সোমবার, ২২-অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৪৬ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ধ্বংসের নেপথ্যে সিন্ডিকেট: হাতিয়ে নিয়েছে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ধ্বংসের নেপথ্যে সিন্ডিকেট: হাতিয়ে নিয়েছে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১২:১৬ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম মাধ্যম জনশক্তি রফতানি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক বড় শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। এ খাতে শেষ আশার আলো- মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারও এখন বন্ধ। নতুন বাজার চালু করতে না পারায় জনশক্তি রফতানি খাতে যে অস্থিরতা চলছিল তা এখন আরো মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। টালমাটাল এ পরিস্থিতিতে যখন নতুন কর্মী যাওয়ার পথ সীমিত হয়ে আসছে তখন পুরোনো কর্মীদের ফেরত পাঠানোর ঢল নামার শঙ্কাও আছে। লক্ষাধিক অবৈধ বাংলাদেশিকে ফিরতে হচ্ছে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে। এ ছাড়া নির্যাতন এতটাই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে সৌদি আরবে বাংলাদেশের নারী কর্মী পাঠানোর বিষয়েও।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানান উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কোনো শ্রমবাজারের দ্বার খোলেনি। ইউরোপ, আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর দুয়ার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বন্ধ। চলতি বছরে বিদেশগামী কর্মীর ৯০ শতাংশেরই গন্তব্য পুরোনো বাজার- মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে। কিন্তু এর মধ্যে সৌদি আরবের নতুন নিয়ম, আমিরাতের ভিসা বন্ধ, কুয়েতের নতুন নিষেধাজ্ঞা, লিবিয়ার অস্থিরতা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে। শুধু মালয়েশিয়ায় সরকারি পর্যায়ে জিটুটি প্লাস পদ্ধতিতে কর্মী প্রেরণই আশার আলো ছড়াচ্ছিল। কিন্তু বাংলাদেশি ১০ এজেন্সি সিন্ডিকেট করে মানব পাচারের মাধ্যমে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজারের দরজাও শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেলো। 
কুয়ালালামপুর থেকে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ কমিটির বৈঠকে ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের শ্রমিক নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত ১৪ আগস্ট মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে বিদেশি শ্রমিক ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বিশেষ কমিটির ওই বৈঠক হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত মালয়েশিয়া গত ২১ আগস্ট বাংলাদেশকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২ দেশের সরকারের মধ্যে ২০১৫ সালের ২৬ আগস্টের ঐকমত্য অনুযায়ী শ্রমিক নিয়োগ বা বাতিলের অধিকার মালয়েশিয়ার রয়েছে। সে অনুযায়ী মালয়েশিয়া শ্রমিক নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিয়োগ বন্ধের এ সিদ্ধান্ত ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। শ্রমিক নিয়োগের বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ২ দেশের মন্ত্রীদের মধ্যে আলোচনার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। 
মালয়েশিয়া শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ২১ আগস্ট বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে বলে স্বীকারও করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব নমিতা হালদার। 
বৈদেশিক কর্মসংস্থানে জড়িত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দেশের জন্য যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ গত কয়েক বছরে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের পরের স্থানটি মালয়েশিয়ার। তাই এ বাজার বন্ধ হওয়াটা দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান আর রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে অনিবার্যভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর বক্তব্যে ধোঁয়াশা  
গত ২১ আগস্ট মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ইন্দেরা খাইরুল দাজমি বিন দাউদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে জানানো হয়েছে, দেশটির আগের সরকারের আমলে সিদ্ধান্ত হওয়া বাংলাদেশি ১০টি এজেন্সির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। ফলে বাংলাদেশের যে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি মারফত শ্রমিক নিত, তাদের এসপিএ সিস্টেম ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাতিল বলে গণ্য হবে। উল্লেখ্য, এর সঙ্গে মালয়েশিয়ার আগের সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন মালয়েশিয়ার নাগরিকও জড়িত। বর্তমান পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে আর কর্মী নেবে না মালয়েশিয়া। 
তবে ২৮ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি দাবি করেছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের যে খবর বেরিয়েছে তা সঠিক নয়। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়নি। কিন্তু বিদ্যমান প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। সেপ্টেম্বর থেকে আগের নিয়মেই লোক পাঠানো যাবে আশা প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানায়নি মালয়েশিয়া। প্রকৃত অবস্থা জানতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনকে দেশটির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। একটি ‘ভারবাল নোট’ বা চিঠি দেওয়া হচ্ছে। আশা করি খুব শিগগিরই একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। মন্ত্রীর দাবি, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার এখনো চালু আছে। শুধু পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কথা বলছে তারা। এখনো ৩০ হাজার ভিসাসংবলিত অপেক্ষমাণ শ্রমিক আছে। তারা তো বলেনি যে, এরাও যেতে পারবে না। এই ৩০ হাজার শ্রমিক আদৌ শেষ পর্যন্ত যেতে পারবেন কিনা বা এদের পরে আর কোনো ভিসা ইস্যু হবে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তর মন্ত্রী দিতে পারেনি। এক প্রশ্নের জবাবে নুরুল ইসলাম বলেন, ‘১০ এজেন্সির সিন্ডিকেটের কথা বলা হচ্ছে তা বাংলাদেশ সরকারের নয়, মালয়েশিয়া সরকারের সৃষ্ট। এ বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ জানায়নি।’  মন্ত্রী আরও বলেন, ‘বর্তমান পদ্ধতি বাতিলের বিষয়ে শিগগিরই প্রকৃত অবস্থা জানা সম্ভব হবে। বর্তমান পদ্ধতি বাতিল হলে ১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে অটোমেটিকালি পুরোনো পদ্ধতিতে যাবে। তবে এই পুরোনো পদ্ধতির বিস্তারিত কিছুই জানাননি মন্ত্রী। তাছাড়া মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গেও বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর বক্তব্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। 
বিশ্লেষকরা বলছেন, মন্ত্রীর বক্তব্যে এক ধরনের ধোঁয়াশা আছে। দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকে রক্ষায় হয়তো মন্ত্রী অস্পষ্ট কথাবার্তা বলছেন। তবে বাস্তবতা চেপে রাখা সম্ভব নয়। বরং বাংলাদেশের উচিত সমস্যার দ্রুত ইতি টানা। নয়তো ক্ষতি বাংলাদেশেরই বেশি হবে। কারণ, মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে না পেলে অন্যদেশ থেকে শ্রমিক নিতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করা অত সহজ হবে না।
এদিকে, মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন বসবাসের পরও অবৈধ হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক বাংলাদেশি। এর মধ্যে যারা ৩১ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরতে পারেননি তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কারণ, ধরা পড়লেই জেল-জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। এবিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল দেশটি। 
সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য
সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে জুন মাসে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর চলতি পদ্ধতি বন্ধের ঘোষণা দেয় মালয়েশিয়া। ২০১৬ সালে মালয়েশিয়া যেতে নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়। তাতে দেশটির অভিবাসন বিভাগ অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠাতে বাংলাদেশের ১০টি এজেন্সিকে নির্ধারণ করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় গত দেড় বছরে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া গেছেন ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩৩০ জন শ্রমিক। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকারও বেশি করে হাতিয়ে নিয়েছে ১০ এজেন্সির দুর্নীতিবাজ ওই সিন্ডিকেট। গড়ে জনপ্রতি ৪ লাখ টাকা করে নেয়া হলে মোট টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ হাজার ১শ ৭৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। যদিও সরকারি হিসাবে তাদের কাছ থেকে নেয়ার কথা সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার টাকা করে। সেই হিসাবে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩৩০ জন শ্রমিক পাঠাতে সর্বমোট নেয়ার কথা সর্বোচ্চ ৬৬৪ কোটি টাকা। কিন্তু হিসাব অনুযায়ী সিন্ডিকেটটি শ্রমিকদের কাছ থেকে অবৈধ পন্থায় অতিরিক্ত অন্তত ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। 
মালয়েশিয়ার সংবাদপত্র দ্য স্টার-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া যেতে প্রত্যেককে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৮৪৫ টাকা (মালয়েশিয়ান ২০ হাজার রিঙ্গিত) দিতে হয়েছে। সেই হিসাবে হাতিয়ে নেয়া টাকার অঙ্ক ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। যদিও তাদের কাছ থেকে মাত্র ২ হাজার রিঙ্গিত নেয়ার অনুমোদন ছিল।
সিন্ডিকেটে জড়িত ছিল মন্ত্রী-নেতা-ব্যবসায়ী
সিন্ডিকেটচক্রে বাংলাদেশের ১০টি জনশক্তি রফতানিকারী প্রতিষ্ঠান (রিক্রুটিং এজেন্সি) এবং মালয়েশিয়ার একটি কোম্পানি জড়িত। বাংলাদেশি ১০টি এজেন্সি হলো- ইউনিক ইস্টার্ন ক্যারিয়ার ওভারসিজ, ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল, এইচএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স, সানজারি ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল, প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটস, আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম ও আল ইসলাম ওভারসিজ। 
বাংলাদেশের ১০ এজেন্সির মধ্যে ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী জনশক্তি রফতানিকারক সমিতি- বায়রার সাবেক সভাপতি ও ইউনিক গ্রুপের মালিক মো. নূর আলী। প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটসের মালিক আরিফ আলম। তিনি একজন মন্ত্রীর শ্যালক। ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক বায়রার মহাসচিব মো. রুহুল আমিন। রাব্বী ইন্টারন্যাশনালের মালিক বায়রার সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোহাম্মদ বশির। প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজমের মালিক বায়রার সাবেক সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা। এর সঙ্গে যুক্ত আছেন ছাত্রলীগের একজন সাবেক সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের প্রথম সারির একজন নেতা। সানজারি ইন্টারন্যাশনালের মালিক শেখ আবদুল্লাহ। তার সঙ্গে যুক্ত আছেন একজন মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এক প্রটোকল কর্মকর্তা। ক্যারিয়ার ওভারসিজের মালিক রুহুল আমিন ও বদরুল আমিনরা ৩ ভাই। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আছেন সরকারের একজন মন্ত্রী এবং একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক। আল ইসলাম ওভারসিজের মালিক জয়নাল আবেদীন জাফর। তিনি পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের পরিচালক। আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের পরিচালক তুহিন সিদ্দীকি। আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিক মো. রুহুল আমিন।
বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির এই চক্র গড়ে ওঠে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের শাসনামলে। এ চক্রের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সচিব নিজেদের অসহায়ত্ব তুলে ধরেন। 
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, একবার ৭৫০টির বেশি বৈধ এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছিল, যাতে এদের মাধ্যমে কর্মী নেওয়া যায়। কিন্তু মালয়েশিয়ার তখনকার সরকার সেই তালিকা অনুমোদন দেয়নি। এর আগে বাংলাদেশ থেকে যেকোনো রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে পারত। 
প্রসঙ্গত, গত ৮ মে নাজিবের রাজনৈতিক জোটকে পরাজিত করে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন জোট। শপথ নেয়ার দেড় মাসের মাথায় মাহাথির মোহাম্মদের সরকার বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির চলতি পদ্ধতি বন্ধের ঘোষণা দেয়। শেষ পর্যন্ত দেশটি তা কার্যকরও করেছে গত ১ সেপ্টেম্বর। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ- মালয়েশিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জনশক্তি প্রেরণের নতুন পদ্ধতি নির্ধারণে ব্যর্থ হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত। এমনকি এ ক্ষেত্রে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। 
বাংলাদেশি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় ‘যুদ্ধ শুরু’
মালয়েশিয়ার নাগরিক কর্তৃক পরিচালিত একটি অফিস থেকে ৩৭৭টি পাসপোর্টসহ ৬৫ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। গত ৪ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার বান্ডার বারু নিলাই শহরের একটি অফিস থেকে ৩৭৭টি পাসপোর্ট উদ্ধার করে অভিবাসন বিভাগ। যার মধ্যে ৩৬১ বাংলাদেশি পাসপোর্টসহ উদ্ধার করা হয় অসহায় ৬৫ জন বাংলাদেশিকে। গ্রেফতার করা হয়েছে একজন কোম্পানির মালিককে। পরের দিন ৫ সেপ্টেম্বর দেশটির অভিবাসন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক সেরি মোস্তফা আলী সাংবাদিকদের জানান, অবৈধদের বৈধ করার নামে প্রতারণাসহ জাল ভিসা করার অভিযোগের কারণে তদন্তে দেখা গেছে কোম্পানিটি দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসী শ্রমিকদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। উদ্ধারকৃত বাংলাদেশিদের বরাত দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৫ মাস ধরে বেতন না দিয়ে রুমের ভেতর তাদের আটকে রাখা হয়েছিল। এভাবে দীর্ঘদিন বিভিন্ন শ্রমিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। এছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ১৮০০ থেকে ২০০০ মালয় রিঙ্গিতের বিনিময়ে বিক্রি করত। 
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক দাতুক সেরি মোস্তফা আলী সাংবাদিকদের আরও জানান, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে তারা যেমন কঠোর, তার থেকেও বেশি কঠোর যারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অভিবাসীদের ঠকিয়ে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেছেন, “অবৈধ অভিবাসী এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে।” সম্প্রতি আরও একটি বাংলাদেশি সিন্ডিকেটকে দেশটির নিলাই থেকে গ্রেফতার করে অভিবাসন বিভাগ। 
বায়রা নেতারা যা বলছেন
এ প্রসঙ্গে জনশক্তি রফতানিকারক ও বায়রার সম্মিলিত সমন্বয় ফ্রন্টের প্যানেল নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ বলেছেন, ‘সিন্ডিকেটটি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর নামে বড় রকম অর্থ আত্মসাৎ করেছে।’ শফিকুল আলম ফিরোজ গণমাধ্যমকে বলেন, ১০ এজেন্সির সিন্ডিকেট শ্রমিকদের কাছ থেকে যে সাড়ে ৩ লাখ বা ৪ লাখ টাকা করে নিয়েছে, তা সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে অনেক বেশি। তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে যেখানে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা চুক্তি, সেখানে মৌখিক অনুমোদন আছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো। তাহলে কেন তারা শ্রমিকদের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ বা ৪ লাখ টাকা নেবে? এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দায়িত্ব আমাদের সরকারের।’ 
তিনি এও অভিযোগ করেছেন, ১০ এজেন্সির ওই সিন্ডিকেটটি আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর বায়রা নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে। তারা যেকোনোভাবে আবার বায়রার দখল নিতে চায়। তিনি বলেন, গত ২ বছর বায়রার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে শক্তিশালী সিন্ডিকেটটি। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার ধ্বংস করার পেছনে এই সিন্ডিকেট কাজ করেছে। তারা দেশের বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। তিনি বলেন, “এখন তারা আবারও প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে তার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে দিয়ে বায়রার দখল নিয়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।”
যা বলছে টিআইবি
মালয়েশিয়া সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সেদেশে বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যাবে। এই ঘোষণায় বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তবে এটিকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে এ খাতকে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। গত ২৬ আগস্ট এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানায় টিআইবি। 
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্তের খবরে আমরা একদিকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে জনশক্তি রফতানিতে একচেটিয়া ও সিন্ডিকেটভিত্তিক অনৈতিক ব্যবসা বন্ধে মালয়েশিয়া সরকারের এ সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানাই। কারণ মালয়েশিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইতিবাচক ও অংশগ্রহণমূলক আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় অভিবাসী কর্মী পাঠানোর পথ সুগম হয়েছে। তবে এটাও পরিষ্কার যে এ সুযোগ গ্রহণের পূর্বশর্ত হচ্ছে পুরো খাতকে সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত করা এবং যারা অবৈধ কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’ ‘আমরা ব্যবসাটিকে বাংলাদেশের সব এজেন্টদের জন্য খুলে দিতে চাই’- গণমাধ্যমে প্রকাশিত মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের উল্লেখ করে  ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যে প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মী নিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সুশাসন নিশ্চিত করার টিআইবির দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে টিআইবির আশঙ্কাই সত্য প্রতীয়মান হলো। 
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত টিআইবির একটি গবেষণাতে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে অভিবাসী কর্মী পাঠানোর একচেটিয়া ব্যবসার মাধ্যমে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন ও গ্রাহকদের শোষণ প্রক্রিয়া রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করে সরকারকে একটি পলিসি ব্রিফ করেছিল টিআইবি। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত)