শনিবার, ২১-এপ্রিল ২০১৮, ০১:৩৮ অপরাহ্ন

ইয়াবা কারবারিদের ‘মৃত্যুদণ্ড’

sheershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ মার্চ, ২০১৮ ০২:২৯ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ, ঢাকা: দেশে বর্তমানে সন্ত্রাস, জঙ্গির চেয়েও ভয়াবহ সমস্যা হচ্ছে মাদক। আর মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা এখন ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছে। ইয়াবা সেবনে স্কুল শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে তরুণ-তরুণী, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ জড়িয়ে পড়ছেন। এতে সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি খুন, ধর্ষণ, ছিনতাইসহ নানা ধরনের সামাজিক অপরাধ চরম আকার ধারণ করেছে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে মাদকদ্রব্য হিসেবে ইয়াবার নাম নেই। ফলে এর ব্যবসা, সেবন ও পরিবহন করেও বিদ্যামান আইনে বড় ধরনের শাস্তি পেতে হয় না জড়িতদের।
জানা গেছে, বিদ্যমান নির্দিষ্ট কিছু মাদকদ্রব্য জিম্মায় বা দখলে রাখা এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে মৃত্যুদ-ের বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইয়াবা মাদক হিসেবে না থাকায় আইনের ফাঁকে আসামিরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। আইনের দুর্বলতার কারণে ইয়াবা পাচার, ব্যবসা ও ব্যবহারকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এ সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নতুন আইনে ইয়াবা ব্যবসা তথা এটি মজুদ, বিক্রয়, পরিবহন ও সংরক্ষণ করলে সর্বোচ্চ সাজা ‘মৃত্যুদ-ের’ প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রথমবারের মতো সিসাকেও মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বিদ্যমান ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিভিন্ন ধরনের মাদকের নাম থাকলেও ইয়াবার নাম ছিল না। ওই আইন যখন করা হয়, তখনও ইয়াবার প্রচলন হয়নি। তবে এরই মধ্যে ইয়াবার ছোবলে দেশের যুব সমাজের বিশালাংশ ধ্বংস হতে চলেছে।
সূত্রমতে, প্রস্তাবিত আইনে ইয়াবাকে ‘ক’ শ্রেণির তফসিলভুক্ত মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও চিকিৎসকদের মতে, ইয়াবা ট্যাবলেটে এমফিটামিন ও ক্যাফেইনের মতো যে মিশ্রণ রয়েছে- তা ‘ক’ শ্রেণির মাদক। কেউ ২০০ গ্রাম ইয়াবা ট্যাবলেট বা ইয়াবার উপাদান সরবরাহ বা পরিবহন করলে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ে দ-িত করা হবে।

নতুন আইনে সিসাকেও (বিভিন্ন ধরনের ভেষজের নির্যাস, নিকোটিন এবং এসেন্স ক্যারামেল মিশ্রিত ফ্রুট স্লাইস দিয়ে তৈরি পদার্থ) মাদকদ্রব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ১৯৯০ সালের বিদ্যমান আইনে সিসাও মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অথচ এই সিসায় আসক্ত হয়ে যুবক-যুবতীরা নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে। অভিভাবক মহলেও দুশ্চিন্তা বেড়েছে। কেউ সিসা বহন কিংবা মজুদ করলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।

প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, সরকার জনস্বার্থে মাদকের ভয়াবহতা বিবেচনা করে রাষ্ট্রের যেকোনো অঞ্চলকে বিশেষ মাদকপ্রবণ অঞ্চল ঘোষণা দিতে পারবে। ফলে ওই অঞ্চলে মাদক অপরাধ সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য জনবল, লজিস্টিকসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।
প্রস্তাবিত আইনে আরও বলা হয়েছে, আইনের উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে সরকার দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি, কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত অন্য কোনোভাবে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এরই মধ্যে আইনটি যুগোপযোগী করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ নাম দেওয়া হয়। মাদকদ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও চাহিদা হ্রাস, অপব্যবহার ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মাদকদ্রব্যের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয় নতুন আইনে সংযুক্ত করা হচ্ছে।
বিদ্যমান আইনের বিভিন্ন দিক আলোচনা করে বলা হয়, ইয়াবা পাচারকারীরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তবে এটি মাদক হিসেবে তফসিলভুক্ত না থাকায় ইয়াবায় মাদক এমফিটামিন ব্যবহৃত হয়, এটা উল্লেখ করে বিদ্যমান আইনের ১৯ (১)-এর ৯(ক) ও ৯ (খ) ধারায় বিচার হয়ে আসছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছরের কারাদ-।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনকে সংশোধন করে যুগোপযোগী করা হচ্ছে। এই আইনে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করেন তিনি।
সচিব আরও বলেন, দেশের ৬৫ শতাংশ জনগণ কর্মক্ষম। তাদের কাজে লাগাতে না পারলে সরকারের রূপকল্প অর্জন সম্ভব নয়।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটি থাকবে। কমিটির চেয়ারম্যান হবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সদস্য থাকবেন অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, ধর্মমন্ত্রী, যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিববৃন্দ, পুলিশপ্রধান, সরকার মনোনীত বিশিষ্ট সাংবাদিক, সমাজসেবকসহ ৩৮ সদস্য। এই কমিটি মাদকদ্রব্যের আমদানি, রফতানি, উৎপাদন, বিপণন, সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে অনুমোদন দেবে। অধিদপ্তরের প্রণীত কর্মকৌশল, সুপারিশ ও নীতিমালা অনুমোদন দেবে জাতীয় কমিটি।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ইয়াবার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাদক আন্তর্জাতিক সমস্যা। এটা নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ চলছে। মাদক প্রবেশ রোধে বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে শক্তিশালী করা হয়েছে। ইয়াবা মাদক হিসেব বর্তমান আইনে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি সংশোধন করে ইয়াবাকে ‘ক’ শ্রেণির মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তি রাখা হয়েছে মৃত্যুদ-। তবে শুধু শাস্তি দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য মসজিদের ইমাম, গণমাধ্যম, শিক্ষক, আলেম, সমাজসেবক, এনজিও ও জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের আগ্রাসন ভিশন-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে অন্যতম অন্তরায়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে দেশের বৃহৎ জনশক্তি যুব সমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। অথচ সমাজের কিছু অর্থলিপ্সু মানুষ যুব সম্প্রদায়কে ইয়াবা নেশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যায় ইয়াবা কারবারীরা।

তবে প্রস্তাবিত নতুন আইনকে স্বাগত জানিয়ে মাদকবিরোধী সংগঠন মানসের প্রধান ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, মাদক ব্যবহারে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। এর নেপথ্যে রয়েছে মাদক গডফাদাররা। তারা যাতে আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে না যেতে পারে সেটি খেয়াল রেখে গডফাদারদের আটকের ব্যবস্থা করতে হবে।

শীর্ষনিউজ/এইচএস