মঙ্গলবার, ২৩-অক্টোবর ২০১৮, ০৩:২৬ অপরাহ্ন

অক্টোবরে নির্বাচনী তফসিল, তবে...

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৮ মে, ২০১৮ ১০:০৮ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য :  অক্টোবরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। ডিসেম্বরে নির্বাচন করতে হলে তিন মাস আগে তফসিল ঘোষণার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইতিমধ্যে কমিশনও অক্টোবরেই তফসিল দেওয়ার কথা জানিয়েছে। কিন্তু আদৌ নির্বাচন হবে কি না- তা নিয়েই জনমনে সংশয় রয়েছে। নির্বাচন হলেও তাতে বিএনপি অংশ নেবে কিনা? বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে না এলে কী হবে? সেই সাথে দেশবাসীর প্রশ্ন, নির্বাচন না হলে কী হবে? এ মুহূর্তে এসব প্রশ্নের কাক্সিক্ষত উত্তর কারো জানা নেই। তাই এ নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের মেয়াদ যত শেষ হয়ে আসছে, নির্বাচন, গণতন্ত্র ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ততই অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। যেমনটি হয়েছিল ৪ দলীয় জোট সরকারের শেষ বছরে। তাই এ মুহূর্তে সরকার ও তাদের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না আসলে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়। ক্ষমতাসীন দল সভা-সমাবেশে যাই বলুক তাদের ভেতরে ভেতরে নানা শঙ্কা বিরাজ করছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান বিরোধী- বিএনপি এ মুহূর্তে খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল আছে। খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে থাকার পরও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাকে উন্নত চিকিৎসার কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কারা কর্তৃপক্ষও চিঠি দিয়েছে। সরকারের উদ্যোগের অভাবে বেগম জিয়ার জীবন নিয়েই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। এর মধ্যে নতুন করে আলোচনায় টেনে আনা হয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনৈতিক আশ্রয়গ্রহণ, নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট ইস্যু। মূলত এর পেছনে আগামী নির্বাচন থেকে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে দূরে রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে দাবি করছে বিএনপি। এমন প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জোটভুক্ত এবং জোটের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। এসব রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি দেশের সাধারণ জনগণও চাচ্ছেন, শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক এ সংকটের উত্তরণ। তবে সেটা কোন পথে হবে, আদৌ হবে কিনা- সেই অনিশ্চয়তা কোনোভাবেই দূর হচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ গত বছরের প্রথম দিকে নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতা, মন্ত্রী ও এমপিদের বৈঠকে নির্বাচনের জোর প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন বারবার। সবাইকে নিজ যোগ্যতায় আগামী নির্বাচনে পাস হয়ে আসতে হবে। দলীয় প্রধান হিসেবে তিনি কারো দায়িত্ব নেবেন না বলেও কঠোর হুঁশিয়ারি দেন ওই সময়। এমনকি নির্বাচনী ইশতেহারও তৈরির আগাম প্রস্তুতি চলছিল। অথচ নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও সেই তৎপরতা এখন আর নেই। নির্বাচনের বছরে তাদের প্রস্তুতিতে ভাটা পড়েছে। যদিও দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী এখনো জনসভায় নৌকায় ভোট চাচ্ছেন। কিন্তু দলের অন্য নেতাদের মধ্যে নির্বাচনের কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এমনকি শোনা যাচ্ছে, নির্বাচনে অংশ নিতে ভয় পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অনেক নেতা ও বর্তমান এমপি-মন্ত্রী। নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতায় থাকার পক্ষে অনেকে। তাদের ধারণা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের মতো তাদেরকে ‘যেনতেনভাবে’ ক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ করে দেবেন। কিন্তু সেটা কীভাবে হবে- তাও জানা নেই আওয়ামী লীগের ওই নেতাদের।
অনেকে বলছেন, বছরখানেক আগে আওয়ামী লীগের মধ্যে নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মনোভাব ছিল। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ‘কথিত’ দুর্নীতির মামলায় কারাগারে পাঠানোর পর সরকারের চিন্তায়ও পরিবর্তন আসে। কেউ কেউ বলছেন, গত বছরের শেষের দিকে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ‘নির্বাচন নিয়ে সরকার কারো সঙ্গে আলোচনা করবে না। যার ইচ্ছা নির্বাচনে আসবে, যার ইচ্ছা হবে না আসবে না,’ ক্ষমতাসীন দলের এমন মনোভাব প্রকাশের পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তাই এক বছর আগের দৃশ্যপট এখন আর নেই। অর্থাৎ নিরপেক্ষ নির্বাচনের চিন্তাভাবনা ক্ষমতাসীন দলের এখন আর নেই বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সূত্র বলছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো যেনতেন একটি নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকতে চায় আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলটির বেশিরভাগ নেতাই সেটা চাচ্ছেন। তারা আশা করছেন, তাদের নির্বাচনী তরী পার করে দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ‘আওয়ামী লীগের পুনরায় ক্ষমতায় আসা এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি।’ ‘শেখ হাসিনা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, ততদিন তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকবে।’ দলটির সাধারণ সম্পাদক ও এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের এমন বক্তব্যে সেই মনোভাবই স্পষ্ট হয়েছে বলে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করেন।
এদিকে, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও শারীরিক অবস্থা দিনে দিনে অবনতি হওয়ায় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেশের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে শঙ্কা ও ক্ষোভের সঞ্চয় হয়েছে। গোটা জাতি বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে দাবি করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। দুইবারের সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রীর জীবন সংকটের মুখে রেখে চিকিৎসার নামে টালবাহানা কোনোভাবেই ভালো চোখে দেখছেন না দলটির নেতাকর্মীসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো।
তবে নানা সংকট, আলোচনা, বিতর্কের মধ্যে নির্বাচনের বছরে আওয়ামী লীগের ১৯ নেতার গত ২২ এপ্রিলের ভারত সফরে সবার সতর্ক দৃষ্টি ছিল। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতি, জাতীয় নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদলে ভারতের যে কতটা প্রভাব সেই ধারণা আছে দেশবাসীর মধ্যে। তাই আওয়ামী লীগ নেতাদের সফর ঘিরে দেশের সব রাজনৈতিক দল ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের কৌতূহল ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সূত্র বলছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের এই সফর ‘সুপার ফ্লপ’ হয়েছে। কারণ, ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির আমন্ত্রণে এই সফরের কথা বলা হলেও সফরে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা বিজেপি প্রধান অমিত শাহ’র সাক্ষাৎ পাননি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছাড়া বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো নেতার সঙ্গেও বৈঠক হয়নি প্রতিনিধি দলের। কেবল বিজেপির রাম মাধবের নেতৃত্বে গুরুত্বহীন নেতাদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক ও ডিনার এবং মোদির সঙ্গে ফটোসেশন করেই শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে বিশাল প্রতিনিধি দলটিকে। সূত্র বলছে, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে কোনো ধরনের ভূমিকা না নেওয়ার কথা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মোদি। অথচ গুঞ্জন আছে, ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় নির্বাচন বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ স্বীকৃতি না দিলেও ভারত সমর্থন দেয়। কিন্তু সেই ভারত আগামী নির্বাচন নিয়ে কোনো আগ্রহ না দেখানোয় আওয়ামী লীগ হতাশ এবং কিছুটা ক্ষুব্দ বলে রাজনৈতিক একাধিক সূত্রে জানা গেছে। যা তাদেরকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে বেড়েছে অস্বস্তি এবং ক্ষোভও। সেই ক্ষোভ থেকেই পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা ভারত থেকে ‘প্রত্যাখ্যাত হয়ে’ চীন-আমেরিকামুখি হতে উঠেপড়ে লেগেছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন আছে। অবশ্য আওয়ামী লীগের চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার বেশকিছু তৎপরতা পরিলক্ষিতও হচ্ছে। যা ওই গুঞ্জনকেই মূলত সত্যায়ন করে। কিন্তু বিদেশি সবার কথা একটাই, ‘সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন’ দিতে হবে।
সূত্রমতে, এ মুহূর্তে ভারতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বাংলাদেশের একাদশ নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা না বললেও গত অক্টোবরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে ‘সবার অংশগ্রহণে স্বচ্ছ নির্বাচনের’ তাগিদ দিয়ে গেছেন। এছাড়া তারা অনানুষ্ঠানিকভাবেও একই কথা বলছেন। অন্য সাহায্য ও সহযোগি দেশ এবং দাতাসংস্থাগুলোও একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে বলে জানা গেছে। সরকারের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে চরম অস্বস্তিতে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
আ.লীগের ভারত সফর ‘সুপার ফ্লপ’
ভোটের আগে ভারতে এ সফরটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল আওয়ামী লীগের জন্য। যা এক ধরনের অপমানও বলা চলে। গত বছর এ সফরটির সময় নির্ধারিত হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেররের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দল ৫ দিনের সফরে গত ১০ মার্চ ভারত সফরে যাবার কথা ছিল। সেটি পরে ২০ মার্চ নির্ধারিত হয়। ‘বিজেপি’র প্রস্তুতি নেই’ এই অজুহাতে সফরটি তখন স্থগিত করা হয়। কিন্তু অবশেষে ২২ এপ্রিল থেকে তিন দিনের সফর ঘোষণা করা হলেও সেখানকার কর্মসূচিটি ছিল মাত্র এক দিনের। ২২ এপ্রিল বিকেলে ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল ঢাকা ছেড়েছেন। শুধু ২৩ এপ্রিল সেখানে বিভিন্ন কর্মসূচি ছিল। বিজেপির ৮ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ও ডিনারে অংশ নেন রাম মাধব, রামপাল ও অরুন সিং। এছাড়া আর কিছু গুরুত্বহীন কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। অত্যন্ত প্রভাবশালীও গুরুত্বপূর্ণ নেতা, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ অজ্ঞাত কারণে বৈঠক এবং ডিনার বয়কট করেন।
এদিকে বাংলাদেশের কাছে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পর্শকাতর, সেই তিস্তার পানিবণ্টন বিষয়ে এবারও আশ্বাস নিয়েই ফিরতে হয়েছে প্রতিনিধি দলকে। তিস্তা প্রসঙ্গে মোদি বলেছেন, ‘আমরা দ্রুত এর সমাধান করতে আগ্রহী।’ ব্যাস, এতটুকুই। অপরদিকে বাংলাদেশের একাদশ নির্বাচন নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখাননি মোদি। যা দেশে ফিরে ওবায়দুল কাদের নিজেই স্বীকার করেছেন। কাদের বলেছেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি মোদি।’ এর মাধ্যমে অবশ্য তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন নিয়ে যা করবে তাই মেনে নেবে ভারত। তবে বাস্তবতা ঠিক উল্টো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের ভারত সফর আওয়ামী লীগের জন্য ‘সুপার ফ্লপ’ হয়েছে। সেই কারণে দলটিও ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এখন তারা চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যদের দিকে ঝুঁকছে।
এর অংশ হিসেবে প্রথমত, ঢাকা শেয়ারবাজারের মালিকানায় অংশীদার হতে দীর্ঘদিন ঝুঁলে থাকা ভারত-চীনের টানাটানির অবসান ঘটিয়ে চীনকে মালিকানা দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকার পর পদ্মাসেতুতে রেল লাইন করার ক্ষেত্রেও চীনকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ২৭৬ কোটি ডলারের ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। গত ২৫ এপ্রিল বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জাহিদুল হক ও চায়না এক্সিম ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট সুন পিং এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
তৃতীয়ত, ৩০ এপ্রিল রাতে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের সঙ্গে তার বাসায় বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আঞ্চলিক রাজনীতি, রোহিঙ্গা ইস্যু, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে কথা হয়েছে বৈঠকে। তবে, আওয়ামী লীগ এটিকে সৌজন্যমূলক নৈশভোজ বলে দাবি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্ভবত দীর্ঘকাল এমনটি হয়নি। গত ৯ বছর ধরে আমেরিকাকে শুধু গালাগালি দিয়েই চলছিল দলটি। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে দীর্ঘকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কিন্তু হঠাৎ করে নির্বাচনের আগে ভারত থেকে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে যাওয়া ক্ষমতাসীনদের পররাষ্ট্রনীতির নতুন কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আর এসব দৃশ্যই প্রমাণ করে ভারত সফর আওয়ামী লীগের জন্য ‘সুপার ফ্লপ’ হয়েছে। তাই এসবকে ভারত সম্পর্কের চরম অবনতির দৃশ্যমান ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। অপরদিকে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গভীর হওয়ার বেশ কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ নিয়ে সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেশ কিছু সংবাদও প্রকাশ পেয়েছে।
বিএনপির একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে শুধু ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক’ সম্পর্ক না রেখে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীল সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী বিএনপি। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক নীতিতে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ‘সার্বজনীন নীতি’ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে বিএনপির পররাষ্ট্র উইং মাঠে নেমেছে। দলীয়ভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দিকটি দেখভাল করার দায়িত্বে রয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই উইংয়ে কাজ করছেন আরও কয়েকজন।
কূটনৈতিক উইংয়ের একটি সূত্র বলছে, এ বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে ভারতের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছে বিএনপি। সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের ভারত সফর, প্রতিবেশী দেশটির বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনগুলোও আমলে নিয়েছে দলটির নীতিনির্ধারকরা। পাশাপাশি দেশটির সাথে রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব আমলে নিয়ে বিএনপি সতর্কতার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে।
অবশ্য, চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের কথা রয়েছে। তবে তিনি যাবেন পশ্চিম বঙ্গে শান্তি নিকেতনের বিশ্বভারতীতে ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধন করতে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নেই এ ভবনটি নির্মিত হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে এখানে সাক্ষাত হবে শেখ হাসিনার। কিন্তু তাতে কোনও রাজনৈতিক অর্জন আশা করছেন না কেউই। সর্বশেষ গত ১৯ এপ্রিলও লন্ডনে হাসিনা-মোদি বৈঠক হয়েছিল।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল অক্টোবরে
আগামী অক্টোবরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম। তবে অক্টোবরের কত তারিখে তফসিল হবে- তা স্পষ্ট করা হয়নি। ৩০ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি। কিন্তু নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে এ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেয়নি ইসি। অথচ ক্ষমতাসীনরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে প্রতিপক্ষকে এক ঘরে করে রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমে জামায়াতে ইসলামিকে ‘যুদ্ধাপরাধী দল’ হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে এক ঘরে করে ক্ষমতাসীনরা। তাদের দলীয় কার্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রশাসন দিয়ে। এমনকি ঘরেও থাকতে পারছে না দলটির নেতাকর্মীরা। যখন যাকে যেখানে পাচ্ছে ‘গোপন বৈঠক’, ‘নাশকতার চেষ্টা’ ট্যাগ দিয়ে তাদেরকে কারাগারে পোরা হচ্ছে। এখন সেই ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে বিএনপির বিরুদ্ধেও। অর্থাৎ বিএনপি নেতাকর্মীদের একদিকে রাজপথে কোনো আন্দোলনে নামতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে চার দেয়ালের মধ্য থেকে নেতাকর্মীদের ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ‘তারা গোপন বৈঠক করে নাশকতার চেষ্টা করছিল।’ এরপর বিএনপি নেতাকর্মীদের রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। শুধু জামায়ত-বিএনপিই নয়, ক্ষমতাসীন দলের প্রতিপক্ষ সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একই আচরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। ইসি বলছে, তফসিল গোষণার আগে তাদের কিছুই করার নেই। এমন পরিস্থিতিতে দেশে কেমন নির্বাচন হবে- বা আদৌ নির্বাচন হবে কিনা, এ নিয়ে দেশবাসীর শঙ্কা থাকাটাই যোক্তিক বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় বিশ্ব
অতীতে কখনো চীনকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়নি। কিন্তু এবার চীনও এ বিষয়ে বেশ সোচ্চার। তারা বলছে, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হস্তান্তর দেখতে চায় দেশটি। আর বাংলাদেশের উন্নয়নে অন্যতম সহযোগী ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ) চলমান গুম, খুন, ক্রসফায়ারসহ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ‘সব দলের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ নির্বাচন’ দেখতে চায় ইইউ। ইউরোপের ২৮ রাষ্ট্রের ওই জোট আশা করে- এমন নির্বাচনের পরিবেশ বাংলাদেশ সরকার নিশ্চিত করবে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও ইইউ’র মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়। সূত্র বলছে, সেখানে ইইউ’র প্রত্যাশার জবাবে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সর্বাত্মক সহায়তা (অল-আউট সাপোর্ট) প্রদানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। ইইউ-বাংলাদেশ কো-অপারেশন এজেন্সি (সিএ) ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় সুশাসন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত সাব-গ্রুপের (দ্বিপক্ষীয়) ওই বৈঠকটি গত ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে সম্প্রতি ভারতও সব দলের অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য’ দেখতে চায় বলে জানিয়েছে। যা এর আগে একাধিকবার বলা হয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও এ কথা বলে গেছেন।
এদিকে ‘নির্বাচনে এবার আর ভারত নাক গলাবে না’ দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেছেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে আওয়ামী লীগ বিদেশিদের বলেছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নির্বাচন হবে। তিন মাস পর ফের নির্বাচন দেয়া হবে। কিন্তু তারা সেটা না করে প্রতারণা করেছে। এখন চীন বলেছে, বাংলাদেশে তারা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়। আমরা মনে করি, আগামী নির্বাচনে এ প্রতারকদের পেছনে কেউ হাঁটবে না।’
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতিতে ‘গোটা জাতি উদ্বিগ্ন’
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যে ক্রমাগত অবনতির খবরে ‘গোটা জাতি এখন চরম উদ্বিগ্ন’ বলে দাবি করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। কোনো ওষুধ এখন আর কাজ করছে না। ২৮ এপ্রিল বিকেলে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন সড়কের পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি এ কথা জানান। ফখরুল বলেন, ‘খালেদা জিয়ার শরীরের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। তার বাম হাত শক্ত হয়ে ওজন বেড়ে যাচ্ছে। বাম পাশ দিয়ে পা পর্যন্ত যন্ত্রণা বাড়ছে। সরকারি মেডিকেল বোর্ডের লেখা ওষুধগুলো কাজ করছে না। এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।’ খালেদা জিয়া এখন যে পরিবেশে আছেন তাতে একজন সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে। কোনো অসুস্থ মানুষের সুস্থ হওয়া সম্ভব নয়। এ অবস্থায় তার থাকার পরিবেশ পরিবর্তন করা দরকার বলেও মনে করে বিএনপি। দলটির শীর্ষনেতারা আরও জানিয়েছেন, কারাগারে খালেদা জিয়া ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। অথচ সরকার বিষয়টি নিয়ে মশকরা করছে।
এদিকে, অনস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা না করালে বেগম জিয়া যেকোনো সময় অন্ধ হয়ে যেতে পারেন বলে জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. আব্দুল কুদ্দুস। একটু হাটলে হাটু অবস হয়ে যায় তার। এসব সমস্যায় যেকোনো সময়ে খালেদা জিয়া প্যারালাইজডও হয়ে যেতে পারেন বলে জানিয়েছেন তার অপর চিকিৎসক ডা. ওয়াহিদুর রহমান।
বিএনপি চেয়ারপারসনের ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর অনুমতি চেয়েছে কারা অধিদফতর। এ জন্য কারা চিকিৎসক ও সিভিল সার্জনের সুপারিশ অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠিও দিয়েছেন কারা কর্তৃপক্ষ। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তারেক রহমানের নাগরিকত্ব বিতর্ক
হঠাৎ করেই দেশের রাজনৈতিক আলোচনার মাঠে টেনে আনা হয়েছে তারেক রহমানের নাগরিকত্ব, লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়গ্রহণ ও পাসপোর্ট ইস্যু। বিষয়টি নিয়ে এখনো বেশ উত্তাপ চলছে রাজনীতিতে। প্রথম গত ২৩ এপ্রিল লন্ডনে প্রসঙ্গটি আলোচনায় আনেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। ১/১১-এর সরকারের সময় ২০০৮ সালে সপরিবারে লন্ডনে যেতে বাধ্য হন তারেক রহমান। সেখানে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের আদালতে দুটি মামলায় তার সাত ও দশ বছরের সাজার রায় হয়। যে পাসপোর্ট নিয়ে তারেক লন্ডন গিয়েছিলেন, তার মেয়াদ ২০১৩ সালে ফুরিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গত ২৩ এপ্রিল বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছেলে তার পাসপোর্ট যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে ‘সারেন্ডার’ করেছেন এবং এমনকি তারেক বাংলাদেশের নাগরিকত্বও ত্যাগ করেছেন বলে দাবি করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
বিশ্লেষকদের মতে, এ মুহূর্তে তারেক রহমানকে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার বিরুদ্ধে আদালতের দেওয়া সাজা কার্যকর করা হবে। কিন্তু বৃটেনে তারেক রহমান রাজনৈতিক আশ্রয় থাকার কারণে তাকে দেশে এনে এখনই কারাগারে পোরা সম্ভব নয়। ফলে আলোচনায় আনা হয় তার নাগরিকত্ব প্রসঙ্গ।
প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। তারেক রহমানের বক্তব্য না নিয়েই তা ছেপে দেয় দেশের দুটি জাতীয় দৈনিক। পরে ওই দুটি পত্রিকার সম্পাদকসহ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে উকিল নোটিশ পাঠান তারেক রহমান। গত ২৩ এপ্রিল আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো উকিল নোটিশে শাহরিয়ার আলমসহ পত্রিকা দুটিকে তারেক রহমানের নাগরিকত্ব ত্যাগের সত্যতা প্রমাণের জন্য ১০ দিনের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। অন্যথায় ক্ষমা না চাইলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয় উকিল নোটিশে। এর পরই বিষয়টি চলে আসে দেশের রাজনৈতিক আলোচনা-তর্ক-বিতর্কের কেন্দ্রে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল সংবাদ সম্মেলনে জানান, তারেক রহমান তার পাসপোর্ট বৃটিশ হোম অফিসে জমা দিয়েছেন রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য। তবে তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেননি।
পাসপোর্ট না থাকলেও বাংলাদেশের নাগরিকত্বে কোনো সমস্যা নেই বলে জানান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যতটুকু জেনেছি, তিনি যুক্তরাজ্যে নিজের পাসপোর্ট জমা দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। এটার অর্থ এই নয় যে, তিনি বাংলাদেশে আর আসতে পারবেন না।’ সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘পাসপোর্ট না থাকলেও বাংলাদেশের নাগরিকত্বে কোনো সমস্যা নেই। পাসপোর্ট হলো কেবল একটি ট্রাভেল ডকুমেন্ট।’
একই ইস্যুতে পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাসুদ রেজওয়ান বলেছেন, ‘পাসপোর্ট না থাকার সঙ্গে নাগরিকত্ব থাকা না-থাকার কোনো সম্পর্ক নেই।’ পাসপোর্ট মহাপরিচালক বলেন, ‘তারেক রহমানের হাতে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কোনো পাসপোর্ট নেই। ট্র্যাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরতেও তার কোনো বাধা নেই।’
এদিকে ভুলে ভরা বৃটিশ হোম অফিসের কথিত চিঠি জনসমক্ষে প্রকাশের কারণে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে বৃটেন। কূটনৈতিক যোগাযোগ সংক্রান্ত গোপন নথি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় বৃটিশ সরকারের গভীর উদ্বেগ ও বিরক্তি রয়েছে। জানা গেছে, বিষয়টি  বৃটেনের তরফে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ নিয়ে  ঢাকার সঙ্গে বৃটিশ ফরেন অফিসের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগও হয়েছে। তারা বিষয়টি জানার চেষ্টা করছেন।
খালেদা জিয়া-তারেক রহমান ছাড়াই নির্বাচন চায় সরকার
সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়া ও লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাইরে রেখেই নির্বাচন করতে চায় সরকার। সেই লক্ষ্যে নানা ধরনের ছকও তৈরি করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবেই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে বর্তমানে কারাগারে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে তারেক রহমানকে মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় সাত বছরের ও জিয়া অরফানেজ মামলায় ১০ বছরের জেল দেয়া হয়েছে। আগামী নির্বাচনের আগেই তাদের বিরুদ্ধে চলমান আরো একাধিক মামলার রায় হতে পারে। সাজা হওয়ায় মা ও ছেলে উভয়কেই নির্বাচনে অযোগ্য করা হতে পারে। তাছাড়া নির্বাচনের আগে তারেক রহমান দেশে ফিরতে পারবেন না বলেই অনেকের বিশ্বাস। দেশে না এলে সাজার বিরুদ্ধে আপিল করাও সম্ভব নয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বাইরে রেখেই একাদশ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে চায় আওয়ামী লীগ।
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে নির্বাচনের বাইরে রাখা গেলে বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেয়া হলেও দলের দুই শীর্ষ নেতাকে বাদ দিয়ে বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে না-ও যেতে পারে। এতে আওয়ামী লীগ আগের মতো একতরফা নির্বাচনে কোনো বাধা ছাড়াই আবারো ক্ষমতায় থাকতে পারবে। অন্যদিকে বিএনপি যদি দুই শীর্ষ নেতাকে বাদ দিয়েই নির্বাচনে আসতে রাজি হয়, তবে ওই নির্বাচনে নেতাকর্মীদের আর তেমন কোনো আগ্রহ থাকবে না। ফলে এমনিতেই আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে আবারো সরকার গঠন করতে পারবে বলে তাদের বিশ্বাস।
অবশ্য খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজার পর বিএনপি বড় ধরনের কোনো আন্দোলন না করায় সরকার খানিকটা অবাক হয়েছে। তাই কৌশলও বদলিয়েছে সরকার। বর্তমানে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো ২৮টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, গ্যাটকো, নাইকো ও বড় পুকুরিয়া দুর্নীতি মামলা অন্যতম। নির্বাচনের আগেই এসব মামলার মধ্যে আরো কয়েকটির রায় হয়ে যেতে পারে। ফলে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে কারাগার থেকে তার বের হওয়ার সুযোগ অনেকটাই ক্ষীণ।
সরকারের বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনে কোনোভাবেই হারতে রাজি নয় আওয়ামী লীগ। কট্টরপন্থী নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ ওই নির্বাচনেও বিএনপিকে অংশ নিতে দিতে চান না। তারা আবারো কৌশলে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রেখে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে নির্বাচন নামের আরেকটি প্রহসন করতে চান। এর মাধ্যমে বিএনপি একসময় রাজনীতি থেকেই হারিয়ে যাবে বলে মনে করছেন তারা।
নির্বাচন নিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলের ভাবনা
শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকা কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লোক দেখানো সংসদ নির্বাচন নয়, জনগণ যেনো শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে সেরকম নির্বাচন জনগণ দেখতে চায়। লোক দেখানো কোনো নির্বাচন হলে জনগণ তা মানবে না। এ কথা বলেছেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি আরো বলেছেন, ৫ জানুয়ারির মতো ভবিষ্যতে নির্বাচন হলে জনগণ গণতন্ত্র ও নির্বাচনের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলবে, লাভবান হবে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। তাই এ ধরনের নির্বাচন ঠেকানোর জন্য জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন ড. কামাল।
আর বর্তমান সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দেশে যে অবস্থা চলছে এতে নির্বাচিত সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানুষ মানতে চায় না। পৃথিবীর অন্য দেশে এই প্রথা চললেও আমাদের দেশে অচল।’
সরকার না চাইলে নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না
যদি সরকার না চায় তাহলে নির্বাচন কমিশনাররা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবে না বলে মনে করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘প্রশাসনের লোকজন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তারা তাদের মত, পদ এবং ভিন্নতা দেখাতেই পারে। সবচেয়ে শক্তিশালী, কার্যকর এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন হলেও সরকার না চাইলে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবে না।’ একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে এখনো অনেক অমীমাংসিত বিষয়ের সুরাহা হয়নি। এ অবস্থায় সামনে মাঠ প্রশাসনে রদবদল এবং কূটনৈতিক চাপ বাড়লে রাজনীতি উত্তপ্ত হবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, সব দল প্রস্তুতি নিলেও অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সংকট কাটেনি।
(সাপ্তাহকি শীর্ষকাগজে ৭ মে ২০১৮ প্রকাশতি)