মঙ্গলবার, ২৩-অক্টোবর ২০১৮, ০৫:৩৫ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুর ফ্ল্যাট প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্নীতি

গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুর ফ্ল্যাট প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্নীতি

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ০২:১৮ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য : জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে প্লট ও ফ্ল্যাট প্রকল্পের নামে অনিয়ম-দুর্নীতি বেড়েই চলেছে লাগামহীনভাবে। সংস্থাটির লালমাটিয়া ফ্ল্যাট প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ফ্ল্যাট বরাদ্দে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। যা নিয়ে শীর্ষকাগজে ইতিপূর্বে একাধিক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। সর্বশেষ ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুরে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত যে ফ্ল্যাট প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে এটি শুরুই হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্নীতির মধ্য দিয়ে। যেসব প্লট বা জমিতে ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সেগুলো এখন পর্যন্ত বুঝে পায়নি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এমনকি প্লটগুলোর উপর প্রতিষ্ঠানটির পুরো মালিকানাও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যে কারণে নকশা অনুমোদন, ঠিকাদার নিয়োগ বা এর জন্য টেন্ডার আহ্বান করাও সম্ভব হয়নি। তারপরও তড়িঘড়ি করে এসব জমিতে ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা করে চটকদার প্রসপেক্টাস তৈরি করে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন ও অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। যা এক ধরনের প্রতারণার সামিল।
কারণ, আদৌ এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে কিনা বা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ জমিগুলো পরিত্যক্ত সম্পত্তি এবং বিরোধপূর্ণ। কোনও কোনটির ক্ষেত্রে মামলাও চলমান আছে। এ অবস্থায় প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে বা অনির্দিষ্টকালের জন্য বিলম্ব হলে ক্ষতিগ্রস্থ হবেন সাধারণ গ্রাহকরা। এতে সরকারি এ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটির উপর সাধারণ মানুষ আস্থা হারাবেন।
এদিকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েও নানা অনিয়মের প্রক্রিয়া চলছে। যারা ইতিপূর্বে লালমাটিয়াসহ অন্য প্রকল্পে ফ্ল্যাট পেয়েছেন, এমনকি ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন এমন ব্যক্তিরাও ধানম-ি-মোহাম্মদপুর প্রকল্পে ফ্ল্যাটের জন্য আবেদন করেছেন। যদিও তাদের আবেদন করা বা তাদেরকে ফ্ল্যাট বরাদ্দের কোনও সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এরা অধিকাংশই প্রভাবশালী ব্যক্তি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান খন্দকার আক্তারুজ্জামান এসব ব্যক্তিকে অবৈধভাবে ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর সেই কারণেই তারা নিয়ম বহির্ভুতভাবে ফ্ল্যাটের জন্য আবেদন করেছেন।
এছাড়া এই প্রকল্পে আর্থিক শৃঙ্খলাও চরমভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যদিও বাস্তবে প্রকল্পের সব জমি গত একবছরেও বুঝে পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। অথচ এরই মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে ৩৫ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। শুধু তাই নয়, কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সেই ৩৫ কোটিসহ প্রকল্পের আরো ৪৬ কোটি টাকা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এতে পুরো প্রকল্পের ভবিষ্যত নিয়েই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
এখনো বুঝে পায়নি প্রকল্পের জমি
রাজধানীর  ধানম-ি,  মোহাম্মদপুর ও এলিফ্যান্ট রোডে পরিত্যক্ত ১০টি  প্লটের  উপর এই আবাসিক  ফ্ল্যাট  নির্মাণ  প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয় গত বছরের ২৬ অক্টোবর। এরমধ্যে ধানম-ির ৬টি, মোহাম্মদপুরের ৩টি এবং এলিফ্যান্ট রোডের একটি প্লট। সূত্রমতে, এগুলোর ৪টি পরিত্যক্ত প্লটের মালিকানা নিয়ে মামলা চলছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওই জমিতে স্থিতি অবস্থা বজায় রাখতে কোর্টের নির্দেশনা রয়েছে। প্রকল্পের দলিল অনুমোদন (ডিপিপি) নেই। তা সত্ত্বেও প্লানিং শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে, এমনকি জমি বুঝে না পেয়েই প্রসপেক্টাস ছেড়ে ফ্ল্যাট বরাদ্দের আবেদন আহ্বান করা হয়।
১০টি প্লটের দুই একর জায়গার উপর ১৫শ’ থেকে ২৫শ’ বর্গফুটের মোট ২৫৩টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করার কথা বলা হয় প্রসপেক্টাসে। এর মধ্যে ২০২টি বিক্রি করা হবে সাধারণ জনগণ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে। ২০২টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১২১টি কোটার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেয়া হবে সরকারি চাকরিজীবীদেরকে। আর ৮১টি বরাদ্দ দেয়া হবে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বাকি ৫১টি সরকারের আবাসন পরিদফতরে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে অক্টোবর ২০১৭ থেকে জুন ২০২০। প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৩৭৩ কোটি টাকা। এমন তথ্য দিয়ে ফ্ল্যাট বরাদ্দের নামে প্রতারণা করে ৩৫ কোটি টাকা নিয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। ফ্ল্যাট প্রত্যাশীদের কাছ থেকে জামানত হিসেবে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে এ টাকা নেয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ প্রস্তাবের বিপরীতে চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ প্রায় এক হাজার ব্যক্তি আবেদন করেছেন এবং টাকা জমা দিয়েছেন। জনসেবা ধর্মী সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন কার্যত ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার অন্যতম প্রমাণ, মামলাযুক্ত জমিতে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বরাদ্দের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব ভবন বাস্তবে কবে নির্মাণ হবে তা কেউ জানেন না। তাই প্রতারণার মাধ্যমে জনগণের পকেটের টাকা হাতিয়ে নেয়াকে গর্হিত কাজ হিসেবেই দেখছেন সরকারি এই দফতরটির সৎ কর্মকর্তারা।
ফ্ল্যাট বরাদ্দে অনৈতিক পন্থা ও প্রশাসনিক দুর্নীতি
ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেতে “ঢাকা সিটি করপোরেশনের অধীন কোনো জমি নিজ বা পরিবারের সদস্যদের নামে নেই” মর্মে ৩শ’ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে হলফনামা দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের কারণে অনেকের ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো কোনো আবেদনকারী জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মৌখিক পরামর্শে অনুমোদিত টেমপ্লেট অবৈধভাবে পরিবর্তন করে “প্রস্তাবিত ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেলে বিদ্যমান বা পূর্বে বরাদ্দ পাওয়া প্লট/ ফ্ল্যাট ছেড়ে দেয়া হবে” মর্মে হলফনামা দাখিল করেছেন। যা বিদ্যমান নীতিমালা এবং পরিপত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারি ফ্ল্যাট/ প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ওই বিশেষ কর্মকর্তাদের আবেদন গ্রহণ ও নম্বর প্রদান পূর্বক বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যা সম্পূর্ণ প্রশাসনিক দুর্নীতি।   
হঠকারিতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘন
ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুরে সরকারি চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট দেয়ার কথা বলে ৩৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হলেও ওইসব প্লটের জমি এখনো বুঝে পায়নি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। অথচ প্রসপেক্টাসে ৪ বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ২০২০ সালের জুনের মধ্যে মালিকদের হাতে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু কীভাবে ওই সময়ের মধ্যে প্লট বুঝিয়ে দেয়া হবেÑ এখন পর্যন্ত যেখানে প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদন হয়নি, নকশা তৈরি হয়নি, ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড কর্তৃপক্ষের হঠকারিতা-স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া কিছুই নয়।
এদিকে প্রকল্পের অর্থ খরচ নিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলাও চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। আবেদনকারীদের ৩৫ কোটি টাকা ব্যাংক ডিপোজিটসহ প্রকল্পের সর্বমোট ৮১ কোটি টাকা অন্যত্র খরচ করেছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এতে ফ্ল্যাট না পাওয়া প্রায় ৮০০ জন আবেদনকারী পরবর্তীতে জামানতের টাকার জন্য হয়রানির শিকার হবেন নিঃসন্দেহে। যা সরকারি আর্থিক শৃঙ্খলার চরম লঙ্ঘন। এতে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হবে এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমর্যাদাও ক্ষুণœ হবে। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতা এবং হঠকারী সিদ্ধান্তে প্রকল্পে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে দফতরটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
(সাপ্তাহকি শীর্ষকাগজে ১৯ মার্চ ২০১৮ প্রকাশতি)