শুক্রবার, ১৭-আগস্ট ২০১৮, ০৩:৪৯ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রভাবশালী এক ভাতিজাকে দিয়েই অবৈধ নিয়োগ শুরু যেভাবে
নিবন্ধন অধিদফতরে অনিয়ম-দুর্নীতি

প্রভাবশালী এক ভাতিজাকে দিয়েই অবৈধ নিয়োগ শুরু যেভাবে

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০৯:৪১ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য : প্রভাবশালী এক ভাতিজাকে অবৈধ নিয়োগের মধ্য দিয়ে নিবন্ধন অধিদফতরে কেন্দ্রীয়ভাবে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী বেআইনি নিয়োগ-বদলির যে যাত্রা শুরু হয়েছে তা চলছেই। এতে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটিতে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রম। সারাদেশে এর প্রতিবাদ হলেও কোনো ফল হয়নি। বরং এখন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কেন্দ্রীয়ভাবেই সারাদেশে ব্যাপকহারে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ ও পদায়ন হচ্ছে।  
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে আইনমন্ত্রীর পিএস মো. মাসুমের ভাতিজা খন্দকার মো. তুহিনকে অবৈধ নিয়োগ ও পদায়নের মাধ্যমে নিবন্ধন অধিদফতরে বেআইনি নিয়োগের যে প্রবণতা শুরু হয় এখন তা রীতিমত বড় অংকের নিয়োগ বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে। নিবন্ধন অধিদফতরে (তৎকালীন পরিদফতর) অফিস সহকারী পদে তুহিনকে নিয়োগ দিয়ে ০৩/০৩/২০১৫ তারিখের ২৪৬০(৪) নং স্মারকের আদেশে ঢাকার ডেমরা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে একই পদে বদলি করেন নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিদর্শক (আইজিআর) খান মো. আব্দুল মান্নান। যদিও নিবন্ধন পরিদফতরের মাঠ পর্যায়ে এভাবে কর্মচারী নিয়োগের সুযোগ নেই। এই অবৈধ নিয়োগ ও বদলির প্রতিবাদে তখন সারাদেশে ভূমি রেজিস্ট্রেশন বিভাগে আন্দোলন হয়। এ সময় নকল নবীশ নেতা চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম ও মফিজুল হকের নেতৃত্বে অবৈধ নিয়োগ বাতিলের দাবিতে সারাদেশে আন্দোলন করেন নকল নবীশরা। সেই সাথে সাব রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। বিক্ষুব্ধ নকল নবীশরা এ সময় জেলা রেজিস্ট্রার অফিস অবরোধ করে রাখেন। তারা স্লোগান দেন- ‘আইজিআরের চামড়া, তুলে নেব আমরা’। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আইজিআর খান মো. আব্দুল মান্নান নকল নবীশ নেতা মফিজুল হককে পরিদফতরে (বর্তমানে অধিদফতর) বদলি করে শাস্তি দেন। একই সাথে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী রাজধানীর বিভিন্ন সাব রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত অন্য নেতাদের কেরানীগঞ্জে বদলি করা হয়। এছাড়া বেশ ক’জনকে সাময়িক বরখাস্তও করেন খান মো. আব্দুল মান্নান।
নিবন্ধন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, খন্দকার তুহিনের অবৈধ নিয়োগ ও বদলির কারণে ওই সময় সারাদেশে রেজিস্ট্রেশন অফিস বন্ধ থাকে। নিবন্ধন মহাপরিদর্শকের বেআইনি কর্মকা-ের কারণেই সাব রেজিস্ট্রি অফিসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ সময় জনগণ হয়রানির শিকার হন। সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হতে বঞ্চিত হয়। এর ফলে নিবন্ধন অধিদফতরের অধীন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। যদিও তারা ওএসডি, বদলি ও হয়রানির ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
সূত্রমতে, ডেমরা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ৬ মাস না যেতেই তুহিনকে ফের ঢাকা জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় অফিস- বাড্ডা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করে আনা হয়। অপরদিকে বাড্ডা অফিসের অফিস সহকারী মো. হানিফকে বদলি করা হয় অন্যত্র। যদিও হানিফের চাকরির বয়স তখনো একবছর পূর্ণ হয়নি। হানিফ একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হওয়ার পরও তাকে হয়রানিমূলক বদলি করা হয়। এছাড়া বাড্ডা অফিসের ঘুষ বাণিজ্য আরও জমজমাট করার জন্য অন্যান্য সাব রেজিস্ট্রি অফিসের মৌজা কেটে বাড্ডা অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
উল্লেখ্য, নিবন্ধন অধিদফতরের মাঠ পর্যায়ে এভাবে সরাসরি কোনও কর্মচারী নিয়োগের সুযোগ নেই। তারপরও তুহিনকে তখন অবৈধভাবে এ নিয়োগ দেওয়া হয়। তার মধ্য দিয়ে অবৈধ নিয়োগের যে প্রক্রিয়া শুরু হয় সেই ধারা এখনও চলছে। বরং এখন তা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে এবং এটি এক ধরনের নিয়োগ বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে। জেলা রেজিস্ট্রার এবং উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ ও বদলি কার্যক্রম আইজিআর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এ পর্যন্ত অন্তত ৬০ জন কর্মচারী একইভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আরও নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। যদিও এ ধরনের নিয়োগের বিরুদ্ধে এক রিট পিটিশনের (১৪৩১/২০০৬) পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর নিবন্ধন ম্যানুয়েলের ৬ষ্ঠ খ-ে ৩৮৫ পাতায় ‘গ’ ধারায় স্পষ্ট লেখা আছে যে, ‘নকল নবীশ থেকে মোহরার এবং মোহরার থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতির মাধ্যমে অফিস সহকারীর শূন্যপদ পূরণ করতে হবে।’ আর এতে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করতে সময় লাগে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ বছর। একজন কর্মচারী তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করে শেষ জীবনে একটা পদোন্নতির আশায় থাকেন। কিন্তু সেই পদোন্নতি না দিয়ে নিবন্ধন মহাপরিদর্শক তার দফতরে সরাসরি নতুন কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব রেজিস্ট্রি অফিসে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বদলি-পদায়ন করছেন। এতে পদোন্নতি বঞ্চিত হচ্ছেন সারাদেশের হাজার হাজার নকল নবীশ ও মোহরারগণ।
বঞ্চিতরা বলছেন, খান মো. আব্দুল মান্নান নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিদর্শক পদে নিয়োগ পাওয়ার পর ২০১৫ থেকে তার নেতৃত্বে বিধি বহির্ভূত এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। তিনিই এসব নিয়োগ কমিটির প্রধান। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের জন্য নিবন্ধন অধিদফতরের প্রধান কার্যালয় থেকে তার নামেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি হচ্ছে। তিনিই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জেলা পর্যায়ে পদায়ন করছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন নিবন্ধন অধিদফতরে এই বেআইনি নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য শুরু হয়েছে বর্তমান আইনমন্ত্রী দায়িত্বে আসার পর। এতে মন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত নকল নবীশ ও মোহরারগণ।
(সাপ্তাহকি শীর্ষকাগজে ১৯ মার্চ ২০১৮ প্রকাশতি)