শুক্রবার, ১৪-ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • আগেরগুলোই ধুঁকছে, তবুও নতুন ব্যাংক কার স্বার্থে?

আগেরগুলোই ধুঁকছে, তবুও নতুন ব্যাংক কার স্বার্থে?

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর, ২০১৮ ০১:০৭ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতিসহ নানা দুর্নীতি অনিয়মে জর্জরিত হয়ে আগের ব্যাংকগুলোই ডুবতে বসেছে; এরইমধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের চাপে নতুন একটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া শর্তসাপেক্ষে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আরও ৩ টি ব্যাংককে। সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ সময়ে এসে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খোদ অর্থমন্ত্রীও সরকারের এই সিদ্ধান্তে খুবই অখুশী বলে মন্তব্য করেছেন। অনীহা সত্ত্বেও এসব ব্যাংক অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করতে বাধ্য হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। 
বর্তমান সরকারের মেয়াদে অনুমোদন পাওয়া বহুল আলোচিত দি ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে পুরো আর্থিক খাতেই আস্থার অভাব দেখা দিয়েছে। এর চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর। ব্যাংকটিকে টেনে তুলতে এখনও কাজ করছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। এরপরও সংকট কাটেনি। এ সরকারের আমলে দুর্নীতি, জালিয়াতিতে জর্জরিত ব্যাংকগুলোর এমন অবস্থা যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পর্যন্ত খুঁজে পাচ্ছে না বেসিক ব্যাংক। দুর্নীতি ও অনিয়মে জর্জরিত সরকারি মালিকানাধীন এই ব্যাংকের জন্য দেড় মাস আগে এমডি নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো যোগ্য লোক এখনো এই পদের জন্য আবেদনই করেননি। তাই আবারও পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। এমডি পাওয়ার জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কিছু শর্তেরও পরিবর্তন আনা হয়েছে। তারপরও এই ব্যাংকের জন্য একজন দক্ষ ও যোগ্য এমডি পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। বিগত দিনের পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণ এই ব্যাংকের অবস্থা দুই বছর ধরে খুবই নাজুক। বছরখানেক ধরে বেসিক ব্যাংকের অর্ধেকেরও বেশি ঋণ খেলাপি তালিকায় স্থান পেয়েছে। এ ঋণের পুরোটা উদ্ধার করা কখনোই সম্ভব হবে না। এই পরিস্থিতিতে কোনো পেশাজীবী ব্যাংকারই বেসিক ব্যাংকের দায়িত্ব নিতে চাচ্ছেন না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, এই পদে কোনো যোগ্য লোক আবেদনই করছে না। ব্যাংকিং খাতের নাজুক এই পরিস্থিতির মধ্যেই আবারও নতুন করে ৪ টি ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়ার আয়োজন চলছে। অথচ অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকাররা নতুন ব্যাংকের বিষয়ে বরাবরই বিরোধিতা করে বলছেন, বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে। বর্তমান অবস্থায় দেশে আর ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, ‘দেশের ব্যাংক খাত খুব বেশি বড় হয়ে গেছে। আর্থিক খাতের চাহিদার তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি বলে ব্যাংকাররাই মনে করছেন। তাই এ খাত সংকোচনের দরকার হতে পারে।’ এমনকি ব্যাংক বেশি হওয়ায় এর কয়েকটি একীভূত হওয়া দরকার বলেও মনে করছেন তিনি।
প্রয়োজন না হলেও একমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায়ই লাইসেন্স পাচ্ছে নতুন ৩ ব্যাংক
ঋণ কেলেঙ্কারির কয়েকটি বড় ঘটনায় গত কয়েক বছর ধরেই দেশের ব্যাংক খাত আলোচনায় রয়েছে। সর্বশেষ অনুমোদন পাওয়া কয়েকটি ব্যাংকও অনিয়ম আর তারল্য সঙ্কটে ধুঁকছে। গত জুন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার (রাইটঅফসহ) মতো, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৫ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ নিয়ে দেশে অর্থনীতিবিদদের যেমন উদ্বেগ আছে, তেমনি তিন সপ্তাহ আগে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে বিশ্ব ব্যাংক-আইএমএফ বার্ষিক সম্মেলনসহ বিভিন্ন বৈঠকেও এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় অর্থমন্ত্রীকে। গত ১ নভেম্বর সচিবালয়েও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘এভাবে ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ায় আমি ভেরি আনহ্যাপি (খুবই অখুশি)। এসব ব্যাংক খুব সত্ত্বর মার্জার (একীভূতকরণ) শুরু হবে। নতুন ব্যাংক দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না।’
তাহলে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পলিটিক্যাল গ্রাউন্ডে (রাজনৈতিক বিবেচনায়) এগুলো দেওয়া হচ্ছে।’  আগে যেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি একীভূত হওয়া দরকার। এর আগে একজন সাবেক মন্ত্রীকে ব্যাংক দেওয়ার অভিজ্ঞতা ভালো নয়। আবার একজন মন্ত্রীর আত্মীয় ব্যাংক পেতে যাচ্ছেন। এতে নতুন করে খারাপ অভিজ্ঞতা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেক মন্ত্রীই ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সংখ্যা বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো একীভূত করা হবে। এ জন্য আইন ঠিকঠাক করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় এলেই একীভূতের কাজ শুরু হবে। যদি অন্য কেউ আসে, তাহলে তাদেরকেও ব্যাংক সংস্কারের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়ে যাব।’ 
সরকারের চাপে গত ২৯ অক্টোবর পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের ‘কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’কে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিবেচনায় থাকা বাকি ৩টি ব্যাংককে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কমিউনিটি ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করলে বাংলাদেশে মোট ব্যাংকের সংখ্যা হবে ৫৯। আর বাকি ৩ টির অনুমোদন চূড়ান্ত হলে দাঁড়াবে ৬২ তে।
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, দেশের ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি যখন এতোটাই নাজুক তখন আবারও নতুন করে কেন ৪ টি ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়ার আয়োজন চলছে? এমনকি খোদ অর্থমন্ত্রীই যেখানো অখুশী তারপরেও ব্যাংকগুলিকে লাইসেন্স দিতে কেন তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে?
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নিজের ইচ্ছা না থাকলেও চাপে পড়েই তিনি ব্যাংকগুলিকে অনুমোদনের সুপারিশ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই মুহূর্তে নতুন কোনো ব্যাংককে অনুমোদন না দেওয়ার পক্ষে ছিলো। কিন্তু অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ক্রমাগত আসতে থাকা চাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিরোধ টিকতে পারেনি।
অর্থমন্ত্রী সর্বশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বরও এক চিঠিতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে দেওয়া এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘সম্ভবত, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রস্তাবিত একটি ব্যাংককে লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমি আপনাকে প্রস্তাবিত সবগুলো ব্যাংককে একে একে লাইসেন্স দেওয়ার অনুরোধ করছি।’
চিঠিতে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সম্প্রতি এক বৈঠকে প্রস্তাবিত ব্যাংকগুলোকে লাইসেন্স প্রদানে সম্মত হয়েছেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও উপস্থিত ছিলেন।’
সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে ৪টি ব্যাংকের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে ২৯ অক্টোবর কমিউনিটি ব্যাংককে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আর সব শর্ত পূরণ না করায় লাইসেন্স না দিয়ে অপেক্ষায় রাখা হয়েছে পিপলস ব্যাংক, বেঙ্গল ব্যাংক ও সিটিজেন ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সভায় চারটি ব্যাংকের প্রস্তাব তোলা হয়। এর মধ্যে একটি ব্যাংককে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাকি তিনটি ব্যাংককে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাদের প্রস্তাবে ও নথিপত্রে কিছু ঘাটতি ও ত্রুটি রয়েছে। সেগুলো সংশোধন করে দিলেই পর্ষদ অনুমোদন দেবে। চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ চালু করার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত মিলেছে।
চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়া ব্যাংকের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, বেঙ্গল ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের তিনজনের বিষয়ে উচ্চ আদালতে কর-সংক্রান্ত মামলা চলছে। সেগুলো নিষ্পত্তি করে আমাদের জানালে পর্ষদ অনুমোদন দেবে। পিপলস ব্যাংকের উদ্যোক্তা এমএ কাশেমের বিদেশে কী পরিমাণ সম্পত্তি রয়েছে, তা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠালে তা পর্ষদে উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদ সেটি বিবেচনা করে ব্যাংক স্থাপনের আগ্রহপত্র (লেটার অব ইনটেন্ট) দেবে। আর সিটিজেন ব্যাংকের প্রস্তাবে কিছু ঘাটতি রয়েছে। সেগুলো ঠিকঠাক করে উপস্থাপন করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
৩ ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকরাই নানাভাবে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট 
চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ৩ টি ব্যাংকেরই পৃষ্ঠপোষকরা নানাভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট। পিপলস ব্যাংকের প্রধান উদ্যোক্তা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এমএ কাশেম। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের এ বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্র শাখা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বেঙ্গল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নিয়েছে দেশীয় প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মোর্শেদ আলম এই গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং প্রস্তাবিত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হলেন তার ছোট ভাই জসীম উদ্দিন।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মা জাহানারা হকের নাম সিটিজেন ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। গত বছর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে চাপ আসা সত্ত্বেও নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাবটি স্থগিত রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকাররা নতুন ব্যাংকের বিষয়ে বরাবরই বিরোধিতা করে বলছেন, বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে। বর্তমান অবস্থায় দেশে আর ব্যাংকের প্রয়োজন নেই।
আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে ২০১২ সালে ৯টি বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় ওই ব্যাংকগুলোর অনুমোদন দেওয়া নিয়ে সে সময় সমালোচনা হয়। ঋণ কেলেঙ্কারির বেশ কিছু বড় ঘটনায় গত কয়েক বছর ধরেই দেশের ব্যাংক খাত আলোচনায় রয়েছে। খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতিসহ নানা অনিয়মে ধুঁকছে নতুন-পুরনো অনেক ব্যাংক। মূলধন যোগান দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে সরকারি ব্যাংকগুলোকে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ আর নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ায় অস্থিরতা বাড়ছেই। এই অবস্থায় নতুন ব্যাংক নয় বরং পুরনো ব্যাংকের মান বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। নতুন ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। তারপরেও নতুন করে কেন কার স্বার্থে আবার ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে? বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, যেখানে খোদ অর্থমন্ত্রীই নাখোশ, তিনিই যখন এর বিরোধিতা করছেন এবং একে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করছেন, তখন কার স্বার্থে এই ব্যাংক? অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া চিঠিতে এটি অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে সম্প্রতি এক বৈঠকে প্রস্তাবিত ব্যাংকগুলোকে লাইসেন্স দিতে সম্মত হয়েছেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা। এর অর্থ সরকারের উপরমহলই চাচ্ছে, তাদের আশীর্বাদপুষ্ট লোকজন আরও ব্যাংকের মালিক হোক। আগের লাইসেন্সগুলোও ক্ষমতাসীন দল বা জোটের শীর্ষ নেতাদের আত্মীয় স্বজন, মন্ত্রী, এমপি, কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া ব্যবসায়ীরাই বাগিয়ে নিয়েছেন। বর্তমান সরকারের মেয়াদে ১১ টি ব্যাংককে রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। সরকার যে স্বজনতোষী পুঁজিবাদের পূজারি, তারই অকাট্য প্রমাণ হলো এই ব্যাংকের মালিকানা বন্টনের মচ্ছব। যেটা নিকৃষ্ট ধরনের  রাজনৈতিক দুর্নীতি। রাজনৈতিক বিবেচনায় পাওয়া ব্যাংকের উদোক্তাদের সিংহভাগই তাদের রাজনৈতিক সম্পর্কের জোরে বা মন্ত্রীদের আত্মীয়তার পরিচয়ে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স পাওয়ার সুবাদে বিনা মূলধনে অন্যব্যবসায়ীদের অর্থে  তাদের ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক বনে গেছেন।  এতে বিনা মূলধনে কোটিপতি হচ্ছেন তারা। 
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত লুটপাট করতেই যে নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ফারমার্স ব্যাংকে রাখা জলবায়ু তহবিলের ৫০৮ কোটি টাকা ও ঋণের নামে নজিরবিহীন জালিয়াতির মাধ্যমে বেসিক ব্যাংকের ৩৪৯৩ কোটি টাকাসহ বিভিন্ন ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত ঘটনায় তা স্পষ্ট হয়েছে।
‘নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’
সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন বলছেন, এমন নাজুক পরিস্থিতিতে নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়া হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ব্যাংক খাতে দক্ষ কর্মী সংকট প্রকট হবে বলেও সতর্ক করছেন তিনি। তিনি আরও বলেছেন, যারা এখনও ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছেন তাদের চ্যানেলে আনতে পুরান ব্যাংকগুলোই যথেষ্ট। নতুন করে ব্যাংক দেয়ার কোন দরকার নেই। ইতোপূর্বে দেয়া নতুন ব্যাংক কোনভাবেই ভাল করতে পারছে না। তারপরেও আবার নতুন যারা আসবে তাদের ভাল করার তেমন সুযোগ নেই। সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে অব্যবস্থাপনা চলছে। অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে। এটি ব্যাংক খাত তো বটেই, সার্বিক অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কেবল আমানতকারী বা ব্যবসায়ীরাই ব্যাংকবিমুখ হবেন না, উৎপাদন, বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করলেও নতুন করে আরো ব্যাংক অনুমোদনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক বেশি হওয়ায় ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে খাতটি অনেক পেছনে চলে গেছে। ব্যাংকগুলো এখন মুদি দোকানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৫৮টি ব্যাংক যথেষ্ট। নতুন করে আরো ব্যাংক দিলে এ খাতে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। এর আগে যখন ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়, আমরা তখনই বলেছিলাম দেশের অর্থনীতির যে আকার সেখানে আর নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এই ৯টি ব্যাংকের মধ্যে ফারমার্স ব্যাংকও আছে। এনআরবি ব্যাংকসহ সমস্যাযুক্ত কিছু ব্যাংক আছে। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে আবারো ব্যাংকের অনুমোদন দেয়াটা আমি যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি না।

( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১২ নভেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)