বৃহস্পতিবার, ২৭-জুন ২০১৯, ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন

শেকৃবি উপাচার্যের যতো অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৮:১৬ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে উপাচার্যের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য আর স্বেচ্ছাচারিতায় ডুবতে বসেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধিমালার তোয়াক্কা না করে নিজের খেয়াল খুশিমতো যাচ্ছেতাই করছেন তিনি। উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনের লাগামহীন অনিময়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে। প্রশাসনিক কার্যক্রমও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, উপাচার্যের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির বালাই নেই। কোনো ক্লাস রুটিন নেই। হঠাৎ হঠাৎ ক্লাস-পরীক্ষার সময় দেয়া হয়। কোর্স শেষ না করেই পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। এছাড়া হাতে-কলমে শেখারও কোনো ব্যবস্থা নেই। এবড়োথেবড়ো বেশিরভাগ বিভাগই। স্বেচ্ছাচারিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশ^বিদ্যালয়ে একতরফা আধিপত্য ধরে রাখতে উপাচার্য হয়েও একাই ৬টি বিভাগের চেয়ারম্যানের পদ দখল করে রেখেছেন অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন। এমনকি একটি অনুষদের ডিন পদও রয়েছে তার দখলে। অথচ ওইসব পদে দায়িত্ব পালনের জন্য যোগ্য শিক্ষকের অভাব নেই। বিধি অনুযায়ী, বিভাগের অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে চেয়ারম্যান হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি তা না করে নিজের দখলেই রেখেছেন পদগুলো।
সূত্র জানায়, নিজের অনুসারী না হওয়ায় এবং নিয়োগ বাণিজ্যে সহায়তা না করায় ওইসব পদে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকদেরকে পদোন্নতি দিচ্ছেন না উপাচার্য। অথচ একজনের হাতে একসঙ্গে এতগুলো পদের ক্ষমতা থাকায় বিভাগগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। মেয়ে এবং জামাতাকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শেকৃবির শিক্ষক হিসেবে।
নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো বিভাগে নিজের অনুগত শিক্ষককে চেয়ারম্যান পদে বহাল রেখেছেন উপাচার্য। যোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে দায়িত্ব না দিয়ে একই ব্যক্তিদেরকে চেয়ারম্যান ও ডিন উভয় পদে বহাল রাখার নজিরও রয়েছে। 
জানা যায়, উপাচার্য যে ৬টি বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন তার ৪টিতেই স্থায়ী কোনো শিক্ষক নেই। বাকি দুটি বিভাগে শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও চেয়ারম্যানের পদটি তাদের না দিয়ে নিজেই আঁকড়ে আছেন।
উপাচার্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন- এমন বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে ফিশারিজ অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি, আকুয়াটিক অ্যানিমেল হেলথ ম্যানেজমেন্ট, আকুয়াটিক এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট এবং মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওশানোগ্রাফি বিভাগ। এ ৪ বিভাগই ফিশারিজ অ্যান্ড আকুয়াকালচার অনুষদের অন্তর্ভুক্ত। বাকি দুটি বিভাগ হচ্ছে, এগ্রিবিজনেস ম্যানেজমেন্ট অনুষদের। এগুলো হলো ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ফিন্যান্স বিভাগ ও ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স অনুষদের সার্জারি অ্যান্ড থেরিওজেনোলজি বিভাগ। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে ফিশারিজ অ্যান্ড আকুয়াকালচার অনুষদের ডিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষক নিয়োগসহ প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার জন্য একাই বিধিবহির্ভূতভাবে এসব পদ দখল করে আছেন উপাচার্য কামাল উদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের সার্জারি অ্যান্ড থেরিওজেনোলজি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভাগটির একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের অবস্থা খুবই করুণ। কোনো ধরনের খ-কালীন বা পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগ না দিয়েই বিভাগের একমাত্র শিক্ষককে ছুটি দেয়া হয়েছে। ফলে অন্য বিভাগের শিক্ষক দিয়ে বিভাগটির ক্লাস চালিয়ে নিতে হচ্ছে।
একাডেমিক কার্যক্রমের বেহাল অবস্থার কথা জানিয়েছেন বিভাগটির শিক্ষার্থীরাও। তারা জানান, শিক্ষক না থাকায় অন্য বিভাগের শিক্ষক ক্লাস রুটিন ছাড়াই সময়ে-অসময়ে ক্লাস নেন। এতে করে ক্লাসের সময় জানতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকছেন। আবার পর্যাপ্ত ক্লাস না নিয়েই কোর্স শেষ করা হচ্ছে। এমনকি পরীক্ষার সংখ্যাও কমিয়ে আনা হয়েছে বিভাগটিতে। ফলে শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে মূল্যায়িত না হয়েই পরের সেমিস্টারে চলে যাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীরা বলেন, কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির বালাই নেই। কোনো ক্লাস রুটিন নেই। হঠাৎ হঠাৎ ক্লাস-পরীক্ষার সময় দেয়া হয়। কোর্স শেষ না করেই পরীক্ষা নিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া হাতে-কলমে শেখারও কোনো ব্যবস্থা নেই এ বিভাগে।
ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান পদে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। জানা যায়, সহকারী অধ্যাপক শাহ জহির রায়হান বিভাগটির চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি ডেপুটেশনে গেলে বিভাগটিতে সহকারী অধ্যাপক পদমর্যাদার শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও গত ৩১ আগস্ট উপাচার্য নিজেই চেয়ারম্যানের পদ দখল করেন। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য করতে উপাচার্য বিভাগটির দায়িত্ব নিয়েছেন। মূলত অনুগত এক শিক্ষকের আত্মীয়কে নিয়োগ দিতেই তিনি বিভাগটির চেয়ারম্যান হয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বিভাগটিতে শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রত্যাশী কয়েকজন প্রার্থী জানান, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ফিন্যান্স বিভাগে অনেক যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজনকে নিয়োগ দেয়ার পাঁয়তারা চলছে। ওই প্রার্থী শেকৃবিতে কোটার সুবিধা নিয়েও টানা দুবার ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে পারেননি। ভর্তি পরীক্ষায় সর্বনিম্ন ২৫ নম্বর পেয়েছিলেন তিনি।
২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ফিশারিজ অ্যান্ড আকুয়াকালচার অনুষদ চালু হয় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই অনুষদটির ডিনের পদ দখল করে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে, নতুন এ অনুষদে শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির কথা বিবেচনায় রেখে ডিনের পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন তিনি। যদিও অনুষদটির ডিন পদের যোগ্য অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছেন।
এদিকে নিজে বিভিন্ন পদে থাকার পাশাপাশি অনুগতদের মাধ্যমেও বেশ কয়েকটি অনুষদ ও বিভাগে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন উপাচার্য ড. কামাল উদ্দিন। এসব ক্ষেত্রে তিনি সরকারি বিধি-বিধানের তোয়াক্কাই করেননি।
এগ্রি ইকোনমিকস বিভাগের চেয়ারম্যানের পদে থাকা অধ্যাপক ড. রোকেয়া বেগমের মেয়াদ গত ৮ মে শেষ হলেও পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্বে রেখেছেন উপাচার্য। অথচ অভিযোগ আছে, এ বিভাগের অধ্যাপক পর্যায়ের অনেক যোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও উপাচার্যের অনুগত না হওয়ার কারণে তাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি।
একই অনুষদের ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পভার্টি স্টাডিজ বিভাগের মিজানুল হক কাজলকে ডিনের দায়িত্বের পাশাপাশি চেয়ারম্যানও করা হয়েছে। যদিও বিভাগের অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে চেয়ারম্যান হওয়ার কথা। সূত্র জানায়, একটি নিয়োগে বিশেষ সুবিধা নিতে মিজানুল হক কাজলকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। ওই নিয়োগ পরীক্ষার ভাইভার পরদিনই তাকে পুনরায় চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে নেন উপাচার্য। এদিকে মেয়ে ও তার জামাতাকে নিয়মবহির্ভূত উপায়ে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। জানা যায়, উপাচার্যের মেয়ে কামরুন নাহার এগ্রিকালচার বোটানি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও মেয়ের জামাতা মো. হাসানুজ্জামান এগ্রোনমি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। উপাচার্যের স্বজনপ্রীতি নীতির কারণে তার মেয়ে ও মেয়ের জামাতা একাডেমিক কার্যক্রমে বেশ উদাসীন বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন। বিশেষ করে উপাচার্যের জামাতা হওয়ার সুযোগে মো. হাসানুজ্জামান বেশির ভাগ সময়ই ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে ইচ্ছেমতো ছুটিতে থাকেন। এছাড়া উপাচার্যের মেয়ে ও মেয়ের জামাতা উভয়ের বিরুদ্ধেই ক্লাস ও পরীক্ষা বিষয়ে উদাসীনতা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।
উপাচার্যের অনিয়ম নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না বললেও অন্তত ১৫ জন শিক্ষক এসব অনিয়মের অভিযোগ করেছেন। অনিয়ম ও নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে সাংবাদিকরা কথা বলতে ও  দেখা করতে চাইলে এ বিষয়ে কোনো কথা বলবেন না বলে জানিয়ে দেন উপাচার্য। তাছাড়া নিয়োগ-সংক্রান্ত কোনো বিষয় সাংবাদিকদের জানানোর নিয়ম নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেছেন, সুষ্ঠুভাবে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা না হলে মানসম্মত শিক্ষা ব্যাহত হয়। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম হলে শিক্ষার মানের উপর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে। প্রত্যেক উপাচার্যেরই বিধি মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা প্রয়োজন। ইউজিসির পক্ষ থেকে সব উপাচার্যের প্রতিই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধিমালা অনুসরণের নির্দেশনা রয়েছে। যদিও শেকৃবি ভিসি ড. কামাল উদ্দিন এগুলোর তোয়াক্কাই করছেন না।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১২ নভেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)