Shershanews24.com
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে ঘুষ-দুর্নীতির পক্ষে-বিপক্ষে কর্মসূচি
সোমবার, ০৭ মে ২০১৮ ০৮:১৯ অপরাহ্ন
Shershanews24.com

Shershanews24.com

শীর্ষকাগজের সৌজন্য : শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে ঘুষ বাণিজ্য ওপেন সিক্রেট। দীর্ঘদিন ধরে অধিদফতরের প্রতিটি কাজে ব্যাপকভাবে ঘুষ-দুর্নীতি চলছে। যার মূল নায়ক সরকারি এ দফতরটির প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রধান প্রকৌশলীর ঘুষ বাণিজ্যে এখন অতিষ্ঠ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের ঠিকাদাররাও। এ নিয়ে বারবার আপত্তি জানিয়েও কোনো ফল হয়নি। অবশেষে বাধ্য হয়ে দফতরের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের পিসির নামে দফায় দফায় ঘুষ বাণিজ্যসহ নানান দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে শিক্ষামন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন ঠিকাদাররা। গত ১০ এপ্রিল ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ঠিকাদার সমিতি’র পক্ষ থেকে দফতরের বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও টেন্ডারে অপ্রয়োজনীয় শর্তারোপ বন্ধসহ ১১ দফা লিখিত দাবি জানানো হয়। একই দিনে শিক্ষা ভবন চত্বরে একই দাবিতে বিক্ষোভও করেন ঠিকাদররা। এতে অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান দুর্নীতিবাজসহ সংশ্লিষ্টদের গাত্রদাহ শুরু হয়। তাই প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা নিজের দুর্নীতির সঙ্গীদের নিয়ে এর পাল্টা আরেকটি কমিটি গঠন করেন। প্রধান প্রকৌশলী সমর্থিত ওই কমিটিও ইতিমধ্যে ঠিকাদারদের পাল্টাপাল্টি হিসেবে বিকল্প কর্মসূচি পালন করেছে। ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার জন্যই মূলত এই কমিটি পাল্টা কর্মসূচি পালন করেছে বলে জানা গেছে। তবে অনেকেই একে ঘুষ-দুর্নীতির পক্ষের কমিটি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ঠিকাদারদের দাবির বিরুদ্ধে এবং ঘুষ ও দুর্নীতিবাজদের পক্ষে গত ১১ এপ্রিল শিক্ষা ভবন চত্বরে এ কর্মসূচি পালিত হয়। প্রধান প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠা ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর প্রকৌশলী-কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ’-এর ব্যানারে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এর আগে ১০ এপ্রিলই এই কমিটি গঠন করে পরের দিন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। তাদের সেই কর্মসূচি কাভার করতে সংবাদ মাধ্যমগুলোকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সমন্বয় পরিষদের সদস্য সচিব ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের উপপরিচালক (প্রশাসন) আসাদুজ্জামান ওই আমন্ত্রণপত্র টেলিভিশন চ্যানেলগুলোসহ সকল মিডিয়ায় পাঠান বলে জানা গেছে। যদিও এতে সাড়া দেয়টি কোনো মিডিয়া। কিন্তু দুর্নীতি ধামাচাপা দিতেই সরকারি অফিসের কর্মকর্তারা পরের দিন বে-আইনিভাবে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন বলে ঠিকাদারদের দাবি।
এদিকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের দুর্নীতিবাজচক্রের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ও তার পরিবারও জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যে কারণে ঠিকাদাররা ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্মারকলিপি দিলেও তা বন্ধ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ কর্মকর্তার মধ্যে। তবে এ মুহূর্তে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের ঘুষ-দুর্নীতির পক্ষে-বিপক্ষে শিক্ষা ভবনে আন্দোলন কর্মসূচিতে বেশ টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছে। এমনকি নিজেদের ঘুষ-বাণিজ্য বজায় রাখতে মহাসমাবেশের ঘোষণাও দিয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর প্রকৌশলী-কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ।
ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে ঠিকাদারদের বিক্ষোভ
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ এবং নির্মাণ সামগ্রীর দাম কমানোর দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন ঠিকাদাররা। গত ১০ এপ্রিল সকালে শিক্ষা ভবনে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বক্তব্য রাখেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ঠিকাদার সমিতির সভাপতি মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন- খন্দকার ফজলুল হক, রাকিব হোসেন মিরন, আমিনুল ইসলাম টিটন, ইয়াসিন আলী, এইচএম শাহীন, সোহেল রানা মিঠু, মোদচ্ছের হাওলাদার মজিবুল হক চৌধুরী সেন্টু, মিজানুর রহমান প্রমুখ।
বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, ‘একদিকে নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে ঠিকাদারদের নাভিশ্বাস অবস্থা। অন্যদিকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে ঘুষ-দুর্নীতি বেড়েই চলছে। কোনো কাজেই ঠিকাদাররা স্বচ্ছভাবে দরপত্রে অংশ নিতে পারছেন না। প্রকৌশলীদের ঘুষ-দুর্নীতি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সুবিধার্থে একের পর এক বিভিন্ন অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। এমনকি ই-জিপি’র বিধিবিধান না মেনেই পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হচ্ছে। এতে দরপত্রে বাধাগ্রস্ত হয়ে সাধারণ ঠিকাদাররা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’ বক্তারা অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘এ অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। গত বছরের ৩০ অক্টোবর প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাকে এই ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধসহ ১১ দফা সম্বলিত স্মারকলিপি দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।’ বাধ্য হয়ে এবার ঠিকাদার নেতৃবৃন্দ সচিবালয়ে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে তাদের দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি পৌঁছে দেন।
ঠিকাদার সমিতির ১১ দফা দাবি
শিক্ষামন্ত্রী বরাবরে ঠিকাদারদের দেয়া স্মারকলিপিতে বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের জারিকৃত পরিপত্রে জোনাল প্রকৌশলীদের মনগড়া নিয়ম কানুন ও ই-জিপিতে বিধিবিধান না মেনে অযৌক্তিকভাবে বিভিন্ন শর্ত আরোপের প্রেক্ষিতে সাধারণ ঠিকাদাররা দরপত্রে অংশগ্রহণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। এতে আর্থিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। এই প্রতিবন্ধকতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করছে। এতে আরও বলা হয়, ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনাশর্তে দরপত্র আহ্বানের পথকেও রুদ্ধ করছে। সাধারণ ঠিকাদারদের দাবি, প্রতিবাদ, দুঃখ, ক্ষোভের কারণে ঠিকাদার সমিতি চলতি বছরের ৫ এপ্রিল জরুরি সভা করে। সভায় আলোচনা ও বক্তব্যের ভিত্তিতে ১১ দফা দাবি নিয়ে স্মারকলিপি প্রদান ও আন্দোলনের সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে গত বছরের ৩০ অক্টোবর একই দাবি নিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি দাবি বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপই নেননি। তাই সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন কর্মকা- গতিশীল রাখতে ও অধিদফতরের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে মন্ত্রীর সহায়তা চেয়ে ১১ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। তবে এই দাবি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কারণ, প্রধানপ্রকৌশলী হানজালা নিজেই ঘুষ-দুর্নীতিসহ এসব অনিয়ম-অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। এমনকি শিক্ষামন্ত্রীরও এতে পরোক্ষ সমর্থন আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দাবিগুলো হচ্ছে : ১. নির্মাণ সামগ্রীর দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে বাজার দর অনুযায়ী সমন্বয় করে ঠিকাদারের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। ২. সংসদে পাস হওয়া ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনাশর্তে দরপত্র আহ্বান করতে হবে। ৩. ঠিকাদার প্রতিনিধি সমন্বয়ে বাজার দর অনুযায়ী প্রতিবছর হালনাগাদ দর সিডিউল করতে হবে। ৪. ৭০১৬, ৫৯৭৪, ৪৯৩১ কোডের রাজস্ব খাতসমূহের কাজের অবিলম্বে সব বকেয়া বিল চলতি অর্থবছরের মধ্যেই পরিশোধ করতে হবে। ৫. ই-জিপিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে এবং অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করে পছন্দের লোকদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার যে অনিয়ম বর্তমানে চলছে তা অবিলম্বে বন্ধ করে স্বচ্ছভাবে ঠিকাদারদের দরপত্রে অংশগ্রহণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। ৬. সম্পাদিত কাজের জামানত পূর্বের ন্যায় মেরামত কাজের জন্য ৬ মাস এবং নতুন নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে ১ বছরের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। ৭. সিডিউলে সকল প্রকার ল্যাবরেটরি টেস্ট, ড্রইং, মোবিলাইজেশন বিলের টাকা সিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করে কারিগরি অনুমোদন, ইস্টিমেট অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ সম্পূর্ণ করে টেন্ডার আহ্বান করতে হবে। ৮. প্রাক্কলিত মূল্যের ভেরিয়েশন এবং নন-টেন্ডারের কাজ রিভাইসড করার ক্ষেত্রে ঠিকাদারের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ৯. অধিদফতরের প্রদত্ত লাইসেন্সের ক্ষমতা অনুযায়ী বিনা শর্তে টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। ১০. ঠিকাদার সংশ্লিষ্ট সকল সার্কুলার ও সকল দরপত্র আহ্বানের নোটিশ ঠিকাদার সমিতির অফিসসহ সকল জোনাল অফিসের বোর্ডে টাঙ্গাতে হবে এবং ঠিকাদারের লাইসেন্স বার্ষিক নবায়নের ক্ষেত্রে ঠিকাদার সমিতির ছাড়পত্র নিতে হবে। এবং ১১. পিসির নামে ধাপে ধাপে ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ঠিকাদার সমিতির সভাপতি মো. মোয়াজ্জেম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম। শিক্ষামন্ত্রীকে দেওয়া স্মারকলিপির অনুলিপি দেওয়া হয় শিক্ষা বিভাগীয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিকেও। এছাড়াও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষা সচিব ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীকে।
ঘুষ-দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ৫১ সদস্য বিশিষ্ট সমন্বয় পরিষদ গঠন
এদিকে ১০ এপ্রিল ঠিকাদারদের স্মালকলিপি দেওয়া ও বিক্ষোভ করার পর পরই প্রধান প্রকৌশলীর ছত্রছায়ায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রকৌশলী-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে ৫১ সদস্য বিশিষ্ট পাল্টা সমন্বয় পরিষদ গঠন করা হয়। যার আহ্বায়ক করা হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মজিবুর রহমান সরকারকে। যদিও ওইদিন তিনি অফিসের কাজে বাহিরে ছিলেন। কিন্তু প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশে তাকে আহ্বায়ক করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সমন্বয় পরিষদের সদস্য সচিব হন অধিদফতরের উপপরিচালক (প্রশাসন) আসাদুজ্জামান। এছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বেগম বুলবুল আখতার, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ওবায়দুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী (ডেস্ক ৪) মো. তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে আছেন যুগ্ম সহকারী প্রকৌশলী (সাব-অ্যাসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) মো. সিরাজুল ইসলাম, হিসাব রক্ষক মো. আবু সাঈদ চৌধুরী, যুগ্ম সহকারী প্রকৌশলী মো. জাফর আলী সিকদার। এছাড়াও অন্যান্যের মধ্যে আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন- নির্বাহী প্রকৌশলী (ডেস্ক ১) মো. আবুল হাসেম সরদার, নির্বাহী প্রকৌশলী (ডেস্ক ২) মীর মুয়াজ্জেম হুসাইন, সহকারী প্রোগ্রামার ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ।
সমন্বয় পরিষদের পাল্টা কর্মসূচি পালন
‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর প্রকৌশলী-কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ’ গঠনের পরের দিন ১১ এপ্রিল শিক্ষা ভবন চত্বরে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধের দাবির বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিবাদ সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের আহ্বায়ক প্রকৌশলী মো. মজিবুর রহমান সরকার। পরিষদের সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান জানান, প্রতিবাদ সভায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়, ঢাকা মেট্রো, সাভার, নারায়নগঞ্জ, নরসিংদী ও টাঙ্গাইল জোনের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সদস্য সচিব বলেন, ঠিকাদারদের দেওয়া স্মারকলিপির প্রতিবাদে দ্রুত সময়ের মধ্যে সকল জোন ও কেন্দ্রীয় সমন্বয় পরিষদ হতে শিক্ষামন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দেয়া হবে। এছাড়া যেকোনো ছুটির দিনে সারা দেশের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন তিনি। এর আগে ১১ এপ্রিল সকালে শিক্ষা ভবন চত্বরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতি, বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর স্বাধীনতা কর্মচারী সমিতি, চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী সমিতি এবং সরকারি গাড়িচালক সমিতির নেতারা ভিন্ন ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল করে বলে সমন্বয় পরিষদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এ সংগঠনগুলো প্রধান প্রকৌশলী সমর্থিত সমন্বয় পরিষদেরই অন্তর্ভুক্ত। ঠিকাদারদের দাবি যাতে বাস্তবায়িত না হয় এবং ঘুষ দুর্নীতি যাতে অত্যাহত রাখা যায় সেজন্য কৌশলে প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাই এদের সংগঠিত করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মজিবুর রহমান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি শীর্ষকাগজের এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ঠিকাদাররা যে কর্মসূচি পালন করেছে, তাতে আমাদের মানহানী হচ্ছে, দুর্ণাম রটানো হচ্ছে। তাই প্রতিবাদে আমরাও কর্মসূচি পালন করেছি।’ প্রশ্নের জবাবে মজিবুর রহমান বলেন, ‘যে দিন ঠিকাদাররা শিক্ষা ভবনে কর্মসূচি পালন করেছে ও মন্ত্রণালয়ে স্মরকলিপি দিয়েছে, সেই দিন আমি অফিসে ছিলাম না। ঠিক কী হয়েছিল, তা আমি জানি না। পরে জেনেছি আমাকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে।’ অন্য কোনো সরকারি দফতরের বিরুদ্ধে তো এমন কর্মসূচি পালনের নজির নেই, তাহলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের বিরুদ্ধে কেন ঠিকদাররা এমন ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক মজিবুর রহমান সরকার বলেন, ‘তারা এ জন্য আমাদের কাছে সরি বলেছে (দুঃখ প্রকাশ করেছে)। তারা বলেছে, ভুল করে অভিযোগ করেছে, ভুল করে কর্মসূচি পালন করেছে।’ ঠিকাদারদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগের জবাবে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘এটা সঠিক নয়।’ আর আদৌ ভুল করে অভিযোগ করা যায় কিনা- এমন প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এদিকে শীর্ষকাগজের এই প্রতিবেদকের কাছে ঠিকাদাররা অভিযোগ করেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পর শিক্ষা ভবনের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি ধমকি দিচ্ছেন। অভিযোগকারীদের কাজের বকেয়া বিল না দেওয়া, নতুন কাজ ও টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়াসহ নানাভাবে হুমকির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা। এ ক্ষেত্রে তারা প্রধানমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছেন।
প্রসঙ্গত, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে দীর্ঘদিন ধরেই অসহনীয় মাত্রার ঘুষ বণিজ্য, অনিয়ম, দুর্নীতি চলে আসছে। এ নিয়ে শীর্ষকাগজে ইতিপূর্বে তথ্য নির্ভর একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। মূলত, অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাই হচ্ছেন প্রধান দুর্নীতিবাজ। তিনি একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাও বটে। তার সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী এবং তার পরিবারেরও ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। যে কারণে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে বছরের পর বছর লুটপাট ও দুর্নীতি চললেও তা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এমনকি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ‘সহনীয় মাত্রায় ঘুষ’ খাওয়ার পরামর্শও মানছেন না শিক্ষা ভবনের কেউ। এতে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের ঠিকাদাররাও আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। এর অংশ হিসেবে মন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেন তারা। এতে শীর্ষকাগজে আগে প্রকাশিত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর সম্পর্কিত দুর্নীতির প্রতিবেদনগুলোই সত্য প্রমাণিত করলো। তবে এবার অভিযুক্ত প্রধান দুর্নীতিবাজসহ তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে কিনা- সেই দিকে তাকিয়ে আছেন ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদাররাসহ সাধারণ সচেতন জনগণ।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৭ মে ২০১৮ প্রকাশতি)