মঙ্গলবার, ২৪-এপ্রিল ২০১৮, ০৮:৪১ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন নিয়ে সংশয়: আল-জাজিরা

sheershanews24.com

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০৯:৩৯ পূর্বাহ্ন

শীর্ষনিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কারাবাস ও রাষ্ট্রের হাতে ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতনের ফলে দেশটির আগামী নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পরবর্তী নির্বাচন হবে সহিংস উপহাস মাত্র। ২০১৪ সালের সর্বশেষ নির্বাচন প্রায় সব ক’টি বিরোধী দলই বর্জন করেছিল। ব্যাপক আকারে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ফলে ওই নির্বাচন হয়েছে বিতর্কিত। এবারও তারই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বিরাজ করছে বাংলাদেশে। মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এমনটা বলা হয়েছে।

খবরে বলা হয়, সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা কারাবন্দী বা তার চেয়েও খারাপ কিছু হওয়ার আশঙ্কায় দিনতিপাত করছে। সাধারণ মানুষের মনেও নির্বাচনী বছর নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। এ বছরের ডিসেম্বরে সংসদীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশে।

ঢাকার একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নাদিয়া তাবাসসুম খান মনে করেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেভাবে সকল ধরনের ভিন্নমত দমন করেছে, তাতে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস কারোই হবে না। ঢাকাভিত্তিক একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিক হাসান হাবিব বলেন, ‘প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে শত্রুতা’র দরুন নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বলপূর্বক অন্তর্ধান
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ফেব্রুয়ারি থেকে বন্দী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষে এখন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা ক্রমেই দুরূহ ঠেকছে যে, সরকার ক্রমেই কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮ ফেব্রুয়ারি নিজের স্বামী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি দাতব্য সংস্থার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। তার বড় ছেলে ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী তারেক রহমান ও আরও চার জনকে ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। প্রায় এক মাস পর খালেদা জিয়াকে জামিন দেয়া হয়। তবে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ওই জামিন স্থগিত করেন। ফলে অন্তত আগামী ৮ মে পর্যন্ত ৭২ বছর বয়সী খালেদা জিয়া কারাগারে থাকছেন।

এতে বলা হয়, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর গ্রেপ্তার ও বন্দীত্ব বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে সহিংসতা সৃষ্টি করেছে। বিএনপি অভিযোগ করছে, খালেদা জিয়াকে রাজনীতির বাইরে রাখতে সরকারি চক্রান্তের অংশ হিসেবে তাকে জেলে ঢুকানো হয়েছে।

পুলিশের হিসাব মতে, খালেদা জিয়ার রায় প্রদানের দিন প্রায় ৩০০ বিএনপি নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারির পর থেকে এখন অবধি ৩ হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী কারাগারে।  

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশি রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন। তাদের তিক্ত শত্রুতা বাংলাদেশকে প্রায়ই সহিংসতা ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বিএনপি অভিযোগ করছে, ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে দলটির প্রায় ৫ শতাধিক সমর্থককে হত্যা ও প্রায় ৭৫০ জনকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে। দলটি দাবি করে, নিখোঁজ নেতাকর্মীদের মধ্যে কমপক্ষে ১৫০ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে অথবা গুম করা হয়েছে।

খালেদা জিয়ার রায়ের পর কর্মপরিকল্পনা এখনও ঠিক করেনি বিএনপি। এখন পর্যন্ত অসহিংস কর্মসূচিই দিয়েছে দলটি। তবে রাজনৈতিক সভার জন্য অনুমতি বাতিল হওয়ায় বিএনপির অনেকেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন। বড় আকারে সহিংসতা অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করে ফেলতে পারে।

দেশটি এখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনাধীন
সম্প্রতি জার্মান থিংক ট্যাংক বার্টলসম্যান ফাউন্ডেশন কর্তৃক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে; যাতে বলা হয়, দেশটি এখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনাধীন। ১৩টি দেশকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডায় গণতন্ত্র কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে অবনমনের মধ্যদিয়ে গেছে। ফলে এই ৫টি দেশ এখন গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদণ্ড রক্ষা করতে পারছে না।

নির্বাচন নিয়ে সংশয়
আল জাজিরা বলছে, বাংলাদেশের ভেতরের ও বাইরের পর্যবেক্ষকরা বার্টলসম্যান ফাউন্ডেশনের ওই কড়া প্রতিবেদনের সঙ্গে মোটামুটি সহমত পোষণ করেছেন। ১০ বছরের শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনমন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, ২০১০ সালের পর থেকে বলপূর্বক অন্তর্ধানের শিকার হয়েছে প্রায় ৫১৯ জন। এছাড়া ৩০০ জন এখনও নিখোঁজ।

কাতার ও ভিয়েতনামে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানকে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা উঠিয়ে নিয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘সরকার বিরোধী পোস্ট’ দেওয়ার অভিযোগ উঠানো হয়। তার মেয়ে শাবনম জামান বলেন, ‘৪ ডিসেম্বর থেকে আমার পিতা নিখোঁজ।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ যখন আমার পিতার অন্তর্ধান হওয়ার সম্যক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হয়েছে, তখন থেকেই তারা তদন্ত থামিয়ে দিয়েছে।’

এ বছরের মার্চে বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের এক নেতা জাকির হোসেন হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাকে নির্যাতন করেছে পুলিশ। গত বছর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, সরকার গোপনে শ’ শ’ মানুষকে আটক করেছে। এদের বেশির ভাগই সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী।
তবে এ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে আওয়ামী লীগ। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে বিএনপির ওপর রাজনৈতিক নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে বিরোধী দল। ‘তবে তার মানে এই নয় যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সেসব কর্মকাণ্ডে বাধা দেবে না, যেগুলোর কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হতে পারে,’ বলেন তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সংবিধান অনুযায়ী। বিএনপির ওই নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক। তারা এখন বুঝতে পারছে সেই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।’

বাংলাদেশি এই মন্ত্রী জার্মান থিংকট্যাংকের ওই পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও একমত নন। সরকার স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, এমন দাবিকে তিনি উদ্দেশ্যমূলক ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, বার্টলসম্যান স্টিফটাং তাদের উপাত্ত কোন সূত্র থেকে সংগ্রহ করেছে, তা জানতে আগ্রহী তিনি। তার মতে, ‘গণতন্ত্রের সকল শাখা, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম বাংলাদেশে সম্পূর্ণ স্বাধীন।’

আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ফারুক খান বলেন, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ সঠিক নয়। তার ভাষ্য, ‘আমাদের সরকার বরং মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার নজির স্থাপন করেছে।’
তবে বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা সরকারের এসব যুক্তি মানতে রাজি নন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিকভাবে সাড়া প্রদানের ফলে বাংলাদেশ হয়তো আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা পেয়েছে। তবে দেশটির ঘরোয়া মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ‘সরকার এখনও গুমের বিষয়টি অস্বীকার করে চলেছে। সরকারকে অবশ্যই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটককৃত ব্যক্তিবিশেষকে মুক্তি দিতে হবে। গুম হওয়া অনেকেই রাজনৈতিক বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’

মিনাক্ষী গাঙ্গুলি আরও বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা এক ভয়ের পরিবেশে কাজ করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় অনেক নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে অনুকূল নয়, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন তো দূরের কথা। আলী রীয়াজ মনে করেন, চাপের মুখে থাকা বিএনপি যদি আগামী নির্বাচনও বয়কট করতে বাধ্য হয়, তাহলে সেই নির্বাচনেরও ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো কোনো নৈতিক বৈধতা থাকবে না। তার ভাষ্য, ‘বিরোধী পক্ষকে অব্যাহতভাবে নির্যাতন করা শুধু অবিচক্ষণ সিদ্ধান্তই নয়, এটি হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনে। বাংলাদেশের শাসক দলগুলোর মধ্যে তা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থাকে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, সরকার নিরাপত্তার অজুহাতে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দিচ্ছে না। অথচ, নির্বাচনকে সামনে রেখে শাসক দল বিরাট বিরাট সভা-সমাবেশ করেই যাচ্ছে।

আসিফ নজরুল বলেন, ‘এটি এমন এক সরকার ও রাজনৈতিক দল যারা বিশ্বাস করে তারা কারও কাছেই জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। এটি গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক এক লক্ষণ।’

শীর্ষনিউজ/এইচএস