মঙ্গলবার, ২০-নভেম্বর ২০১৮, ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন
বিরোধীদলের প্রস্তুতি, সরকারের ভয়, কূটনীতিকদের দৌড়ঝাপ

টার্গেট তফসিল 

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর, ২০১৮ ০৭:২৩ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজে ২২ অক্টোবর প্রকাশিত: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জেলে যাবার আগে ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ হোটেল লা মেরিডিয়ানে আয়োজিত বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভায় যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন তা এ যাবৎ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার চেষ্টা করেছে দলটির নেতা-কর্মীরা। সরকার যতই উস্কানোর চেষ্টা করেছে বিরোধীদল অত্যন্ত ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করেছে। টার্গেট হিসেবে নির্বাচনের তফসিলকে বেছে নিয়েছে তারা। সেই তফসিলের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাই পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। তবে অন্যদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগে নির্বাচন নিয়ে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল ইতিপূর্বে তা যেন ক্রমেই ভাটা পড়ছে। বরং সরকার যেন ভয় পেতে শুরু করেছে। বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর যাকে ‘ভুতের মত ভয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রথমে বলা হয়েছিল অক্টোবরের শেষে তফসিল ঘোষণা হবে। এরপর বলা হয়েছে ৩০ অক্টোবরের পর যে কোনো দিন তফসিল ঘোষণা হবে। তারপর বলা হয়, নভেম্বরের প্রথম সপ্তায়। এছাড়া মন্ত্রিসভা ছোট করা নিয়েও একেক বার একেক কথা বলছে তারা। তবে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের এই তফসিলকে কেন্দ্র করে বিদেশিরা দৌড়ঝাপ শুরু করে দিয়েছেন। তারা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছেন। গত সপ্তায় একই দিন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন ব্লুম বার্নিকাট এবং ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা আলাদাভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তার সেতুভবনস্থ দফতরে সাক্ষাত করে তারা স্পষ্টভাবে প্রায় একই কথা বলেন। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চান। যদিও ওবায়দুল কাদের পরবর্তীতে এমন আলোচনার সম্ভাবনার কথা নাকচ করে দিয়েছেন।
এদিকে বিএনপি নেতারা মনে করছেন, রাজনীতিতে বিএনপির জন্য সুদিন আসছে। তাদেরকে বাদ দিয়ে নির্বাচন এখন আর সম্ভব নয়। বিদেশি কূটনীতিকরা ড. কামালসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের জিজ্ঞেস করেছেন, তারা জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন আদৌ হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় রয়েই যাচ্ছে।
বিএনপির টার্গেট
নানান ষড়যন্ত্রের ঘুরপাকে পড়ে ২০১৩-১৪ এর নির্বাচন কেন্দ্রীক আন্দোলন ও ২০১৫ সালের লাগাতার হরতালের কর্মসূচি ব্যর্থ হবার পর বিএনপি তাদের রাজনৈতিক কৌশলে অনেক পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দলটি নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে। সরকারের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের সংগঠিত করতে থাকে। গত আড়াই বছরে এই দলটি যে একটি পরিণত বৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছে তা তারা গত ৩০ সেপ্টেম্বরের সোহরাওয়ার্দীর মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে জানান দিয়েছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরই তথ্য, ঢাকা শহরে এখন বিএনপি এবং পাশাপাশি জামায়াতও এখন বেশ শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। কঠোর আন্দোলন অর্থাৎ যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য এ মুহূর্তে তারা প্রস্তুত। তবে তারা মনে করছে, আন্দোলন ছাড়াই হয়তো নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে। 
সরকার যাতে কোনো রকমেই পার পেতে না পারে এজন্য বিএনপি খুবই সতর্ক বলে জানা গেছে। কোনো রকমের আলোচনা বা নিরপেক্ষ নির্বাচনের পদক্ষেপ না নেয়া ছাড়াই যদি একতরফা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা এবং সেই পরিবেশ-পরিস্থিতি যদি ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ না হয় তাহলে অত্যন্ত কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। সম্ভাব্য এই আন্দোলন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে তীব্রতর হবে বলে আভাস দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের কৌশল মার খাচ্ছে
বিরোধীদল সরকারের মুখোমুখি হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের সংগঠিত হওয়ার যে কৌশল অবলম্বন করছে তাতে সরকারের সব কৌশলই একের পর এক মার খাচ্ছে। ২০১৩-১৪ এর স্টাইলে সরকার নানা কৌশলে বিরোধীদল বিএনপি-জামায়াতকে ঘায়েল করতে চেয়েছিল। কিন্তু সরকারের কোন উস্কানিতেই কাজ হয়নি। সরকারের ফাঁদে পা দেয়নি তারা। এমনকি বিএনপি ভাঙার যে চেষ্টা-তদবির হয়েছিল তাতেও কাজ হয়নি। উল্টো বলা যায়, বিএনপি-জামায়াত এখন অনেক সংগঠিত, অনেক শক্তিশালী। জামায়াতের এক নেতা এ প্রতিবেদককে বলেছেন, তারা আগের চেয়ে অন্তত দশ গুণ বেশি শক্তিশালী এখন। তবে তিনি বলেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাস করি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জিয়া অরফানেজ মামলায় সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়েছিল যেসব উদ্দেশ্যে তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি, একমাত্র প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা ছাড়া। বরং এটি বিএনপির জন্য ‘শাপে বর’ হয়ে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সরকারের উদ্দেশ্য ছিল বিএনপি এ ইস্যুতে আন্দোলনে নামলে ব্যাপকহারে ধর-পাকড় করে ২০১৩-১৪ এর মত দলটিকে কাবু করে ফেলা। তা মোটেই সম্ভব হয়নি। জেলে যাবার আগে বেগম খালেদা জিয়া গত ৩ ফেব্রুয়ারি লা মেরিডিয়ানের সম্মেলনে দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি সরকারের যে কোনো উস্কানিমূলক ফাঁদে পা না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেটি নেতা-কর্মীরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। সরকারের আরেকটি অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিএনপিকে ভেঙে একটি অনুগত বিএনপি সৃষ্টি এবং তাদের দিয়ে তথাকথিত লোকদেখানো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করা। এছাড়া, বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপিকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করাও সরকারের একটা বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বিএনপিতে ভাঙন তো দূরের কথা, উল্টো বেগম খালেদা জিয়া জেলে যাবার পর বিএনপি আরো ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে। এদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হওয়াকে সাধারণ মানুষ ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছে। মানুষ মনে করছে, বেগম খালেদা জিয়া অর্থ আত্মসাত করেননি। সরকারের চাপেই আদালত বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে এক্ষেত্রেও ফল হয়েছে উল্টো। 
বিএনপি নেতা-কর্মীদের গণহারে আসামি করে সাম্প্রতিক সময়ে যে হাজার হাজার গায়েবি মামলা দিচ্ছিলো পুলিশ, এগুলো বরং হিতে বিপরীত হয়েছে। এটি করতে গিয়ে পুলিশ এতো কাঁচা কাজ করেছে যে, পুরো পুলিশ বিভাগের কর্মকা-কেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত পুলিশ বিভাগের এমন কর্মকা-ের সমালোচনা করেছেন। যারফলে পুলিশ এখন অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। 
পর্যবেক্ষকদের মতে, সর্বশেষ ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলাটিকে নির্বাচনের সময় পর্যন্ত টেনে আনা হয়েছিল যে উদ্দেশ্যে সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। মনে করা হয়েছিল, এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপি হরতালসহ বড় কর্মসূচি দেবে। হরতাল-ভাঙচুরের অজুহাতে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ব্যাপকহারে ধর-পাকড়ের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটি ভেস্তে গেছে। এদিকে, রায়ের আগে এমন কথা প্রচারিত হচ্ছিল, রায়ে তারেক রহমানকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা এমন প্রচারণা চালানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল যে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ফেরারী আসামি। কিন্তু যে কারণেই হোক রায়টি সেভাবে হয়নি।
এগুলো ছাড়াও আরো যেসব রাজনৈতিক পরিকল্পনা আওয়ামী লীগ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে নিয়েছে বা নিচ্ছে তার কোনোটিই তেমন একটা সফল হচ্ছেনা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
আওয়ামী লীগের ভয়-আতংক
২০১৩-১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিনির্ধারকরা যা কিছুই করেছেন তাতে তাদের মধ্যে কোনো টেনশনের লেশমাত্রও ছিল না। তবে তখন দল বা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা কী পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছিলেন সাধারণ নেতা-কর্মীরা যেহেতু তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না তাই তাদের মধ্যে বেশ খানিকটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি উল্টো। নেতা-কর্মীরা এখনও অনেকে মনে করছেন, যত সমস্যাই আসুক না কেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাদুর কাঠি দিয়ে সব সংকট উৎরে যাবেন। তবে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এবার ভেতরে ভেতরে চরম টেনশন বিরাজ করছে, যদিও তারা প্রকাশ করছেন না। কারণ, বাস্তব অবস্থা প্রকাশ করলে হিতে বিপরীত হবে। তাতে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ভীতি-আতংক ছড়িয়ে পড়বে। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নীতিনির্ধারকরা আশংকা করছেন তফসিল ঘোষণা হলেই পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সেই পরিস্থিতি উৎরানো সম্ভব হবে না। বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও সরকারের এখনকার বড় ভয় হলো বিদেশিদের নিয়ে। সরকার আশংকা করছে, তাদের বিরুদ্ধে সুকঠিন ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এবং এসব ষড়যন্ত্রে বিদেশিরা সরাসরি জড়িত। গতবার ভারত একচেটিয়াভাবে সর্বশক্তি দিয়ে সঙ্গে ছিল। তখন ষড়যন্ত্র যা কিছু হয়েছে সেটি বিরোধীদল অর্থাৎ বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে। এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। এবার ভারত পাশে তো নেই-ই, উল্টো সরকার আশংকা করছে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান ষড়যন্ত্রে ভারতেরও সায় আছে। 
যদিও ভারতের এবারের পলিসি হচ্ছে, ‘নিরপেক্ষ’। তারা পরিষ্কারভাবে বলে আসছে, বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার বাইরে তারা যাবে না। সর্বশেষ ভারতীয় হাইকমিশনার বলেছেন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চান তারা। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো তো এ বিষয়ে আরো এক পা এগিয়ে। পরিস্থিতি এমন, যে কোনো মূল্যে একতরফা নির্বাচন ঠেকাবে বিদেশিরা। কিন্তু সরকারেরর জন্য এটিই সবচেয়ে বড় সমস্যা। নিরপেক্ষ নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হবে। সরকারি সংস্থাসহ প্রায় সকল জরিপেই এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
এদিকে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের প্রস্তুতির যে তথ্য দিচ্ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। আওয়ামী লীগ তো নয়ই, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষেও সম্ভাব্য এই আন্দোলন ঠেকানো মুশকিল হয়ে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া ক্ষমতা থেকে পড়ে গেলে যে, কী অবস্থা হবে তা সবারই কমবেশি জানা আছে। এসব কারণে আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এখন চরম ভয়-আতংক কাজ করছে।
কূটনীতিকদের দৌড়ঝাপ
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় যতই ঘনিয়ে আসছে বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যেও তৎপরতা ততই বাড়ছে। নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রতিনিয়ত নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন, বৈঠক করছেন কূটনীতিকরা। সরকারের কর্মকা- এবং বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করছেন। সময়ে সময়ে এ নিয়ে কথাও বলছেন। প্রেস ব্রিফিংসহ বক্তৃতা-বিবৃতিতে তারা প্রায়ই একই কথা বলছেন। বিরোধীদল অর্থাৎ বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে সরকারের সংলাপ বা আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছেন বিদেশি কূটনীতিকরা। 
সর্বশেষ গত ১৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাত সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন বৃটেন, জার্মানি, স্পেন, সুইডেন, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি। বৈঠকে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে কূটনীতিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এদিকে একই দিনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট এবং ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা সাক্ষাত করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে। গত সপ্তায় একই সময়ে মার্কিন উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিস জি ওয়েলস বাংলাদেশ সফরে এসে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুটি বিশেষজ্ঞ দল শিগগিরই বাংলাদেশ সফরে আসবে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনের তফসিলকে ঘিরে বিদেশিদের আরো নানা ধরনের ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অগ্রযাত্রা 
অনিশ্চয়তা ও বাধা-বিঘ্নে পর অবশেষে জাতীয় ্ঐক্যপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। বরং বাধা প্রদানকারী বি চৌধুরী, মাহী ও মান্নানরাই চলমান রাজনীতি থেকে অনেকটা ছিটকে পড়েছেন। দলটি ইতিমধ্যে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারী এবং শাহ আহম্মেদ বাদলের নেতৃত্বে আলাদা বিকল্প ধারা গঠিত হয়েছে। যদিও এমনটা তাদের জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। এমনকি ঐক্যের পিঠে ছুরিকাঘাত করার দায়ে অভিযুক্তও হয়েছেন তারা। তাদেরকে বিকল্প ধারা থেকে বহিষ্কার করেছে একটি অংশ আলাদা দল গঠনের মাধ্যমে। দেশের চলমান রাজনীতিতে এ মুহূর্তে গুরুত্ব হারিয়েছে বিকল্প ধারা। 
শুরুতে ‘খুচরা-আধুলি দলের ঐক্য’ বলে টিটকিরি দিতে থাকলেও এখন ক্রমেই গুরুত্ব না দিয়ে পারছে না জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে। জাতীয় ঐক্যকে তাদের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ বা সরকার। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলতে বাধ্য হয়েছেন, ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে কথা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বস্তুত, এখন তারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে চিন্তিত। ঐক্যফ্রন্টের বিরুদ্ধে হইচই করতে গিয়ে নিজেদের উদ্বিগ্নতাই প্রকাশ পেয়েছে। 
বিএনপিসহ বিরোধীদলগুলোর সমন্বয়ে গড়ে উঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নতুন কর্মসূচি নিয়েও উদ্বিগ্নতা তৈরি হয়েছে সরকার বা সরকারি দলের মধ্যে। আর সেই কারণেই সিলেটের কর্মসূচির প্রথমে অনুমতি দিয়েও পরে তা প্রত্যাহার করেছে সরকার। কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট ঘোষণা করেছে, তারা অনুমতি না পাওয়া সত্ত্বেও সিলেট যাবে। সরকার যেহেতু ২৩ অক্টোবরের সমাবেশের অনুমতি বাতিল করেছে তাই তারা ২৪ অক্টোবর সিলেট যাবে। এরপর ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম এবং ৩০ অক্টোবর রাজশাহী সফরের কর্মসূচি রয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট ইতিমধ্যে বিদেশি কূটনৈতিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে। সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের সঙ্গেও মতবিনিময় করার পরিকল্পনা রয়েছে। 
এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আদলে আ্ইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলেছে। জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্ট নামে আইনজীবীদের একটি জোট এরই মধ্যে গঠন করা হয়েছে। এই ফ্রন্টের ব্যানারে আইনজীবীদের একটি মহাসমাবেশের ডাক দেওয়া হবে।   
এরশাদকে নিয়ে সরকারের দুশ্চিন্তা
জাতীয় পার্টি এবং হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে নিয়ে এ মুহূর্তে সরকার বেশ দুশ্চিন্তায় আছে। জাতীয় পার্টিকে হাতে রাখতে গত কয়েক মাসে এরশাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে। কিন্তু তারপরও যতোটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে, এরশাদকে বাগে বা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এরশাদের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। এরশাদ-জিএম কাদের আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেছিলেন। অন্যদিকে রওশন সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে তার অনুসারীদের নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। অসুস্থতার কথা বলে এরশাদকে হাসপাতালে রাখা হয়। যদিও এরশাদ ও রওশনের মধ্যকার এই বিভেদকে পরে কেউ কেউ ‘নাটক’ বলে আখ্যায়িত করেন। 
এবার কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন। কিন্তু সম্ভবত এবার আর সেই নাটকের দিকে যাচ্ছে না জাতীয় পার্টি। বলা হচ্ছে, এরশাদ এককভাবেই দলের ভূমিকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। ইতিমধ্যেই গত ৬ অক্টোবর দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রেসিডিয়ামের যৌথসভায় নির্বাচন কেন্দ্রীক সকল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চেয়ারম্যান এরশাদের উপর অর্পন করা হয়েছে। এ রকমের একটা গুজব রয়েছে যে, ড. কামালের সঙ্গে এরশাদ সম্প্রতি বিদেশ সফরকালে গোপন বৈঠক করেছেন। অবশ্য, ড. কামাল এবং এরশাদ উভয়ই এধরনের বৈঠকের খবর অস্বীকার করেছেন। কিন্তু জাতীয় পার্টির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের তলে তলে যোগাযোগ চলছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। আর এ কারণেই সরকারের মধ্যে এরশাদকে নিয়ে টেনশন বাড়ছে।
অন্য দলগুলোও একই পথে
জামায়াতে ইসলামী তো আছেই, এছাড়া দেশের অন্যান্য ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোও অনেকটা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবির সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, যাদেরকে ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হতো- এরাও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করে ‘সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন’র দাবি জানিয়েছে। এরপর অন্যতম আরেক ইসলামী রাজনৈতিক দল খেলাফত মজলিসও বড় জনসভা করে একই দাবি জানিয়েছে। সিপিবি, বাসদসহ বামফ্রন্টকে আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে টানার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল। তাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এই বামফ্রন্টও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবির সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথা বলছে। 
এদিকে হেফাজতে ইসলামকে হাতে রাখার বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিল। কওমী সনদের সরকারি স্বীকৃতিসহ এসব উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্বর্ধনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। কিন্তু, তারপরই তার নেতৃত্ব নিয়ে সমস্যা বেধে যায়। অবশ্য আহমদ শফী নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীকে সম্বর্ধনা দেওয়ার ব্যাপারে এখনো অটল রয়েছেন। কিন্তু এতে আওয়ামী লীগের খুব বেশি লাভ হবে বলে মনে করা হচ্ছে না। কারণ, হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মী, সমর্থকরা অধিকাংশই আওয়ামী লীগের রাজনীতি বিরোধী। জাতীয় নির্বাচনে এদের অকুণ্ঠ সমর্থন বা ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, মনে করছেন খোদ আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরাই।