মঙ্গলবার, ২৩-অক্টোবর ২০১৮, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ন

বোমা ফাটালেন এসকে সিনহা: বিব্রত সরকার

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১১:০০ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা’র (এস কে সিনহা) লেখা বই ‘ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের ঝড় বইছে। দেশি বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েও খোলামেলা কথা বলছেন এস কে সিনহা। এই বইয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়টি যেন সরকারের পক্ষে যায়, সেজন্যে তার ওপর সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে চাপ তৈরি করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেছেন, তাকে সরকারের চাপ এবং হুমকির মুখে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। এই বইতে বিচারপতি সিনহা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন কোন পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়েছিল এবং কীভাবে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং তারপর কেন তিনি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। এস কে সিনহা লিখেছেন, ২০১৭ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে ঐতিহাসিক এক রায় দেয়ার পর বর্তমান সরকার আমাকে পদত্যাগ করতে এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। ওই সময় তাকে বাসভবনে আটকে রাখা হয় এবং আইনজীবী ও বিচারপতিদেরকে তার সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেয়া হয়। কীভাবে তাকে ছুটিতে যাওয়ার, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এবং বিদেশে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বইতে সেই বিবরণ দিয়েছেন এস কে সিনহা। সরকারের পছন্দমতো রায় লিখতে রাজি না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখা এবং চাপ দিয়ে দেশত্যাগ ও পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ এনেছেন সাবেক এই প্রধান বিচারপতি।
একই সাথে তাঁকে চাপ ও হুমকি দেওয়ার জন্য সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে (ডিজিএফআই) তাঁর সদ্য প্রকাশিত আত্মজীবনীতে অভিযুক্ত করেন তিনি। জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এস কে সিনহার এই বই প্রকাশের ঘটনায় চরমভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে সরকার। রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এ ধরনের আচরণে বিভিন্ন মহল সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করছে। 
বিশ্বখ্যাত ই কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজানের সর্বোচ্চ বিক্রির তালিকায় আসা আত্মজীবনীমূলক এই বইয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি দাবি করেছেন, বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের হুমকি ও ভীতি প্রদর্শনের মুখে তিনি দেশ ছেড়েছেন। তার পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিদেশ থেকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। আর সেই হুমকি এসেছিলো খোদ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের তরফ থেকে বলে দাবি করা হয়েছে বইটিতে। যদিও সংস্থাটি এ বিষয়ে প্রাথমিকভাবে গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য জানাতে রাজি হয়নি।
৬১০ পৃষ্ঠার এই বইটি অ্যামাজনের কিন্ডল সংস্করণে বিক্রি হচ্ছে। বইয়ের কিছু অংশ অ্যামাজনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। 
বিচারপতি সিনহা বইটির ভূমিকায় লিখেছেন, ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনে যুক্ত থাকার সুবাদে এর রূপান্তর এবং বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাগুলো দেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সিলেটের নিম্ন আদালতের একজন আইনজীবী হিসেবে শুরু করে বাংলাদেশের বিচারালয়ের শীর্ষ অবস্থানে, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য হয়েছে তার। “কিন্তু ২০১৭ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে ঐতিহাসিক এক রায় দেওয়ার পর বর্তমান সরকার আমাকে পদত্যাগ করতে এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে” তিনি বইয়ে বলেন।
বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়াকে ওই রায়ের মাধ্যমে অবৈধ ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট। আর তারপর যা ঘটেছে, তাকে বিচারপতি সিনহা বর্ণনা করেছেন ‘নজিরবিহীন ঘটনা’ হিসেবে। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। কিন্তু কার্যকাল শেষ হওয়ার ৮১ দিন আগেই তাকে ‘নজিরবিহীন’ ওই পরিস্থিতির মধ্যে পদত্যাগ করতে হয়।
বাংলাদেশে আর কখনও কোনো প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এত আলোচনা হয়নি; আর কোনো প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগও করতে হয়নি। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং কিছু পর্যবেক্ষণের কারণে ক্ষমতাসীনদের তোপের মুখে ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে তিনি ছুটিতে যান। সরকারের পক্ষ থেকে অসুস্থতার কথা বলা হলেও ১৩ অক্টোবর তিনি রীতিমত তার পরিস্থিতি সম্পর্কে বোমা ফাটিয়ে বিদেশে চলে যান।
বিচারপতি সিনহা বলে যান, তিনি অসুস্থ নন, ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় তিনি ‘বিব্রত’। তার ছুটির মেয়াদ শেষে ১১ নভেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিচারপতি সিনহা পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ওই সময় ক্ষমতাসীন দলের নেতা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, একজন বিচারপতির মাধ্যমে দেশে জুডিশিয়াল ক্যু করার চেষ্টা হয়েছিল। আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, শৃঙ্খলা বিধির নামে তা কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন বিচারপতি সিনহা।
বিচারপতি সিনহার বইয়ের ভূমিকাসহ ১০টি অধ্যায় অ্যামাজানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আইন পেশায় এস কে সিনহার টিকে থাকার সংগ্রাম, নানা অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের নৈতিকতার ‘অবক্ষয়’, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও বাংলাদেশের ‘শিশু গণতন্ত্রের’ অবস্থা, পুলিশের ‘বাড়াবাড়ি’, জরুরি অবস্থার প্রভাব এবং ‘ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ডিজিএফআইয়ের অর্থ আদায়ের’ বিষয়ে আলোকপাত করার কথা বলা হয়েছে ভূমিকায়।
শৈশব থেকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচার এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনাল নিয়েও এ বইয়ে লিখেছেন বিচারপতি সিনহা।
তিনি লিখেছেন, ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়া হল তখন থেকেই টানাপড়েনের শুরু। ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। পরের বছর জুলাইয়ে আপিল বিভাগের রায়ে তা বহাল থাকলে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় পড়েন বিচারপতি সিনহা। পরের মাসে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে তাতে বিচারপতি সিনহার ৪০০ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ দেখে শুরু হয় ব্যাপক বিতর্ক। ওই পর্যবেক্ষণে সংসদ ও সরকার এবং জাতির জনককে খাটো করা হয়েছে অভিযোগ তুলে বিচারপতি সিনহার পদত্যাগের দাবি তোলে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা; অন্যদিকে বিএনপি প্রধান বিচারপতির পক্ষে দাঁড়ায়।
সেই সময়ের কথা তুলে ধরে বিচারপতি সিনহা তার বইয়ে লিখেছেন, “আপিল বিভাগের রায়ের পর ১৩ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের রায় বাতিলের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী, তার দলের লোকজন এবং সরকারের মন্ত্রীরা আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। আইনমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আনতে থাকেন।”
বিচারপতি সিনহা অভিযোগ করেছেন, ওই সময় তাকে তার বাসভবনে আটকে থাকতে হয়। আইনজীবী ও বিচারপতিদেরকে তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছিল না। সংবাদমাধ্যমকে বলা হচ্ছিল- তিনি অসুস্থ, ছুটির আবেদন করেছেন।
“কয়েকজন মন্ত্রী বলছিলেন যে, আমি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাব। ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর আমি যখন দেশ ছাড়তে বাধ্য হলাম, একটি বিবৃতি দিয়ে আমি বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করলাম যে আমি অসুস্থ নই, চিরতরে দেশ ছেড়েও যাচ্ছি না।”
“আমি আশা করছিলাম, আদালতে আমার অনুপস্থিতি আর আদালতের নিয়মিত অবকাশের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা থিতিয়ে আসার সুযোগ পাবে এবং সুবিবেচনার উদয় হবে, সরকার হয়ত ওই রায়ের মর্ম বুঝতে পারবে, তারা বুঝবে যে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্র ও দেশের জন্যই দরকার।”
“শেষ পর্যন্ত আমার পরিবার আর স্বজনরা যখন দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, যাকে বলা হয় ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স, তাদের হুমকির মুখে পড়ল, তখন আমি বিদেশ থেকেই পদত্যাগপত্র জমা দিই।”
৬১০ পৃষ্ঠার এই বইটি অ্যামাজনে পাওয়া যাচ্ছে। অ্যামাজনের ওয়েবসাইটে বইটির ভূমিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে এস কে সিনহা লিখেছেন, বিচার বিভাগ একটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য এবং অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং এর স্বাধীনতা একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে আবির্ভূত বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে গণতন্ত্রকে সংবিধানে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। সংবিধান নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। ১৯৭৪ সাল থেকে বিচার বিভাগের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার বয়ানের পর এস কে সিনহা ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর সৃষ্ট পরিস্থিতির ব্যাপারে আলোকপাত করেন। তিনি লিখেছেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সর্বোসম্মত রায়ে শাসন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রবণতা সম্পর্কে দেয়া পর্যবেক্ষণ সাধারণ নাগরিক এবং সুশীল সমাজের প্রশংসা পায়। দেশি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ রায়। তবে ধারাবাহিকভাবে দুঃখজনক ও অভূতপূর্ব কিছু ঘটনা ঘটে যা বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে। রায়ের পর তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে এস কে সিনহা লিখেছেন, “রায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে সংসদ একটি প্রস্তাব পাস করে। প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা সংসদে আমার সমালোচনায় মুখর হন।” কি পটভূমিতে তিনি দেশত্যাগ এবং বিদেশে বসে পদত্যাগ করেছিলেন তার তরতাজা বর্ণনা দিয়েছেন বইয়ে। 
বইটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বিচার বিভাগ থেকে তার বিদায় পর্বটি
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী সাবেক এই প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ২০১৭ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে ঐতিহাসিক এক রায় দেয়ার পর বর্তমান সরকার আমাকে পদত্যাগ করতে এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। ওই সময় তাকে বাসভবনে আটকে রাখা হয়। আইনজীবী ও বিচারপতিদেরকে তার সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন এস কে সিনহা। কীভাবে তাকে ছুটিতে যাওয়ার, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এবং বিদেশে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বইতে সে ব্যাপারেও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এস কে সিনহা।
একটি দিনের কথা তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, অসম্পন্ন কাজ শেষ করার জন্য ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর আমি কোর্টে এলাম। সকাল সাড়ে ১১টায় আমার ব্যক্তিগত সচিব আনিসুর রহমান আমাকে জানালেন যে, দুপুর ১২টায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান একটি গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তা। আমি তাকে আসার অনুমতি দিলাম। তিনি সময়মতো এলেন এবং আমার কাছে সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরে তার একজন অফিসারের সঙ্গে কেন খারাপ ব্যবহার করেছি তা জানতে চাইলেন। তার বডি ল্যাংগুয়েজ ও আমাকে সরাসরি যেভাবে চার্জ করছেন তাতে হতবাক হয়ে গেলাম। তিনি এমনভাবে কথা বলছেন যে, আমি তার অধীনস্থ কোনো কর্মচারী। আমি ভাবলাম, এই অফিসার কীভাবে একজন প্রধান বিচারপতিকে চার্জ করার এমন সাহস পেলেন। তিনি আমাকে বললেন, আমার জানা উচিত যে, আমার দেয়া ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর বিএনপি এতটাই খুশি হয়েছে যে, তারা নিজেদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেছে। তারা টেক্সট মেসেজ বিনিময় করেছে যে, তারা শিগগিরই ক্ষমতায় আসছে। 
আমি জবাবে তাকে বললাম, কে ক্ষমতায় আসবে সেটা আমার কোনো বিবেচনার বিষয় নয়। এতে যদি কেউ আহত হন তাহলে সেটা তার দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এবং এই দুর্বলতা হলো সরকারের। তিনি আমাকে আরো বললেন, তিনি এবং প্রধানমন্ত্রীর মাঝখানে কেউ নেই। তিনি যা বলবেন তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবে আমার নেয়া উচিত। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করেছেন। এরপর তিনি বললেন, ‘স্যার, ২০১৮ সালের ৩১শে জানুয়ারি পর্যন্ত আপনি চার মাসের ছুটি নেন’। আমি তার এ প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালাম এবং তার কাছে জানতে চাইলাম, তিনি কোন ক্ষমতায় আমাকে নির্দেশনা দিচ্ছেন। তারপর বললাম, আমি ড. গওহর রিজভীর সঙ্গে কথা বলেছি এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা না বলে কিছু করবো না। 
তিনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। আমি তাকে বললাম, ঈদুল আজহার দিনে প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন যে, যা ঘটেছে তা নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন। এ কথা শুনে গোয়েন্দা কর্মকর্তা একটু ঝাঁকুনি খেলেন বলে মনে হলো। তারপর তিনি আমাকে বললেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। এ কথা শুনে আমি চিৎকার করে বললাম ‘কী! আপনি আপনার সীমা অতিক্রম করছেন। এভাবে কথা বলার ক্ষমতা আপনাকে কে দিয়েছে?’ জবাবে তিনি বললেন, প্রমাণ ছাড়া তিনি কিছু বলেননি। আমি বললাম যে, তার দুঃসাহস দেখে আমি বিস্মিত। এরপর তিনি আমার অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন। যদিও আমি আমার ধৈর্য ও সাহস দেখিয়েছি ওই কর্মকর্তার প্রতি, একই সময়ে আমি এটাও অনুধাবন করি যে, এই ‘শক্তিধর মানুষটির’ সঙ্গে লড়াই করতে পারব না। তার কাছে আছে একটি অস্ত্র ও পার্স। আমার তো এর কিছুই নেই। আমার শক্তি সহকর্মী বিচারকরা। কিন্তু তারাও এখন আমার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছেন। আমাকে খবর জানানো হয়েছে যে, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পুরো সুপ্রিম কোর্ট ভবন দখলে নিয়েছেন। আমার কর্মকর্তারা আতঙ্কে কাঁপছেন। পরের দিন, আমি জানতে পারলাম যে, আদালতের আইটি সেকশনের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তারা সিসিটিভিতে থাকা গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভিডিও সরিয়ে ফেলেছেন। আমার সচিব আনিস আমাকে অনুরোধ করলেন যাতে আমি এমন কোনো সিদ্ধান্ত না নিই, যাতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। আমি তার শরীরের ভাষা অনুধাবন করতে পারলাম যে, তারা বিপুল পরিমাণে সমস্যা মোকাবিলা করছে। কিন্তু তার সবটা আমাকে জানাচ্ছে না। আমি বুঝতে পেরেছি যে, সব বিচারক আমার বিরুদ্ধে চলে গেছেন এবং যদি প্রশাসন আমার প্রতি পুরোপুরি শত্রুতাপূর্ণ অবস্থানে চলে যায় তাহলে আমি কীভাবে টিকে থাকবো? কোনো বিকল্প খুঁজে না পেয়ে বিচার বিভাগের স্বার্থের কথা চিন্তা করে তিন মাসের পরিবর্তে আমি এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি জানতে পারলাম আমার ছুটির আবেদনপত্র প্রস্তুত করেছে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সাধারণত আমার আবেদনপত্র তৈরি করে দেন আমার সচিব। কিন্তু এ সময় তিনি ছিলেন প্রচণ্ড কড়া পাহারায়। ওই আবেদনে স্বাক্ষর করে আমি দুপুরের দিকে বাসার উদ্দেশে অফিস ছাড়লাম। 
বাসায় ফিরেই জানতে পারলাম, আমার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ সময় পুরো গৃহবন্দীর মতো পরিবেশে আমাকে রাখা হয়। বাইরের কেউ আমার বাসায় প্রবেশ করতে পারেন না। পরের দিন আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্যরা। কিন্তু তাদের অনুমতি দেয়া হয়নি। আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেসব আত্মীয় এসেছিলেন তাদেরকে গেটে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের ছবি তোলা হয়েছে।
তারপরেই তাদের কেউ কেউ প্রবেশ করতে পেরেছেন। একদিন আমার বাড়ির একজন হেলপার তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ৩রা অক্টোবর। এদিন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফোন করে আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি হাসপাতালে ভর্তি হতে চাই কি-না। কিন্তু আমি হাসপাতালে যেতে চাইনি। তাকে বললাম, আমি অসুস্থ নই। ফলে হাসপাতালে যাবো না। আমি একজন অসুস্থ মানুষ হিসেবে নিজেকে দেখাতে চাই না। ওই মুহূর্তের পর থেকে বিএসএমএমইউয়ের একজন অর্থোপেডিক ও একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ গোয়েন্দাদের নির্দেশনামতো আমার বাসভবনে এলেন। তাদের মধ্যে আমি কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর সজল ব্যানার্জির নাম মনে করতে পারছি। আমি দেখলাম তারা খালি হাতে এসেছেন। এমন কি তারা স্টেথেটিস্কোপ পর্যন্ত আনেননি সঙ্গে। আমি তাদের সঙ্গে কৌতুক করলাম। বললাম, মৌলিক যন্ত্রপাতি ছাড়া কেন তারা একজন রোগী দেখতে এসেছেন। আমার দিকে তারা অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকলেন। বাসায় আমার কোনো কাজ ছিল না। তাই আমি তাদের সঙ্গে একসঙ্গে চা ও কফি পান করতে করতে কয়েক ঘণ্টা আলাপ করলাম। তারা এসময় তাদের অসহায়ত্বের কথা জানালেন। আমি তাদের বললাম, প্রধান বিচারপতি যেখানে ভয় পাচ্ছেন না তখন তারা কেন এমন করছেন। সমস্যা তো প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে, তাদের নয়।
এ কথা শুনে তারা মাথা নিচু করলেন। কোনো কথা বললেন না। তাদের জন্য আমার মায়া হলো, কারণ তারা কোনো কারণ ছাড়াই তাদের মূল্যবান সময়ের অনেকটা আমার বাসায় বসে কাটালেন। একদিন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। তার সাক্ষাতের কারণ জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। আমি রেগে গেলাম এবং তাকে বললাম, ভণ্ড হবেন না। যা বলার সুস্পষ্ট করে বলুন। এইভাবে বিচার বিভাগ চলতে পারে না। এই বার্তাটি পৌঁছে দেবেন প্রধানমন্ত্রীকে। জবাবে আইনমন্ত্রী বললেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বার্তাটি পৌঁছে দেবেন। যখন আমার ভাতিজা উত্তরা থেকে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলো তাকে গেটে আটক রাখা হলো তিন ঘণ্টা, আমার বাসভবনে তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হলো না। আমার একজন স্টাফ তার মোবাইল ফোন নম্বর দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। আমি আইনমন্ত্রীকে এসব বিষয় তুলে ধরে বললাম, তার লোকজন এসব কী করছে কা-জ্ঞানহীনের মতো।  
এস কে সিনহা আরো লিখেছেন, ২০১৭ সালের ৫ই অক্টোবর। সময় রাত প্রায় ১০টা। আমার সচিব আনিস আমাকে জানালেন যে, বাসভবনে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান গোয়েন্দা কর্মকর্তা। ওই সময় আমি শুতে যাচ্ছিলাম। এমন অসময়ে সাক্ষাতে আসা বন্ধ করলাম আমি। কিন্তু ওই অফিসার আমার সচিবকে অনুরোধ করেন যে, তিনি মাত্র অল্প কয়েক মিনিটের জন্য আসতে চান। শেষ পর্যন্ত তাকে আমি অনুমতি দিলাম। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এলেন ওই অফিসার।
তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি যেহেতু বিদেশে যেতে চেয়েছি তাহলে কেন আমি যাইনি? আমি তাকে মনে করিয়ে দিলাম যে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে আমি কোথাও যাবো না। আমি জানতে পারলাম, প্রধানমন্ত্রী ফিরবেন ৭ই অক্টোবর। কিন্তু ওই অফিসার আমাকে বললেন, ২০১৭ সালের ৬ই অক্টোবরের মধ্যে আমাকে দেশ ত্যাগ করতেই হবে। তিনিই আমাকে টিকিটের ব্যবস্থা করে দেবেন। তার প্রস্তাব আমি মানলাম না। তিনি আমার বাসভবন ত্যাগ করলেন। তবে বলে গেলেন, অবশ্যই আমাকে ৭ই অক্টোবর বা ৮ই অক্টোবর দেশ ছাড়তেই হবে। 
এই অসন্তোষজনক আলোচনার পর ড. গওহর রিজভী আমাকে ফোন করলেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তার আমার বাসায় আসার কথা তাকে জানালেন আমার স্ত্রী। আমি গওহর রিজভীর কাছে জানতে চাইলাম, অপ্রত্যাশিত এসব ঘটনা কেন ঘটছে। যেসব ঘটনা ঘটে গেছে তার সব শুনে তিনি বিস্মিত হলেন এবং আমাকে বললেন, তিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ৬ই অক্টোবর। তিনি যথারীতি এলেন। তাকে আমি জানালাম, তিনি আমার ঘুম নষ্ট করেছেন।
কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন অন্যকথা। জবাবে তিনি (গওহর রিজভী) আমাকে বললেন, আমার কাছে পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন তা নিয়ে যোগাযোগ করছেন তিনি। আমাকে দেশ ছাড়ার জন্য যে চাপ দেয়া হয়েছে তা শুনে তিনি বললেন, ওই অফিসার আমাকে যা বলেছেন তা মিথ্যা। আমি তাকে বললাম, বিচার বিভাগ এভাবে চলতে পারে না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি সাক্ষাতের আয়োজন করতে তাকে অনুরোধ করলাম। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি বৈঠকের আয়োজন করবেন। তারপর ড. গওহর রিজভী আমাকে আর কিছুই জানাননি। ওবায়দুল কাদেরও আমাকে আশ্বস্ত করেছেন এমন একটি সাক্ষাতের বিষয়ে। কিন্তু পরে তারা দুজনই নীরব হয়ে গেছেন। তারা অসহায় এটা বুঝতে পারলাম। তাই তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করার ইচ্ছা করলো না। তাদেরকে বিব্রতকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিলাম। 
এস কে সিনহা তার বইয়ে আরো লিখেছেন, আমি অনুধাবন করতে পারলাম গোয়েন্দা কর্মকর্তা যা বলেছেন তা যথার্থ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনামতোই তিনি কাজ করছেন। আইনমন্ত্রীও আমাকে কিছু জানাননি। একপর্যায়ে আমি দেখলাম, আমার ফোন কেউই ধরছেন না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। 
এমনকি কাউকে যখন আলোচনার জন্য পাঠাই, তারা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কোনো সাহস দেখায় না। তারা তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। যদি কেউ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে, তাদেরকে গেটে এমন উপায়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় যে, তাতে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এমন সব পরিস্থিতিতে আমি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রথমে আমি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
২০১৭ সালের ৫ই অক্টোবর সিঙ্গাপুর থেকে জি নিউজের একজন সাংবাদিক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন ফোনে। জানতে চান আমার পরিস্থিতি। বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো বিরূপ মন্তব্য করিনি তার কাছে। কিন্তু তাকে বলেছি, আমাদের বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীন নয়। সব সময়, এমন কি জটিল সময়গুলোতে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেছি। 
বঙ্গভবনে যা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি
২০১৭ সালের ১ জুলাই ষোড়শ সংশোধনী বাতিল নিয়ে আপিলের রায় ঘোষণার আগে বঙ্গভবনে এসকে সিনহাকে প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল কি বলেছিলেন সেই প্রসঙ্গও বইয়ে এসেছে।
এস কে সিনহা লিখেছেন, “জুলাই মাসের ১ তারিখ, ২০১৭। সকালবেলা আমার ব্যক্তিগত মোবাইলে একটা কল আসলো। নিজেকে তিনি প্রেসিডেন্টের মিলিটারি সেক্রেটারি পরিচয় দিয়ে জানালেন, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করতে হবে। এই ধরনের ফোন পেয়ে আমি কিছুটা অবাক হলাম। কারণ এসব ক্ষেত্রে সবসময় আমার রেজিস্ট্রারের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে যে কোন বৈঠকের দিন-ক্ষণ ঠিক করা হয়। ফোনে কথা শেষ করার একটু পরেই ০১৭৩০০৯০০৯৫ নাম্বার থেকে মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন মিটিং এর রিকনফার্মেশন করে একটি এসএমএস পাঠালেন। আমি উদ্বিগ্ন এবং হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকলাম।
যা-ই হোক, নির্দিষ্ট সময়ের পাঁচ মিনিট আগেই আমি বঙ্গভবনে পৌঁছালাম। সামনের বারান্দায় মিলিটারি সেক্রেটারি আমাকে রিসিভ করে একটি রুমে নিয়ে গেলেন। আমি শুধু অবাক হচ্ছি। কারণ বঙ্গভবনে আমি অনেকবার এসেছি, সবসময় আমাকে অভ্যর্থনার জন্য নির্দিষ্ট রুমে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু তিনি এদিন আমাকে অফিসারদের একটা রুমে নিয়ে গেলেন। ভাঙাচুরামার্কা এক রুমে তিনি নিজে টেবিলের ওপাশে একটা চেয়ারে বসলেন এবং আমাকে সামনের সোফাতে বসালেন। আমি অপমানবোধ করতে লাগলাম এবং চিন্তা করতে থাকলাম এভাবে বসার চেয়ে বরং ভেগে যাওয়াই ভালো হবে। এইটা একজন প্রধান বিচারপতির প্রাপ্য আচরণ না।
এইসময় তিনি আমার সাথে এই সেই কথাবার্তা বলে সময় কাটাতে চাচ্ছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন আমি চা বা কফি খাবো কি না, আমি বললাম নো থ্যাংকস।
এভাবে পয়তাল্লিশ মিনিট সময় পার হয়ে গেলো। তারপর এক সময় তারা আমাকে প্রেসিডেন্টের রুমে নিয়ে গেলো। ওখানে উপস্থিত মানুষদের দেখে তো আমি হতবাক। প্রেসিডেন্টের সাথে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
প্রাথমিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর শেখ হাসিনা আর আনিসুল হক মিলে আমাকে ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায় প্রসঙ্গে চেপে ধরলেন। দীর্ঘক্ষণ তর্কবিতর্ক হলো। অ্যাটর্নি জেনারেল আমাকে বললেন, এ পর্যন্ত অসংখ্য এক্সট্রাঅর্ডিনারি রায় দিয়ে বিচার বিভাগের মাধ্যমে আমি যে খেদমত করেছি তার জন্য সরকার আমাকে চিরকাল মনে রাখবে। কিন্তু এখন এই একটা রায় প্রসঙ্গে দ্বিমত করে আমি সব বরবাদ করে দিচ্ছি। এই কথা শুনে আমার খুব অপমানবোধ হলো। 
আমি বললাম, “এই ধরনের প্রক্রিয়াকে প্রশ্রয় দিলে আমার পক্ষে মর্যাদার সাথে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা খুবই দূরহ হয়ে উঠবে।”
আলোচনার এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী “যে কোনো উপায়ে সরকারের পক্ষে রায় দেবার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন।” সিনহা লেখেন, “অন্য বিচারপতিরা যদি সরকারের বিপক্ষেও মতামত দেন, তবুও সরকারের পক্ষে আমার একার মতামত দেবার জন্য প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং অ্যাটর্নি জেনারেল বারবার আমাকে চাপ দিচ্ছিলেন। অ্যাটর্নি জেনালের শুধু আমাকে চাপই দিচ্ছিলেন না, বরং একই সাথে আমার সিন্ধান্ত পরিবর্তন করার জন্য অনুরোধও করছিলেন।”
যখন তারা বুঝতে পারলেন যে আমাকে আমার মতামত থেকে নড়ানো সম্ভব না, তখন হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেগে গেলেন। তিনি  বললেন, আমার সম্পর্কে সব গোপন খবরাখবর তার ভালো করেই জানা আছে।
তার কথাবার্তা শুনে আমি এবার পুরোপুরি বেকুব হয়ে গেলাম। আমার মনে হচ্ছিলো ক্ষমতায় থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী অন্ধ হয়ে গেছেন। তার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো পরবর্তী নির্বাচনে আবার ক্ষমতায় আসার জন্য সুপ্রিম কোর্টকে ব্যবহার করা।
পুরো সময়টাতে প্রেসিডেন্ট নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকলেন, মাঝে মধ্যে শুধু ছোটখাটো দু’একটা মন্তব্য করছিলেন। ওই দিন এ মিটিং এতো গোপনভাবে করা হয়েছিলো যে, সে রাতে আমাদের জন্য কোনো খাবারের আয়োজনও করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে এগারোটার দিকে কোন সমাধান ছাড়াই মিটিং শেষ হয়ে যায়। “হঠাৎ প্রধানমন্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, প্রধান বিচারপতি কিছুই খাননি এবং সকালে উনার কোর্ট আছে।”
 তখন আমার এতো ক্ষুধা লেগেছিলো যে আমি দাঁড়িয়ে ঠিকমতো ব্যালেন্স রাখতে পারছিলাম না। যন্ত্রের মতো টলতে টলতে গাড়িতে এসে উঠি এবং বাসায় পৌঁছার পর শুধু এক গ্লাস পানি খেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ি। আমার অবস্থা দেখে আমার স্ত্রী খাবার দাবার নিয়ে সেরাতে আর কোনো কথা বলেনি।

অসুস্থতা ও আইনমন্ত্রীর সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদের পাঠ
একেবারে শুরু থেকেই সারা সময়ে আমার ওপর গোয়েন্দা সংস্থার চাপ ছিল যেন আমি বলি যে, আমি অসুস্থ। তারা আমাকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করাতে ব্যর্থ হলো, তখন তারা চিকিৎসার জন্য আমাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। পরে তাদের উদ্দেশ্য আমার কাছে পরিষ্কার হয়। এ কৌশল ছিল আইনমন্ত্রীর। তিনি কখনো সংবিধান মোতাবেক চলেননি। অতীতে তিনি শুধু কিছু ক্রিমিনাল বিষয়ে কাজ করেছেন। তাই সংবিধানের ৯৭ নম্বর অনুচ্ছেদ পড়ে তার মনে হয়েছিল, আমি যদি অসুস্থতার জন্য ছুটি নিই বা হাসপাতালে ভর্তি হই তাহলে প্রধান বিচারপতির কাজ চালিয়ে নিতে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞাকে সরকারের দায়িত্ব দেয়া সহজ হবে। অন্যথা হলে, বার ও অন্যান্য বোদ্ধা মহলের সমালোচনা হজম করা খুব কঠিন হবে। বিভিন্ন সময় যখন আমার পূর্বসূরিরা দেশের বাইরে থেকেছেন তখন অনেকবার আমি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছি। 
সাধারণত আমি শুধু রুটিন ওয়ার্কগুলো করেছি। বিচার বিভাগের প্রশাসন সম্পর্কিত কোনো বিষয়ে কাজ করিনি। অফিসিয়াল রেকর্ড আরো বলে যে, প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনকারী বিচারকরা বিচার বিভাগের প্রশাসন সম্পর্কিত কোনো নীতিনির্ধারণের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেননি। এর কারণ, প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে সবচেয়ে সিনিয়র বিচারক তার দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেননি। প্রেসিডেন্ট পরিচালিত আলাদা একটি অনুষ্ঠানে শপথ নেন প্রধান বিচারপতি। তার কার্যক্রম সম্পর্কে সংবিধানে ও আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। 
দীর্ঘ সময় ধরে এই চর্চা চলে আসছে। কিন্তু এই সময়ে সব কিছু ভিন্ন ঘটলো। যেদিনটিতে আমি সরকারি বাসভবনে অবরুদ্ধ হয়ে পড়লাম সেদিনই বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা এমন আচরণ দেখাতে চাইলেন যেন তিনিই প্রধান বিচারপতি। তিনি সব অফিসারকে একজনের পর একজনকে ডেকে হুমকি দিতে লাগলেন এবং তাদেরকে বললেন যে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। সরকার তাদের আচরণে সন্তুষ্ট নয়। 
তিনি সরকারের মুখপাত্র হয়ে উঠলেন এবং সরকারকে, বিশেষ করে আইন মন্ত্রণালয়কে সন্তুষ্ট রাখতে চাইলেন। দুটি ভিন্ন সময়ে বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস সন্ধ্যার দিকে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। এই খবর পেয়ে বিচারপতি রুহুল কুদ্দুসের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা। বললেন, বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ আমার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু কেন রুহুল কুদ্দুস আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। 
সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পর আমি মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি যে, সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে আমার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। বুঝতে পারি যে, আমি মিডিয়াকে বলেছিলাম আমি অসুস্থ নই। তাই আইনমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খবর জেনেছেন। প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে মুখ খোলার পর ক্ষমতাসীন দলের প্রতি অনুগত একাত্তর টিভি একটি টকশোর আয়োজন করে। এতে আনা হয় সরকারের রাজনৈতিক খেলার পুতুলগুলোকে। 
সেখান থেকে আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের প্রচারণা শুরু হতে থাকে। যখন দৈনিক জনকণ্ঠ ও এর একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল তখনও একই রকম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। তখন ওই টকশোর একটি সিডি চেয়ে বসেন আদালত। কিন্তু আইনমন্ত্রীর অনুরোধে এ বিষয়ে আমি কোনো পদক্ষেপ নিইনি। একটি নৈশভোজে বিচারপতিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রেসিডেন্ট তাদেরকে বলেছেন, আমার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে। আমার ক্ষমতার সময়ে অনেক শক্তিধর ব্যক্তি ও দেশের অনেক ধনী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছি। এর মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, আশিয়ান সিটি, ফ্যান্টাসি কিংডম, চট্টগ্রামে জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকদের বিরুদ্ধে, সিলেটের রাগীব আলীর বিরুদ্ধে। গুলশান, বনানী, মতিঝিল, ধানমন্ডি ও মগবাজার এলাকায় মূল্যবান সম্পত্তি নিয়ে হাইকোর্টের রায়কে আমি বাতিল করে দিয়েছি।
আর এখন প্রেসিডেন্ট ও সরকারের মদদপুষ্ট মিডিয়া আমাকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। যদি তাদের অভিযোগ সত্যি হয় তাহলে কার কাছ থেকে আমি বে-আইনি সুবিধা নিয়েছি? আর এসব অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে আনা হচ্ছে শুধু ষোড়শ সংশোধনীর রায় দেয়ার পরই। ওই রায় দেয়ার পর সরকার আমার চরিত্র হননের চেষ্টা করছে বেপরোয়াভাবে। এর মধ্য দিয়ে তারা তাদের অন্যায় ও অস্বাভাবিক কর্মকা-কে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
‘আপনাকে বলা হলো বিদেশে যাবেন, কিন্তু যাচ্ছেন না’
বই প্রকাশের পর বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সিনহা বলেন, ‘আমাকে যখন কমপ্লিটলি হাউজ এ্যারেস্ট করা হলো, ...তখন বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিদিন একজন করে ডাক্তার আমার কাছে পাঠানো হতো। আমি নি:শ্বাস নিতে পারছিলাম না। এর মধ্যে ডিজিএফআইয়ের চিফ এসে বললেন, হ্যাঁ আপনাকে বলা হলো আপনি বিদেশ যাবেন, আপনি যাচ্ছেন না।’
‘আমি বললাম: কেন যাবো আমি বিদেশে?’
‘আপনি চলে যান, আপনার টাকা পয়সার আমরা