস হারাচ্ছে। এ ধরনের মামলার কথা স্বীকার করে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,  ভবিষ্যতে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা যেন আরও সতর্ক হন, সে ব্যাপারে সদর দফতর থেকে কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে। আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী মামলা করার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও দিয়েছেন। বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি এসএম রুহুল আমিন সাংবাদিকদের বলেন, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য পুলিশ সদর দফতর সচেষ্ট আছে। আইজিপির নির্দেশনার বরাত দিয়ে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, কয়েকটি মামলার ঘটনা ও আসামিদের নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি পুলিশ সদর দফতরের নজরে আসার পরই এ বিষয়ে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তবে বিএনপি বলছে, নির্বাচনের আগে বিরোধী নেতাকর্মীদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই এসব মামলা দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনে নেতাকর্মীরা যাতে মাঠে নামতে না পারে সেজন্যই পরিকল্পিতভাবে সরকারের নির্দেশে এই মামলাগুলো করা হয়েছে। এসব মামলা যেমন ভুয়া তেমনি বিভ্রান্তিকর তথ্যেও ভরপুর। গত সেপ্টেম্বরে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজধানীর ৫০টি থানাতেই কম-বেশি মামলা হয়েছে। একেকটি থানায় কমপক্ষে পাঁচটি ও সর্বোচ্চ ১০টি মামলাও হয়েছে। প্রতিটি মামলায় সর্বনি¤œ ৫০ জনের নাম এবং সর্বোচ্চ ৩০০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্য্যরে বিষয় হচ্ছে রাজধানীতে দায়ের করা এসব মামলায়, দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা তরিকুল ইসলামকে যেমন আসামি করা হয়েছে তেমনি ১০ বছর আগে মারা গেছেন এমন নেতাকর্মীরাও আসামি হয়েছেন। হাস্যকরভাবে গাড়িতে ঢিল ছোঁড়ার মতো ঘটনায় আসামি করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, সানাউল্লাহ মিয়ার মতো আইনজীবীদের। বিদেশ সফরে থাকাকালে মামলার আসামি হয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজগুবি মামলার আসামিদের তালিকা দিলো বিএনপি
ইতিমধ্যে কাল্পনিক বা গায়েবি এসব মামলায় যাদেরকে আসামি করা হয়েছে তাদের একটি তালিকাও প্রকাশ করেছে বিএনপি। ১৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই তালিকা প্রকাশ করে বলেন, “মৃত, অসুস্থ, বিদেশে অবস্থানরত ও হজে থাকা বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলার আসামিদের একটি তালিকা আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। এই যে অসুস্থ, মৃত ব্যক্তিদের লাশ, তারা কবর থেকে উঠে এসে বা হাসপাতালের বেড থেকে উঠে এসে পুলিশকে ঢিল মেরেছে তার একটি তালিকা আমরা দিচ্ছি। এই তালিকা দেখে হাসি-তামাশার খোরাক উৎপাদনকারী পুলিশের কর্মকা- স্পষ্ট হয়ে উঠবে।”
বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া আসামির তালিকায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের নাম রয়েছে। বিএনপি সরকারের এক সময়ের তথ্য ও পরিবেশমন্ত্রী তরিকুল দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতা ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। বর্তমানে তিনি অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাকে পল্টন, খিলগাঁও এবং মতিঝিল থানার একাধিক মামলায় আসামি করা হয়েছে। তালিকায় সিঙ্গাপুর ও ভারতে চিকিৎসার জন্য অবস্থানরত নেতাদের মধ্যে গাজীপুরের কাজী স্যায়েদুল আলম বাবুল, অ্যাডভোকেট মুনির হোসেন, শ্রীপুরের সিরাজ কাইয়া, বগুড়ার আবদুল খালেক, কুষ্টিয়ার অধ্যাপক হারুনুর রশীদ, দৌলতপুরের রেজাউল করীম, মীরপুরের ইব্রাহিম মালিথার নামও রয়েছে ‘গায়েবি’ মামলার আসামি হিসেবে।
এছাড়া ২০১৬ সালের মে মাসে মারা যাওয়া ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মো. আজিজুল্লাহ, ২০১৮ সালের ৩১ অগাস্ট মারা যাওয়া কামরাঙ্গীচরের সহসভাপতি নুরুল ইসলাম, ১১ বছর আগে মারা যাওয়া মিন্টু কুমার দাস, ২০১৪ সালে মারা যাওয়া কাফরুল থানার সাবেক সভাপতি আলী আজগর মাতব্বর, ১৯৯৮ সালের ৩১ জানুয়ারি মারা যাওয়া দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জের দাইয়ান মুন্সি, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে মারা যাওয়া কুষ্টিয়ার হরিনারায়ণপুর ওয়ার্ড সভাপতি আরব আলী, ২০১৬ সালে মারা যাওয়া কুষ্টিয়ার কুমারখালীর নেতা কাশেম শেখ, ২০০৪ সালে মারা যাওয়া ঝিনাইদহের নেতা শাহ জামাল, ২০১০ সালে মারা যাওয়া হবিগঞ্জের নেতা শামসুল হক, কামাল মিয়া প্রমুখও এসব ‘গায়েবি’ মামলার আসামি হয়েছেন।
আসামির তালিকায় হজ পালনে সৌদি আরব থাকা নেতাকর্মীদের নামও রয়েছে। এদের মধ্যে আছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের খতিবুর  রহমান, ফেনীর ছাগলনাইয়ার আজাদ হোসেন, বগুড়ার শাহজাহানপুরের খায়রুল বাশার, গাজীপুরের ভিপি ইব্রাহিম।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১ অক্টোবর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা যুবদল কর্মী মো. জাবেদের বিরুদ্ধে পাঁচদিন পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় তিনটি মামলা হয়েছে।
বিদেশে চাকরি করা কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার কাফরুলের সাব্বির আহমেদ জনি দেওয়ান ও বগুড়ার ধনুটের রুবেল হোসেন, যারা মালয়েশিয়ায় এবং গাবতলীর সাইফুল ইসলাম, যিনি সৌদি আরবে কর্মরত।
মৃত, হজে থাকা ব্যক্তিকেও ককটেল ছুড়তে দেখেছে পুলিশ!
রাজধানীর চকবাজার থানা বিএনপির আহ্বায়ক আজিজুল্লাহ মারা গেছেন ২০১৬ সালের মে মাসে। মৃত্যুর প্রায় ২৮ মাস পর তাকে একটি মামলার আসামি করেছে পুলিশ। প্রয়াত এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েছেন তিনি। এমনকি অন্য নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ককটেলের বিস্ফোরণও ঘটিয়েছেন। এই মামলার আরেক আসামি বিএনপির সমর্থক আব্দুল মান্নাফ ওরফে চাঁন মিয়া গত ৪ আগস্ট হজ করতে সৌদি আরবে যান। হজ শেষে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি দেশে ফেরেননি। অথচ চকবাজার মডেল থানা-পুলিশের করা এই মামলা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল আরও ভয়ংকর তথ্য। তাঁরা বলছেন, হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের যে কথা পুলিশ বলছে, সে রকম কিছু ওই দিন ঘটেইনি। প্রয়াত আব্দুল আজিজুল্লাহর বড় মেয়ে আফরোজা সুলতানা বলেন, পুলিশের এই মামলা হাস্যকর, দুঃখজনক। মামলায় পুলিশ বলেছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার বিচার ৫ সেপ্টেম্বর থেকে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে শুরু হয়। বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করতে এবং নৈরাজ্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিএনপির নেতাকর্মীরা বেলা ১১টার দিকে বেচারাম দেউড়ি আজগরি মঞ্জিলের (কারাগারের ফটক থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে) সামনে জড়ো হন। তারা সেখানে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পুলিশ বাধা দিলে নেতা-কর্মীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে মামলার বাদীসহ (চকবাজার থানার এসআই কামাল উদ্দিন) দুজন আহত হন। পুলিশ হামলাকারীদের আটক করতে গেলে তারা পরপর দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। এই মামলায় বিএনপির ৩৭ নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। আসামীদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রফিকুল ইসলামও। তিনি বলেন, ৫ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে বিভিন্ন গণমাধ্যমের শতাধিক সাংবাদিক খালেদা জিয়ার মামলার তথ্য সংগ্রহের জন্য উপস্থিত ছিলেন। সেদিন ওই রকম কোনো ঘটনা ঘটলে অবশ্যই তা গণমাধ্যমে আসত। পুলিশের এই আষাঢ়ে গল্প নিয়ে কথা হয় নাজিমুদ্দিন রোড এলাকার একটি চায়ের দোকানে বসা কয়েকজনের সঙ্গে। এরমধ্যে বয়স্ক এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ওরা মরা মানুষটাকে জিতা বানাইছে। হে নাকি ককটেল ফাটাইছে। এসবইতো ঘটতাছে। এতদিন জিতা মানুষ ধরছে, এখন মরা মানুষ ধরবো! হেরা সব পারে।’ নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নাম বইলা আমিও আসামি হব নাকি।’ এলাকার ১২ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরকম কোনো ঘটনা সেদিন ঘটেনি। তবে ঘটনা ঘটেছে সত্য দাবি করে চকবাজার থানার ওসি শামীমুর রশীদ তালুকদার বলেন, ৫ সেপ্টেম্বর বিএনপি নেতকার্মীরা জড়ো হয়েছিল। বেচারাম দেউড়ি আজগরি মঞ্জিলের সামনে তারা অবস্থান নেয়। এ সময় তারা মিছিলও করেছে। পুলিশ বাধা দিলে তারা পুলিশের ওপর হামলা করেছে। ককটেল ছুঁড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। মৃত ব্যক্তি আজিজুল্লাহ কীভাবে ককটেল ছুঁড়লেন জানতে চাইলে ওসি বলেন, এটা ভুল হয়েছে। আজিজুল নামে বিএনপির ওই এলাকার এক কর্মীকে আসামি করতে গিয়ে ভুলে আব্দুল আজিজুল্লাহর নাম, ঠিকানা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও চান মিয়ার বিষয়ে তিনি জানান, এটাও ভুল। তদন্ত প্রতিবেদনে সঠিক তথ্য দেয়া হবে। এই মামলার বাদী হয়েছেন চকবাজার থানার এসআই কামাল উদ্দিন। এজাহারের অভিযোগ অনুসারে সেদিন তিনি আহত হয়েছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জি, আহত হয়েছিলাম। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু কোথায় আঘাত পেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা ডাক্তার বলতে পারবে কোথায় আঘাত পেয়েছি। আমি বলতে পারব না। বলেই লাইন কেটে দেন তিনি। তার আগে মামলায় মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি চাকরি করি। সরকারি দায়িত্ব পালন করেছি। ভুল ক্রুটি হতে পারে এই মামলার মতোই চকবাজার থানায় ৩ সেপ্টেম্বর আরেকটি গায়েবি মামলা হয়েছে। এজাহারের বর্ণনা একই, শুধু ঘটনাস্থল এবং আসামিদের নাম ভিন্ন। এতে যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে, তা ১৪ আগস্ট রাতে। এই এজাহারেও বলা হয়েছে, বিএনপির মিছিল থেকে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছোড়া হয়। ককটেল বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচিকে ঘিরে ১৪ আগস্ট রাতে চকবাজারের বিভিন্ন পাড়ায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কাঙালিভোজের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে হইচই পড়ে যেত। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুর রহমানের বাসা এজাহারে উল্লেখিত ঘটনাস্থলের প্রায় ১০০ ফুট দূরে। পুলিশের ওপর হামলার বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ৫ সেপ্টেম্বর আজগরি মঞ্জিলের সামনে বিএনপির নেতা-কর্মীদের অবস্থান করতে তিনি দেখেননি। চকবাজার থানা বিএনপির নেতা-কর্মীরা কারাগারে গিয়ে নৈরাজ্য করবে, এমন শক্তি তাদের নেই। গত ৩ সেপ্টেম্বর করা মামলায় বিএনপির ৩৯ জন নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩১ জনকে আসামি করা হয়। ৪ নম্বর আসামি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক খতিবুর রহমান গত ১০ আগস্ট হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে যান। মামলায় ঘটনার যে তারিখ উল্লেখ রয়েছে সেদিন তিনি সৌদি আরবেই অবস্থান করছিলেন।
কামরাঙ্গীরচর থানা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি নূরুল ইসলাম গত ৩১ আগস্ট ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পাঁচ দিন পর ৫ সেপ্টেম্বর কামরাঙ্গীরচর থানায় তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। মামলার ৩১ নম্বর আসামি তিনি। পুলিশের করা এ মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওই আসামিসহ আরও কয়েকজন ৫ সেপ্টেম্বর রাতে কামরাঙ্গীরচরে রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। তারা ইট-পাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করে এবং লাঠিসোটা দিয়ে মেরে পুলিশকে আহত করেছে। পুলিশের মামলার নথি অনুযায়ী, নূরুল ইসলাম মৃত্যুর পাঁচ দিনের মাথায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছেন! 
কামরাঙ্গীরচর থানায় করা মামলাটির বাদী সেখানকার উপপরিদর্শক মাহফুজুর রহমান। মাহফুজুর এজাহারে উল্লেখ করেছেন, তিনি ৫ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টার দিকে দায়িত্ব পালনের সময় গোপনে জানতে পারেন, থানার ঝাউলাহাটি চৌরাস্তার সামনে বে-আইনিভাবে একত্রিত হয়ে আসামিরা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচারিক আদালত স্থানান্তরের প্রতিবাদে রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। থানা এলাকায় বসবাসরত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতির সৃষ্টি করেছে। রাত ৯টা ৫ মিনিটে সেখানে পৌঁছলে এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাত ১০ থেকে ১২ জন আসামি তাদের হাতে থাকা ইট-পাটকেল ও লাঠিসোটা পুলিশের দিকে হত্যার উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করে। এতে জখম হয় পুলিশরা। আসামিদের ধাওয়া দিলে তারা দুই থেকে তিনটি ককটেল নিক্ষেপ করে ও একটি ইজি বাইকে আগুন দিয়ে স্লোগান দিতে দিতে পালিয়ে যায়। এসআই মাহফুজুর রহমানের মামলার এজাহারে মৃত নূরুল ইসলাম ছাড়া আরও ৩১ আসামির নাম রয়েছে। 
এজাহারে তিনজন সাক্ষীর নাম-ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের দু’জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাক্ষী বলেন, তিনি একটি গাড়ি পুড়তে দেখেছেন। তবে কারা আগুন দিয়েছে, তা তিনি দেখেননি। তা তার জানাও নেই। লোকজন দেখে ঘটনাস্থলে দাঁড়ালে পুলিশ তার নাম জিজ্ঞেস করে এবং একটি কাগজে স্বাক্ষর নেয়। তিনি আসামিদের কাউকে চেনেন না। অপর এক সাক্ষী এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।
কামরাঙ্গীরচর থানা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন দাবি করেছেন, নূরুল ইসলামের মৃত্যুর পরও তাকে পুরনো মামলায় গ্রেফতারের জন্য থানার ওসির নেতৃত্বে এক দল পুলিশ বাসায় অভিযান চালায়। তিনি মারা গেছেন শুনে পুলিশ চলে যায়। এর পরও তাকে নতুন মামলায় আসামি করা হয়েছে। মৃত একজনকে আসামি করার ঘটনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, এটি মিথ্যা মামলা।
নাশকতায় এসেছিলো ৮২ বছরের হুইল চেয়ারধারীও!
৩ সেপ্টেম্বর ওয়ারী থানায় দায়ের করা এক মামলার এজাহারে বলা হয়, বাংলাদেশ বয়েজ ক্লাব মাঠে বিএনপিসহ অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা জমায়েত হয়ে ষড়যন্ত্র করছিলেন। এ মামলায় ৯৬ জনকে আসামী করে ওয়ারী থানা পুলিশ। এতে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত ৮২ বছর বয়স্ক লুৎফুল কবিরকে ৫১ নম্বর আসামি করা হয়। অথচ লুৎফুল অন্য কারো সাহায্য ছাড়া চলাফেরাই করতে পারেন না। ৫ সেপ্টেম্বর হুইল চেয়ারে করে তাকে হাইকোর্টে হাজির করলে চার্জশিট দাখিল না হওয়া পর্যন্ত আদালত তার জামিন দেন। ওই মামলায় ১৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা সাব্বির আহমেদ আরিফকে। তবে যে ঘটনায় মামলাটি হয়েছে তিনি সে সময় দেশেই ছিলেন না। ভারতে অবস্থান করেছেন।
বিএনপি সূত্র জানায়, কেবল রাজধানী নয়, গাজীপুর এবং হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের পক্ষ থেকে আজগুবি ঘটনায় মামলা করা হচ্ছে। এসব মামলায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মী এমনকি মৃত ব্যক্তিদের আসামি করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৃত, প্রবাসী ও হাজতিদের নামেও নাশকতার মামলা!
দলীয় কর্মসূচি পালনের সময় নাশকতার অভিযোগ এনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোটের ৩০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। এই মামলার আসামিদের মধ্যে মৃত ও দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকা ব্যক্তিরাও রয়েছেন। রয়েছেন এমন ব্যক্তিও যিনি আগে থেকেই কারাগারে আছেন।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর সরকারি কাজে বাধা প্রদান, হত্যা পরিকল্পনা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে মামলাটি করেন আশুগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুদীপ্ত রেজা জয়ন্ত। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি ও সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের স্থানীয় সোনারামপুরের রাস্তা অবরোধ করে যান চলাচলে বিঘœ ঘটায়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে জোটকর্মীরা পুলিশের ওপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।
মামলায় ২ নম্বর আসামি হিসেবে আশুগঞ্জের খড়িয়ালা গ্রামের মৃত মৌলভী হাসান আলীর ছেলে কাইয়ুম চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ কাইয়ুম ২০১৫ সালের ৯ আগস্ট মারা গেছেন।
কাইয়ুম মিয়ার স্ত্রী দিলরুবা বেগম বলেন, ‘তিন বছর আগে মৃত আমার স্বামীর নাম আসামির তালিকায় দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা মর্মাহত হয়েছি।’
১১ নম্বর আসামি করা হয়েছে চরলালপুর গ্রামের মলাই মিয়ার ছেলে আলীমকে। আলীম এক বছর ধরে সৌদি আরবে আছেন বলে জানিয়েছেন মলাই মিয়া। চরচারতলা গ্রামের মৃত কাদির মিয়ার ছেলে রুহুল আমিন অন্য একটি মামলায় তিন মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন। এই মামলায় ১৫ নম্বর আসামি হিসেবে রয়েছে তাঁর নাম।
মামলার ৪৭ নম্বর আসামি এনামুল হক ঘটনার দিন ও ওই সময়ে আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মস্থলে কর্মরত ছিলেন বলে কোম্পানি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এদিকে, ঘটনার দিন মামলার ৫৪ নম্বর আসামি উপজেলার লালপুরের হাফিজুর রহমান বাবুলের বাবা মারা যান। ওই সময় বাবার লাশ দাফন করা নিয়ে তিনি ব্যস্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া এজাহারে নাম না থাকলেও পুলিশ মাওলানা শফিউল আলম ফরিদ নামের এক মাদ্রাসা শিক্ষককে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলহাজতে পাঠায়। যদিও ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে শফিউল মাদ্রাসায় কর্মরত ছিলেন বলে মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ জানিয়েছেন। মামলার এজাহারে থাকা ১৬ সেপ্টেম্বর বিএনপির কোনো কর্মসূচিই ছিল না বলে জানিয়েছেন মামলার এক নম্বর আসামি আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু আসিফ আহমেদ। চেয়ারম্যান জানান, মামলায় উল্লেখিত তারিখ ও সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা সমন্বয় কমিটির সভায় ছিলেন তিনি। এ দিন আশুগঞ্জে বিএনপি কিংবা ২০ দলীয় জোটের কোনো কর্মসূচিই ছিল না। আশুগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাদেকুল ইসলাম সাচ্চু বলেন, ‘মামলায় উল্লেখিত ঘটনার দিন ও সময়ে আশুগঞ্জে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না। মহাসড়ক অবরোধের মতো কোনো কর্মসূচি থাকলে স্থানীয় ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা অবশ্যই জানতেন।’ এমনকি মহাসড়কের পাশের এলাকার বাসিন্দারাও জানান যে ওইদিন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ এলাকায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
যে রাতে ১১ বছর আগের মৃত ব্যক্তি আটকে দিয়েছিলো রাজপথ!
মিন্টু কুমার দাস। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে রাজারবাগ ইউনিট বিএনপির সভাপতি ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক ছিলেন। ১১ বছর আগে ২০০৭ সালের ২৩শে জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিডনি রোগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। সে অনুযায়ী মৃত্যু সনদও নিয়েছে পরিবার। তবে পল্টন থানা পুলিশের দায়ের করা মামলায় তিনি এখনও জীবিত। গত ১১ই সেপ্টেম্বর তিনি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সড়ক অবরোধ করছিলেন বলে নতুন এ মামলায় বলা হয়। এ সময় যানবাহন চলাচলে বাধা দেয়ার অভিযোগে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে মিন্টু দাসকেও আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় তার ভাই পিন্টু দাসও আসামি। পুলিশের এজাহারে মিন্টু কুমার দাসের ঠিকানায় উল্লেখ করা হয়েছে- তার বাবার নাম বিনোদ কুমার দাস। ১২, শাহপরান ভিলা, চামেলিবাগ, শান্তিনগর, থানা-পল্টন, ঢাকা। তবে সেই বাসায় গিয়ে পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশীরা জানান, প্রায় ১২ বছর আগে তারা ওই বাসায় থাকতেন। পরে যোগাযোগ করা হয় মিন্টু কুমার দাসের ভাই পিন্টু কুমার দাসের সঙ্গে। পিন্টু কুমার দাস বলেন, ওই মামলায় আমি ২০ নম্বর আসামি। আর ভাই মিন্টু কুমার দাস ২৬ নম্বর আসামি। আমরা ঢাকায় স্থানীয়। ২০০৭ সালের ২৩শে জুলাই সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আমার ভাই ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি হেপাটাইটিস বি ও কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ওই সময় তিনি রাজারবাগ ইউনিট বিএনপির সভাপতি ও তৎকালীন ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক ছিলেন। বিয়ের আগেই তিনি মারা যান। অথচ পল্টন থানার এসআই জাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে গত ১১ই সেপ্টেম্বর এ উদ্ভট মামলাটি করেন। মামলা নম্বর-২৩। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ১১ই সেপ্টেম্বর রাত ৮টা ১৫ মিনিটে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকে। এ সময় তারা সড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এই ঘটনায় পল্টন মোড়, দৈনিক বাংলা এবং এর আশপাশ এলাকায় যানজট ছড়িয়ে পড়ে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সড়কে আটকা পড়ে হাজার হাজার গাড়ি। সড়ক অবরোধের কারণে ওই এলাকার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই হেঁটে গন্তব্যস্থলে রওনা দেয়। এজাহারে বলা হয়েছে, পল্টন থানার এসআই জাহিদুল ইসলাম ওয়াকিটকির মাধ্যমে খবর পেয়ে কয়েকজন কনস্টেবলকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। এ সময় বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
মিন্টু কুমার দাস ও পিন্টু কুমার দাস ছাড়াও ওই মামলার এজাহারে আসামির তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, দীর্ঘ দিন ধরে যিনি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবদুর রেজাক খান, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাৎ, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জনশক্তি উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক এমএ মালেকসহ মোট ৫৫ জন। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞতনামা আসামিও করা হয়েছে।  মামলা দায়েরের পর এজাহারে উল্লিখিত এলাকায় কয়েক দফা অবস্থান করে বিভিন্ন জনের কথা বলে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি। ওই এলাকার কেউ সেদিনের অবরোধের কোনো তথ্য দিতে পারেননি। সড়কের দুই পাশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ওই দিন স্বাভাবিক ছিল এলাকার পরিস্থিতি। 
মৃত্যুর ৯ মাস পর দলবল নিয়ে ট্রেনে আগুন!
যশোরের চাঁড়চা গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন মারা গেছেন ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর। মৃত্যুর নয় মাস পর তিনি ‘গায়েবি মামলা’র আসামি হলেন। মামলার এজাহারে পুলিশ বলেছে, জাহাঙ্গীর দলবল নিয়ে ট্রেনের বগিতে আগুন দিয়েছেন, রেললাইনও উপড়ে ফেলেছেন। মজিবুল এলাহীর বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলার মোবারকপুর গ্রামে। চার বছর ধরে তিনি বিদেশে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি পুলিশের ওপর ককটেল ছুড়ে মেরেছেন। এই অভিযোগে গত ৩০ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা ঠুকেছে। শুধু জাহাঙ্গীর বা মজিবুলই নন, গত সেপ্টেম্বর থেকে যশোরের ৯টি থানায় এমন ৩৮টি গায়েবি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় বিএনপির ৭০০ নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ২০০ জনকে। যশোরে যে ৩৮টি গায়েবি মামলা হয়েছে, তার পাঁচটি মামলার আসামিরা ৮ অক্টোবর হাইকোর্টে আসেন আগাম জামিন নিতে। তাঁদের মধ্যে ১৮ শিক্ষকসহ ১১৭ জন আগাম জামিন পেয়েছেন। জামিন পাওয়া শিক্ষকেরা বলেছেন, তাঁরা কেউই ঘটনার ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। যশোরের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পুলিশের ভয়ে নেতা-কর্মীরা বাড়িতে ঘুমাতে পারছেন না। গায়েবি মামলার আসামি ধরতে পুলিশ প্রায় প্রতিদিনই বাড়ি বাড়ি অভিযান চালাচ্ছে। ৩ অক্টোবর এ ব্যাপারে যশোর জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে বিএনপি। একটি গায়েবি মামলার বিবরণে বলা হয়, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে যশোর শহরের রেল সড়ক আশ্রম মোড় এলাকা থেকে নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগে আটটি হাতবোমাসহ ইসমাইল হোসেনকে আটক করে পুলিশ। পরে কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক খবির হোসেন বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাবেরুল হক, যুগ্ম সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ, শহর বিএনপির সভাপতি ও যশোর পৌরসভার সাবেক মেয়র মারুফুল ইসলামকে আসামি করা হয়। তাঁদের সঙ্গে আসামি করা হয় ঘটনার ৯ মাস আগে মারা যাওয়া যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামের লতিফ মোল্লার ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেনকে। জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর হোসেনের ভাই চাঁচড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোজাহার আলী বলেন, ‘আমার ভাই জাহাঙ্গীর ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর হৃদরোগে মারা যান।’
আরেক গায়েবী মামলার বিবরণে বলা হয়, গত ৩০ আগস্ট নাশকতা পরিকল্পনার জন্য যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পদ্মপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীরা সমবেত হন। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সবাই পালিয়ে যান। এ অভিযোগে ঝিকরগাছা থানার উপপরিদর্শক কামরুজ্জামান জিয়া বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ৩৭ জনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলায় উপজেলার মোবারকপুর গ্রামের গ্রিন বিশ্বাসের ছেলে মো. মজিবুল এলাহীকে আসামি করা হয়। অথচ মজিবুল এলাহী চার বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।
গত ১ সেপ্টেম্বর একই থানায় এসআই আশরাফুল ইসলামের করা নাশকতা পরিকল্পনার আরেক মামলায় ঝিকরগাছা উপজেলার হাড়িয়া গ্রামের নিজাম উদ্দীনের ছেলে মো. বাবলুকে আসামি করা হয়েছে। বাবলু ঘটনার সময় ওমরাহ হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে ছিলেন। একই ধারায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর বেনাপোল বন্দর থানায় করা মামলায় বেনাপোল পৌর বিএনপির সহসভাপতি হাবিবুর রহমানকে আসামি করা হয়। তিনিও ওমরাহ হজ করতে দেশের বাইরে ছিলেন। বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে গত ৮ সেপ্টেম্বর শার্শা থানায় করা মামলায় আসামি করা হয় মো. সারোয়ার হোসেনকে। তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন। ঢাকার বিভিন্ন থানা ছাড়াও কুমিল্লার মুরাদনগর, ফেনীর ছাগলনাইয়া এবং গাজীপুরের পৃথক দুটি থানায় পুলিশের করা মামলায় এমন ভুতুড়ে আসামির সন্ধান মিলেছে।
স্বজন ও বিএনপি দলীয় সূত্র বলছে, কুমিল্লার মুরাদনগরের আহাদ খলিফা থাকেন বাহরাইনে। গত বছরের অক্টোবরে তিনি সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি বাহরাইনে ফিরে যান তিনি। তবে গত ৮ সেপ্টেম্বর মুরাদনগর থানায় ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের পরিকল্পনার অভিযোগে পুলিশের দায়ের মামলায় ৩৩ আসামির মধ্যে তিনিও একজন!
গত ১ সেপ্টেম্বর ফেনীর ছাগলনাইয়া থানায় পুলিশ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আজাদ হোসেন। কিন্তু তিনি হজ পালনের জন্য ১৮ জুলাই হজে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন ৪ সেপ্টেম্বর। আজাদ হোসেন সৌদি আরবে অবস্থানের কাগজ দেখিয়ে বলেন, হজ শেষে দেশে ফিরে জানতে পারেন- তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে!
মৃত্যুর ২০ বছর পর পুলিশের ওপর হামলা!
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকার বাসিন্দা দাইয়ান মুন্সি মারা গেছেন ১৯৯৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। মৃত্যুর ২০ বছর পর পুলিশের ওপর হামলা, ঢিল  ছোঁড়া ও সরকারি কাজে বাধার অভিযোগে তাকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি এই মামলা হয়েছে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ দাইয়ানের পরিবার বলছে, তার এক ছেলে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে তার মৃত বাবাকেও রেহাই দেয়া হয়নি।
মৃত্যুর পরেও একসঙ্গে হামলা চালিয়ে ছিলেন দুই বিএনপি কর্মী!
হবিগঞ্জের শামছুল হক ক্যানসারে মারা গেছেন-২০১০ সালের মার্চে। একই এলাকার কামাল মিয়া বছর দুয়েক আগে নরসিংদীতে ডাকাতদের হাতে নিহত হন। কিন্তু তাঁরা এখন পুলিশের করা গায়েবি মামলার আসামি। তাঁরা নাকি গত ২৮ সেপ্টেম্বর পুলিশের ওপর হামলা করেছেন। হবিগঞ্জ মডেল থানায় এমন অভিযোগই আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
আছেন বিদেশে, গাড়ি ভেঙেছেন গাজীপুরে!
গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম ছেলের চিকিৎসার জন্য ১০ সেপ্টেম্বর সকাল আটটায় সিঙ্গাপুরে যান। ওই দিন বেলা ১১টায় জেলা শহরে বিএনপির মানববন্ধনে লাঠিপেটা করে পুলিশ। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যানবাহন ভাঙচুরের অভিযোগে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে রাতে মামলা করে পুলিশ। সেই মামলায় সিঙ্গাপুরে যাওয়া ওই নেতাকেও আসামি করা হয়। একই জেলার শ্রীপুর থানায় গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে নাশকতার অভিযোগে বিএনপির ৪৮ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ ও গাড়ি পোড়ানোর মামলা করে পুলিশ। ওই মামলার ১৭ নম্বর আসামি উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিরাজ কাইয়া। কিন্তু তার স্বজনরা নিশ্চিত করেছেন- ঘটনার এক সপ্তাহ আগে থেকেই চিকিৎসার জন্য তিনি ভারতে অবস্থান করছিলেন।
মামলার বাদী জয়দেবপুর থানার এসআই বাছেদ মিয়া জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি মামলার বাদী হয়েছেন। কাকে আসামি করা হয়েছে, তা জানেন না। গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম সবুর বলেন, যদি বিদেশে থাকা কাউকে আসামি করা হয়ে থাকে, তবে তদন্ত করে মামলার পরবর্তী ধাপে নাম বাদ দেওয়া হবে।
একদিনে ৩১ থানায় ৩৭ মামলা!
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির সমাবেশের পরের দিন সোমবার রাজধানীর ৩১টি থানায় ৩৭ মামলা হয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এসব মামলায় ১৯৩ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মূলত রোববার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভা শেষে ফেরার সময় বিভিন্ন স্থান থেকে এঁদের আটক করা হয়। এর মধ্যে হাতিরঝিল থানায় একটি মামলায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ দলের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ স্থায়ী কমিটির ৭ জন নেতাসহ ৫৫ জনকে আসামি করে। তাঁদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য, মগবাজার রেলগেট এলাকায় যানবাহন ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের ওপর হামলা এবং পুলিশকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখমের অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে ওই এলাকায় গেলে স্থানীয় লোকজন জানান, তাঁরা ওই দিন এমন কোনো ঘটনা দেখেননি বা শোনেননি। এই আসামিদের মধ্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশেই ছিলেন না।
( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২২ অক্টোবর ২০১৮ প্রকাশিত)