বুধবার, ২৩-মে ২০১৮, ০৬:৩৫ অপরাহ্ন

খুলনার নির্বাচনে শঙ্কাই সত্য হলো

sheershanews24.com

প্রকাশ : ১৫ মে, ২০১৮ ১০:৫৮ অপরাহ্ন

হানজালা শিহাব, ঢাকা : জাতীয় নির্বাচনের আগে দলীয় প্রতীকে খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনটি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী জোটসহ সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ কারণে খুলনায় কেমন ভোট হয়, তার প্রতি দৃষ্টি ছিল পুরো দেশবাসীর। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একপেশে আচরণসহ নানা কারণে শুরু থেকেই আশঙ্কা ছিল সুষ্ঠু ভোট নিয়ে। বহু প্রতিক্ষার পর ভোটের দিন বাস্তবেও সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হলো। সরকারি দলের নেতাকর্মীদের জালভোটের মহোৎসব দেখেছেন দেশবাসী। ভোট শুরুর আগে কেন্দ্র দখল, ব্যালট বই ছিনতাই করে নৌকায় সিল মারা, বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া, কেন্দ্র থেকে মারধর করে বের করে দেয়া, হামলা, ভাঙচুর কিছুই বাদ যায়নি খুলনা সিটির নির্বাচনে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- এবারই প্রথম আওয়ামী লীগের নারী কর্মীরাও কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারার নতুন রেকর্ড তৈরি করেছেন। যা স্বাধীন বাংলাদেশে ইতিহাসে এর আগে এমনটি কেউ দেখেননি বা শোনেনওনি। খুলনার আওয়ামী লীগের নারী কর্মীরা সেটাই করে দেখিয়েছেন। এটাকে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ‘সিম্বল’ হিসেবেই দেখছেন কেউ কেউ।
তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, সরকারি দলের বিজয়ী মেয়র, নির্বাচন কমিশন (ইসি), রিটার্নিং কর্মকর্তা ও খুলনার পুলিশ কমিশনার- সবাই একই সুরে সব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। তারা দাবি করেছেন, ‘সুষ্ঠু, সুন্দর ও চমৎকার ভোট হয়েছে’। তবে গণমাধ্যমের সুবাদে খুলনাসহ পুরো দেশবাসী ‘চমৎকার’ ভোটের প্রকৃত রূপ দেখেছেন। যদিও অজ্ঞাত কারণে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
রাজনৈতিক সচেতন মহলের প্রশ্ন হলো- সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোটও কি তাহলে খুলনার মতো ‘চমৎকার’ হবে? তারা বলছেন, সেই আশঙ্কা তৈরি হওয়াও অযৌক্তিক নয়। কারণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব সময়ই ক্ষমতাসীন দলের আনুগত্য প্রদর্শন করে আসছে। আর ইসির তো নিজস্ব কোনো জনবল নেই। সরকারের ইচ্ছার উপরই নির্ভশীল থাকে ইসি। সুতরাং সরকার না চাইলে ইসির পক্ষে যে কিছুই করার থাকে না- তা আরেকবার খুলনায় প্রমাণিত হয়েছে। গাজীপুরেও হয়তো আরেকবার তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ আবার বলছেন, সরকার খুলনার মতো গাজীপুরের ভোট ‘ছিনতাইয়ের’ সুযোগ পাবে না। কারণ গাজীপুরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রার্থীর তুলনায় শক্তিশালী। তাছাড়া গাজীপুরে আওয়ামী লীগের কোন্দল বেশি। ফলে এখানে বিএনপি প্রার্থীর জন্য বাড়তি সুযোগ থাকছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকারি দল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি প্রার্থীকে সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে দেবে- তা অবশ্য এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তবে এ মুহূর্তে সিটি নির্বাচনগুলো ইসির অস্তিত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সেই সাথে আওয়ামী লীগের অধীনে চলতি বছরের শেষে জাতীয় নির্বাচন কেমন হবে- এরই বাস্তব নমুনা বা সিম্বল হিসেবেই দেখছেন  দেশবাসী ও বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।

‘ডাকাতির’ ফল বাতিল করে ফের ভোট চেয়েছেন মঞ্জু
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ‘ভোট ডাকাতির’ অভিযোগ এনে একশর বেশি কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করে নতুন করে ভোট নেয়ার দাবি জানিয়েছেন পরাজিত বিএনপির মেয়রপ্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ১৫ মে সন্ধ্যায় খুলনায় দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি করেন ধানের শীষের প্রার্থী।
 এদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নগরীর ২৮৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হয়। দিনভর বিভিন্ন কেন্দ্রে জালভোটসহ বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় ৪টি কেন্দ্রের ভোট বাতিল করা হয়। এছাড়াও দুটি বুথের ভোট স্থগিত করা হয়। ভোটের দিন দুপুওে বিএনপি প্রার্থী বলেন, ‘খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হয়েছে। এক্ষেত্রে নিস্ক্রীয় ভূমিকা ছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। ভোট ডাকাতিতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে পুলিশ। আর তালুকদার আব্দুল খালেকের ক্যাডাররা বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রবেশ করে ব্যালট বই ছিনতাই করে সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়েছে।’ তবে ভোটের দিন সরকার দলীয় প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক ভোটের পরিবেশে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।  

যা ঘটেছে ভোটকেন্দ্রগুলোতে
১৫ মে বেলা সাড়ে ১১টার পর নগরীর রূপসা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ওই কেন্দ্রে প্রবেশ করে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। পাঁচটি বুথে ঢুকে ব্যালট নিয়ে সিল মারা শুরু করে। পরে খবর পেয়ে সাংবাদিকরা সেখানে যান। বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুও উপস্থিত হন ওই কেন্দ্রে। সাংবাদিকরা আসার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেন। ওই সময় ভোট গ্রহণ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। সাংবাদিকরা চলে গেলে পুনরায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রে প্রবেশ করে ব্যালটে সিল মারে। ৩১নং ওয়ার্ডের লবনচরা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের পাশাপাশি প্রিসাইডিং অফিসারদেরও বের করে দিয়েছে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের সমর্থকরা। তারা বুথের ভেতরে ঢুকে যখন সিল মারছিলো তখন প্রিসাইডিং অফিসাররা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা সাংবাদিকদের বলেন, তাদের বুথ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।
২০নং ওয়ার্ডে এইচআরএইচ প্রিন্স আগাখান উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে পুলিশের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ভোটারদেরকে বের করে দিয়ে নৌকা মার্কায় সিল মারে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়। ১৯নং ওয়ার্ড ইসলামাবাদ ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টকে মারধর করে প্রশাসনের সামনেই বের করে দেয় সরকার সমর্থকরা।


৪নং ওয়ার্ডে দেয়ানা উত্তর পাড়া কেন্দ্রে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা এবং বিএনপি কর্মী মিশুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পাইওনিয়ার স্কুল ভোটকেন্দ্র থেকেও প্রশাসনের সামনেই বের করে দেয়া হয়েছে বিএনপির পোলিং এজেন্টদেরকে। গল্ডামারি লায়ন্স স্কুল ও নিরালয় স্কুল কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের এজেন্টকে প্রশাসনের সামনে মারধর করে বের করে দেয়া হয়েছে।
৩১ নম্বর ওয়ার্ডে হাজী আব্দুল মালেক দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্র ও লবনচরা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে থাকা বিএনপি প্রার্থীর ক্যাম্পে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এছাড়া সেখানকার ভোটকেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে ভোটের লাইন থেকে বিএনপি সমর্থক বা বিএনপির পরিচিত মুখ ভোটারদের বের করে দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ভোটার ও বিএনপি সমর্থকেরা।
সরেজমিনে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বিএনপির মেয়রপ্রার্থীর পক্ষে কোনো পোলিং এজেন্ট নেই। স্থানীয় বিএনপির কর্মীরা অভিযোগ করেছেন, সেখানে বিএনপির এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে সোনাপোতা স্কুল কেন্দ্রে নারী ভোটকেন্দ্রের সামনে বিএনপির প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প ভেঙে দিয়েছে তালুকদার আব্দুল খালেকের সমর্থকরা। এছাড়া আবদুল গণি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে বিএনপির নির্বাচনী ক্যাম্পেও ভাঙচুর চালায় তারা।

নারীরাও কেন্দ্র দখল করে সিল মেরেছে
স্থানীয় ভোটাররা বলেছেন, আওয়ামী লীগের নারী কর্মীরা ৩১নং ওয়ার্ডের লবনচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রটি দখল কওে নৌকায় সিল মারে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা একটার দিকে এই কেন্দ্রের একটি বুথে হঠাৎ কয়েকজন নারী ঢুকে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে নেন। পরে তারা মেয়র পদে নৌকা ও কাউন্সিলর পদের পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বক্স ভরে রেখে চলে যান। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, ‘কয়েকজন মহিলা বুথে ঢুকে বলেন- কেউ কোনো কথা বলবেন না। কিছুক্ষণ পর তারা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বক্সে ভরে চলে গেছেন।’
পরে ওই কেন্দ্রটির ভোট স্থগিত করা হয়। এটিসহ কেন্দ্র দখল ও ব্যালট ছিনতাই করে সিল মারার অপরাধে মোট চারটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়। এর বাইরে আরও একটি কেন্দ্রের একটি বুথে ভোট স্থগিত হয়েছে এবং একটি কেন্দ্রে স্থগিতের পর আবার চালু হয়।

৪০ কেন্দ্র দখল
সিটি করপোরেশনের ১১, ১৫, ২২, ২৫, ২৬, ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে নৌকায় ভোট দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। রাজি না হলে ভোটারদের বের করে দেয়া হয়েছে ভোটকেন্দ্র থেকে। অন্তত ৪০টি কেন্দ্র দখল করে নিয়ে জাল ভোট দেয়া হয়েছে নৌকা প্রতীকে। সরকার দলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা পুলিশি ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে এসব অপকর্ম করলেও কেউ তাদের বাধা দেয়ার সাহস দেখায়নি বলে প্রত্যক্ষর্শী সবেজমিনে দেখা গেছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে বিএনপি প্রার্থীর গাড়ি আটকে রেখে নৌকার পক্ষে ভোটের দিন স্লোগান দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু পুলিশ এক্ষেত্রে নিরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিনেও এর সত্যতা মিলেছে।

এজেন্টকে পিটিয়ে আহত
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোট শুরু হওয়ার ১৫ মিনিট আগে সকাল পৌনে ৮টায় খুলনা সিটি করপোরেশনে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থী নজররুল ইসলাম মঞ্জুর পোলিং এজেন্ট সেলিম কাজীকে পিটিয়ে আহত করা হয়। তিনি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করার জন্য ঢুকতে গেল তাকে পিটিয়েছে সরকারি দলের সমর্থকেরা। আহত সেলিমকে প্রথমে খুলনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে ভর্তি না করে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।  

নৌকায় ভোট দিতে রাজিন না হওয়ায়
২৫ নম্বর ওয়ার্ডে সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে মো. জাহিদুল ইসলাম নামের এক ভোটার কেন্দ্র থেকে বেরিয় অভিযোগ করেন, তাকে নৌকা মার্কার ব্যালটে সিল মারার জন্য জোর করা হয়েছে। তিনি রাজি না হলে তাকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ওই কেন্দ্রের বুথের ভেতর সরকারদলীয় মেয়রপ্রার্থীর সন্ত্রাসীরা অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে সব ভোটারদের।

তিনি যে কেন্দ্রে গেছেন সেখানেই জাল ভোটের মহোৎসব চলেছে
সূত্রমতে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক যে কেন্দ্রে গেছেন সেই কেন্দ্রেই জাল ভোটের মহোৎসব চলেছে। সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘুরে ঘুরে ভোট গ্রহণ দেখছেন তালুকদার আব্দুল খালেক। অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার সময় খালেকের সঙ্গে ৩০/৪০ জনের একটি বহর ছিল। সঙ্গে মিডিয়াও। কিন্তু কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি বের হয়ে আসলে সংবাদকর্মীরাও বের হয়ে গেছে তার সঙ্গে। এ সুযোগে পেছনে থাকা তার বহর জাল ভোটের মহোৎসব চালিয়েছে। তালুকদার আব্দুল খালেক দুপুর ২টার দিকে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের শেখপাড়া বিদ্যুৎ স্কুল কেন্দ্রে যান। সেখান থেকে তিনি বের হয়ে আসলে তার সঙ্গে থাকা বহর জাল ভোট দেয়া শুরু করে। একইভাবে হাতেম আলী স্কুল, ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসা, ৩১ নম্বর আব্দুল মালেক ইসলামীয়া কলেজ কেন্দ্রে একই ঘটনা ঘটেছে বলে ভোটাররা জানিয়েছেন।

বাবার সঙ্গে ভোট দিল দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৫ মে দুপুরের পর থেকে জাল ভোটের প্রবণতা বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। নগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের নুরানি বহুমুখী মাদ্রাসা কেন্দ্রে অনেক জাল ভোট পড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে স্থানীয় নৌকা-সমর্থিত প্রভাবশালী ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষণ দলের এক সদস্যকে অপদস্থ করেছেন। কেন্দ্রটিতে দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, এক ব্যক্তি তার দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে ভোটকেন্দ্র থেকে বের হচ্ছেন। বাবা-ছেলের দুজনের হাতের আঙুলে ভোট দেওয়ার সময় লাগানো অমোচনীয় কালি দেখে তাদের অনুসরণ করেন সংবাদকর্মীরা। একপর্যায়ে ভোট দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমার ছেলেও ভোট দিয়েছে।’
দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেটি বলে, ‘নৌকায় ভোট দিয়েছি। টিপু আঙ্কেলকে ভোট দিয়েছি (আওয়ামী লীগের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আলী আকবর টিপু, প্রতীক ঠেলাগাড়ি)।

‘কষ্ট করে ভোট দেয়া লাগবে না, আমরাই দিয়ে দিয়েছি’
খুলনা সিটির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোট। এ কেন্দ্রে ভোট দিতে না পারা একজন বয়স্কা হাসিনা বেগম। ভোট দিতে না পারার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ভোট দিতে কেন্দ্রে ঢুকলে আমাকে ধাক্কা মেরে বের করে দিয়েছে কতগুলো ছেলে। ছেলেগুলো বলেছে, আপনি বয়স্ক মানুষ, কষ্ট করে ভোট দেয়া লাগবে না। আমরাই দিয়ে দিয়েছি।’
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ছোরাব শেখসহ আরও অনেক ভোটার।


প্রত্যক্ষদশীরা জানান, তখন সকাল ১০টা। পুলিশি পাহারায় হৈহৈ করে কেন্দ্র ঢুকলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর একদল কর্মী। প্রথমেই তারা কয়েকটি বুথ থেকে বের করে দিলেন ভোটার ও অন্যান্য প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের। এরপর প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষ থেকে নিয়ে আসলেন বেশ কয়েকটি নতুন ব্যালট বই। চারটি বুথের প্রতিটিতেই দুই-তিনটি করে নতুন ব্যালট বই নিয়ে ঢুকেন তারা। এরপর প্রকাশ্যে চালান সিল মারার মহোৎসব। দু’চারজন ভোটার নিজেদের ভোট দিতে চাইলে তাদের ধাক্কা মেরে ও ধমক দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। এ সময় প্রিসাইডিং অফিসারসহ নির্বাচনী দায়িত্বরত কর্মকর্তারা ছিলেন পুতুলের মতো নিশ্চুপ, নিশ্চল। এভাবেই চলে খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দের ভোট। খবর পেয়ে আধাঘণ্টা পর সাংবাদিকরা সেই কেন্দ্রে উপস্থিত হন। কিন্তু এর আগেই কেন্দ্রের মোট ১৩৬০ ভোটের বেশিরভাগই ঢুকে গেছে বাক্সে। প্রতিটি বুথের বাক্সগুলো সাড়ে ১০টার মধ্যেই উপছে পড়ছিল সিলমারা ব্যালটে।
এদিকে সাংবাদিকরা সেখানে ছুটে গেলে কেন্দ্রের গেটে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা গেছে, ‘সিল মারতে এতো সময় লাগে নাকি। সাংবাদিকরা এসে পড়েছে। এ সময় পাশে থেকে এক যুবককে বলতে শোনা যায়, টার্গেট ছিল ১২শ’, আধাঘণ্টা তো লাগবেই।’

নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলেছেন সিপিবি প্রার্থী
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মেয়র পদপ্রার্থী মিজানুর রহমান বাবু। বামপন্থী এই প্রার্থী নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগও আনেন। কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন কষ্ট করলাম। আমার জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন ব্যবস্থার শুরুতেই নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। সেখানে বলেছিলাম, আমরা কালো টাকামুক্ত, অবৈধ অস্ত্র পেশিশক্তিমুক্ত, ধর্মের ব্যবহারমুক্ত একটি নির্বাচন চাই। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে এলো আমরা দেখলাম, এই অপশক্তিগুলো আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থাকে আমাদের গণতান্ত্রিক শক্তিকে একদম শেষ করে দিল। যার বাস্তবতা দৃশ্যমান হলো ভোটের দিনে।’

ভোটের পরিবেশে সন্তুষ্ট খালেক
তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক ভোটের পরিবেশে সন্তুষ্ট। তিনি এও বলেছেন, ‘ধানের শীষের কোনো লোক তো আমি দেখছি না। সবাই তো নৌকার সিম্বল পরে আছে। এখন কেউ যদি নৌকার সিম্বল নিয়ে কেন্দ্রে গিয়ে অন্য প্রতীকে ভোট দিতে চায় আর আমার এজেন্টরা সেটা চিহ্নিত করতে পারে তবে তারা তো সেটা ঠেকাবেই।’

আওয়ামী লীগ নেতারা যা বলেছেন
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক দাবি করেছেন, বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের কার্যক্রম চলেছে। সেখানে শুরু থেকেই বিএনপি মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একদিকে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ভূরি ভূরি অভিযোগ, আরেক দিক থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা—এটা স্ববিরোধী। তিনি বলেন, খুলনার এই অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য মিডিয়ার সামনে নানাবিধ গুজব রটাচ্ছেন রিজভী।
আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে যেমন নির্বাচন হয়েছিল খুলনায় তেমনই হচ্ছে। বিএনপির মঞ্জুই শুধু অভিযোগ করছেন। আর ঢাকায় বসে তাদের নেতারা করছেন সংবাদ সম্মেলন।

‘চমৎকার’ নির্বাচন দাবি ইসির
খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচন অনেক ‘চমৎকার’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ২৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩টি বন্ধ রয়েছে। বাকি ২৮৬টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হয়েছে। আগারগাঁওস্থ নির্বাচন কমিশন ভবনে ভোটের দিন বিকেলে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান। অপরদিকে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভিযোগ সুনির্দিষ্ট নয় বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। একইসঙ্গে তিনি দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে বলে দাবি করেন। কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপির অভিযোগ সুনির্দিষ্ট নয়। যাদের বের করে দেয়া হয়েছে, তারা এজেন্ট কিনা সেটাও দেখার বিষয়। পরিচয়পত্র না থাকলে তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়।’

ফলাফল
শেষ পর্যন্ত খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বেসরকারিভাবে প্রায় ৭০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী (নৌকা) তালুকদার আব্দুুল খালেক। ১৫ মে মঙ্গলবার ভোট শেষে রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাওয়া তথ্যে ভিত্তিতে নৌকা প্রতীকে আব্দুল খালেক পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নজরুল ইসলাম মঞ্জু পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯৫৬ ভোট।

শীর্ষনিউজ/এসএসআই