শনিবার, ২১-জুলাই ২০১৮, ১১:২৯ পূর্বাহ্ন

বিমান বিধ্বস্তের কারণ আদৌ উদঘাটন হবে কি?

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ মার্চ, ২০১৮ ০৬:৪৪ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য : কোনো দুর্ঘটনাই কারো জন্য কাম্য নয়। তবুও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হচ্ছে পরিবেশ। এ দুর্ঘটনা যেমন সড়কে ঘটছে, রেলপথ, নৌ-পথেও ঘটছে। আকাশ পথও এর ব্যাতিক্রম নয়। তাই কোনো যাত্রা পথই এখন আর নিরাপদ ভাবা যাচ্ছে না। কিন্তু গত ১২ মার্চ নেপালে ঘটে যাওয়া বিমান দুর্ঘটনাটি বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সের জন্য একটি বড় ধরনের আঘাত। ১৯৮৪ সালের পর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা। ১৫ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া খবরে এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন। বিমানটির চারজন ক্রুসহ নিহতদের মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশি। অন্য নিহতদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন সিলেটের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। তারা সবাই নেপালের নাগরিক। এছাড়া ৭১ জন বিমান আরোহীর মধ্যে ২০ জন আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যেও ১০ জন বাংলাদেশি। আহতদের মধ্যে বেশ ক’জন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এই দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে বিতর্ক ও পরস্পরকে দোষারোপ। নেপাল কর্তৃপক্ষ ইউএস-বাংলাকে দায়ী করছে দুর্ঘটনার জন্যে। অপরদিকে বিমানটির মালিকপক্ষ নেপালকে দোষারোপ করছে। এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে তদন্তের ফলাফল কবে জানা যাবে বা আদৌ জানা যাবে কিনা- এ নিয়ে সন্দেহ-সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্ত শেষ হতে অন্তত এক বছর লেগে যেতে পারে। এমনকি সময় আরও বাড়তে পারে। তবে এ মুহূর্তে তদন্তের প্রতিবেদন জানার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিহতদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর ও নিজ দেশে প্রেরণের দ্রুত ব্যবস্থা করা। কিন্তু এ নিয়েও চলছে নানা গড়িমসি। যা স্বজনহারাদের মনে কষ্টের সাথে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বজনহারা পরিবারের সদস্যরা। এমনকি হাসপাতালে লাশ শনাক্ত ও পরিবারের সদস্যদের দেখানোর ক্ষেত্রেও নেপাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উদাসীনতার অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। বাংলাদেশ দূতাবাসসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের তীর ছুঁড়ছেন ভুক্তভোগীরা। যদিও নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। দূতাবাস ও নেপালে সফররত বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, হতাহতদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। বিশেষ করে যেসব লাশের ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে- তাদের ক্ষেত্রে এ সময়টা প্রায় মাস খানেক হবে। এতে নিহতদের পরিবারে হতাশা তৈরি হয়েছে। লাশ পাওয়া না পাওয়া নিয়ে স্বজনদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।  
লাশ শনাক্ত ও দেশে আনতে অনিশ্চয়তা
এখনও স্পষ্ট নয় কবে ফিরিয়ে আনা যাবে নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ। এমনকি স্বজনরা লাশ শনাক্ত করার পরও তাদেরকে দেখতে দেয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন নেপালে যাওয়া স্বজনরা। যদিও ময়নাতদন্ত শেষ হলেই তাদের লাশ নেপাল থেকে দেশে আনা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের বেসামরিক বিমানমন্ত্রী শাহজাহান কামাল। ১৪ মার্চ সকালে নেপালের সেনাপ্রধান জেনারেল রাজেন্দ সেত্রির সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে তিনি এ কথা জানান।
নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের শনাক্ত করতে ও আহতদের খবর নিতে ১৩ মার্চ থেকে নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন হতাহতদের স্বজন ও বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধিরা। পরের দিন নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ ছিল, নিহতদের লাশ দেখতে দেয়া হচ্ছিল না তাদের। নেপাল সরকার নিহতদের লাশ শনাক্তকরণে খুবই ধীরগতিতে কাজ করছে। তারা বলেন, ‘অনেকেই আছেন যাদের চেহারা বোঝা যাচ্ছে। তাদের ছবিও আছে, সেগুলোতে কী সমস্যা? আমাদের সন্দেহ হচ্ছে এখানে লাশ আছে কি না!’
লাশ শনাক্তে ২১ দিন সময় লাগবে
কাঠমান্ডুতে বিমান বিধ্বস্তে নিহত বাংলাদেশিদের লাশ শনাক্তে যাদের ডিএনএ টেস্টের দরকার হবে তাদের ক্ষেত্রে ২১ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস। অন্য লাশের ক্ষেত্রে চারদিন সময় লাগবে। ১৪ মার্চ তিনি সাংবাদিকদের ব্রিফকালে এ কথা জানান। এ সময় স্বজনহারাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘দূতাবাসের দরজা খোলা। প্লিজ, যেকোনো সমস্যা হলে দূতাবাসে আসুন। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের নম্বরগুলোতে যেকোনো সমস্যার কথা জানালে আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করবো সমাধানের।’
এদিকে ১৫ মার্চ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বলেন, ‘এ ধরনের দুর্ঘটনায় সাধারণত ১০ শতাংশ ব্যক্তির ডিএনএ পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়। অন্যদের ক্ষেত্রে দাঁত বা হাড়ের অতীত ইতিহাস, কোনো ধরনের অলংকার বা ধাতব বস্তু বা অন্য কোনো ধরনের শনাক্তকরণ চিহ্ন দেখে শনাক্ত করা হয়। আমি কয়েকটি লাশ দেখেছি। যা দেখে মনে হয়েছে, খালি চোখে তাদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।’
ডিএনএ পরীক্ষায় নেপালে বাংলাদেশের চিকিৎসক দল
দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশি চিকিৎসকদের আট সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ১৫ মার্চ নেপালে গেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক লুৎফুর কাদেরের নেতৃত্বে এই দলে তিনজন বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জন, দুজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ও একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের ডিএনএ’র নমুনা সংগ্রহ করতে কত দিন লাগতে পারে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম বলেন, ‘এটা নির্ভর করবে সেখানকার পরিস্থিতির ওপর। আমরা যত দূর জেনেছি, নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগের শরীরের বড় অংশ আগুনে পুড়ে গেছে। তাই এদের পরিচয় নিশ্চিত করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। ফলে নিহত বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাড়তি সময় লাগতে পারে।’
আহতের অবস্থা কী?
কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। কিছু দিনের মধ্যে সবাই দেশে ফিরতে পারবেন। ১৫ মার্চ পর্যন্ত কাঠমান্ডুতে চিকিৎসাধীন ছিলেন ১০ বাংলাদেশি। এর মধ্যে ওইদিনই কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-কেএমসিতে চিকিৎসাধীন শাহরিন আহমেদ, আলমুন নাহার অ্যানি, কামরুন্নেসা স্বর্ণা ও মেহেদী হাসানকে বাংলাদেশে আনার ব্যাপারে অনাপত্তি দেয়া হয়। শাহরিন আহমেদকে নিয়ে ১৫ মার্চই দেশে ফিরেছেন তার ভাই লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরফরাজ আহমেদ। এদিন বিকেলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়। শাহরিন দেশে ফেরার পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করার কথা জানান ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন। এছাড়া কাঠমান্ডুর ওম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডা. মো. রেজওয়ানুল হককে ১৪ মার্চ সিঙ্গাপুরে নিয়ে গেছেন তার বাবা মোজাম্মেল হক।
নরভিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইয়াকুব আলী ও কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এমরানা কবির হাসিকে দিল্লিতে পাঠানো হয়। তবে ফুসফুসসহ ৩৫-৪০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া হাসির অবস্থা সংকটাপন্ন। গুরুতর আহত বাকি তিন বাংলাদেশির কাঠামান্ডুতেই চিকিৎসা চলবে। এর মধ্যে শেখ রাশেদ রুবাইয়াত ও কবির হোসেন কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজের আইসিইউতে এবং মো. শাহীন বেপারী এ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি আছেন।
প্রায়ই ভুল বার্তা দিত নেপালের এটিসি
১২ মার্চ বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার নেপথ্যে নেপালের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বা এটিসি টাওয়ার থেকে ভুল বার্তা প্রেরণকেই দায়ী করছে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে পাইলট ঠিকমতো বার্তা বুঝতে পারেননি বলে দাবি করছে নেপাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে নেপালের আবহাওয়া বিভাগ ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ভুল বার্তা প্রেরণের অভিযোগটি এর আগেও উঠেছিল। পাইলটদের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৬ সালে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করে নেপালি সংবাদমাধ্যম- হিমালয়ান টাইমস। বিমান অবতরণের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে পাওয়া তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনে হিমালয়ান টাইমস এক পাইলটকে উদ্ধৃত করে জানায়, তিনি প্রায়ই ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ভুল তথ্য পান। শুধু ত্রিভুবন বিমানবন্দর নয়, লুকলাভিত্তিক তেনজিং হিলারি বিমানবন্দরেও একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেছিলেন ওই পাইলট। তখন ওই পাইলট নেপালের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে লুকলা কন্ট্রোল টাওয়ারে কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘লুকলা টাওয়ারের কর্মীরা মানসম্পন্ন কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করছেন কিনা, তা খতিয়ে দেখা উচিত।’ এ ছাড়া একজন সিনিয়র ক্যাপ্টেনও হিমালয়ান টাইমসকে বলেন, ‘বাতাসের গতি, বাতাসের প্রবাহের দিক, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, রানওয়ের দৃষ্টিসীমা ও অন্যান্য আবহাওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে নেপালের কন্ট্রোল টাওয়ার ও আবহাওয়া বিভাগ যেসব তথ্য দেয়, তা প্রায়ই পরস্পরবিরোধী হয়।’
এটিসি ও পাইলটের কথোপকথন ফাঁস নিয়ে বিতর্ক
কাঠমান্ডুর এটিসির সঙ্গে বিধ্বস্ত বিমানটির পাইলটের কথোপকথন দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে ইউটিউবে। তার ভিত্তিতেই দোষারোপের পালা চলছে যে, কার ভুলে দুর্ঘটনায় পড়েছিল বিমানটি। ওই কথোপকথন রেকর্ড করা বা পাবলিক ডোমেইনে প্রকাশ করে দেয়াটা বেআইনি। কিন্তু ভারতের অ্যামেচার রেডিও অপারেটররা বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন বা আইটিইউ-র নির্দেশিকা ভেঙেই এ ধরনের কথোপকথন শোনা এবং রেকর্ডিং করা বহু দেশেই চলছে, ভারতেও চলছে।
ইউএস-বাংলার পাইলট আর কাঠমান্ডু এটিসির এই কথোপকথন এমন একটি ওয়েবসাইটে প্রথম দেয়া হয়েছিল যে সাইটে বিশ্বের বহু এটিসির সঙ্গেই পাইলটদের কথাবার্তার রেকর্ডিং পাওয়া যায়। ওই ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা নানা দেশে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করেন এটিসি এবং পাইলটদের মধ্যে কথোপকথন শোনা এবং তা লাইভস্ট্রিমিং করার জন্য। এ জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও অনেক সময়ে ওই ওয়েবসাইটটিই যোগান দিয়ে থাকে।
ভারতের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ অ্যামেচার রেডিও’র কর্মকর্তা এস. রামমোহন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটিসি এবং পাইলট কোন ফ্রিকোয়েন্সিতে কথা বলছেন, এটা যদি কেউ জানতে পারে আর তার কাছে যদি ভিএইচএফ রেডিও যন্ত্রপাতি থাকে, তাহলে এই কথোপকথন শোনা এবং রেকর্ড করা সম্ভব। এটা কোনো এনক্রিপ্টেড বার্তালাপ নয়। সাধারণ ভিএইচএফ বা ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি স্পেকট্রামেই কথা বলে এটিসি এবং পাইলটরা।’ তিনি বলেন, ‘কারিগরি দিক থেকে এই বার্তালাপ শোনা কঠিন নয়। কিন্তু এটা সারা পৃথিবীতেই বেআইনি।’
আইটিইউ-র নিয়ম অনুযায়ী একজন রেডিও অপারেটরকে যে ফ্রিকোয়েন্সি দেয়া হয়েছে, তিনি তার বাইরে যেতে পারেন না। তবে আবহাওয়ার কারণে অনেক সময়েই অ্যামেচার রেডিও অপারেটরদের যন্ত্রেও পাইলট এবং এটিসির মধ্যকার কথাবার্তা চলে আসে ক্ষণিকের জন্য।
রামমোহনের কথায়, ‘কোনো লাইসেন্সধারী রেডিও অপারেটর টিউন করার সময়ে তার নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির বাইরে ঢুকে পড়তেই পারেন। সেটা বেআইনি নয়। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ধরে সেটা শোনা এবং রেকর্ড করে পাবলিক ডোমেইনে ছড়িয়ে দেয়াটা আইটিইউ’র নিয়ম বর্হিভুত। কোনো লাইসেন্সধারী রেডিও অপারেটর এই কাজ করবে না।’
কলকাতা বিমানবন্দরের কাছাকাছিই থাকেন পশ্চিমবঙ্গ অ্যামেচার রেডিও ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস। তিনি জানান, তার রেডিও যন্ত্রেও মাঝে মাঝে এটিসি এবং পাইলটদের মধ্যেকার কথোপকথন তিনি শুনতে পেয়েছেন। অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস বলেন, ‘লাইসেন্স দেয়ার পরে যে ভিএইচএফ রেডিও দেয়ার কথা, সেগুলোতে ফ্রিকোয়েন্সি লক থাকার নিয়ম। আমরা নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির বাইরে যাতে যেতে না পারি। কিন্তু আমাদের কাছেই এমন অনেক যন্ত্র চলে আসে, যেগুলোর ফ্রিকোয়েন্সি ওপেন রাখা আছে। সেই ধরনের যন্ত্র দিয়েই ১২ মার্চ কাঠমান্ডু এটিসি আর বিমানের পাইলটের মধ্যকার কথোপকথন কেউ রেকর্ড করেছে।’ কিন্তু দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানের পাইলট এবং কাঠমান্ডু এটিসির মধ্যে যে কথাবার্তা ইউটিউবে দেয়া হয়েছে, তা ক্ষণস্থায়ী কথা নয়, প্রায় ২৫ মিনিটের রেকর্ডিং। ‘এটা এমন কেউ বেআইনিভাবে রেকর্ড করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে, যে কাঠমান্ডু টাওয়ারের ৭০-৮০ কিলোমিটারের মধ্যেই থাকে। যদি তার কাছে খুব উন্নতমানের ভিএইচএফ ইকুইপমেন্ট না থাকে, তাহলে ৪০ কিলোমিটারের মতো রেঞ্জ হওয়ার কথা সাধারণ সেটগুলোর। এগুলো যারা করে, তারা নিজেদের নাম লুকিয়েই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ওই ওয়েবসাইটে কারও আসল নাম খুঁজে পাবেন না।’
কীভাবে রেকর্ডিং হয় এটিসি এবং পাইলটদের কথোপকথন?
‘সফটওয়্যার ডিফাইন্ড রেডিও বা এসডিআর বলে একটা ব্যবস্থা আছে। ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে সারা দিনই এসডিআর চালিয়ে রাখে অনেকে। আপনা থেকেই নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে ভেসে আসা সব রেডিও বার্তালাপ রেকর্ডিং হয়ে যায় কম্পিউটারে,’ বলছিলেন নাগ বিশ্বাস। এই বেআইনিভাবে রেকর্ড করা কথোপকথন নিয়েই এখনো সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চলছে যে, ১২ মার্চ নেপালে বিমান দুর্ঘটনার জন্য কে দায়ী? তবে তদন্তকারীরা ইউটিউবে ফাঁস হওয়া কথোপকথনে হয়তো কানই দেবেন না। তারা বিমানটির ব্ল্যাকবক্সে যে কথোপকথন রেকর্ড করা রয়েছে, সেটাকেই প্রামাণ্য বলে মনে করবেন।
তদন্তে ১ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে
নেপালে বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত শেষ করতে এক বছর লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান। ১৫ মার্চ দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান। নাইম হাসান বলেন, ‘প্লেন দুর্ঘটনার ঘটনা তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। দুর্ঘটনার পর থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। আইকাও-এর (ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন) নিয়ম অনুযায়ী ৩৬৫ দিনের মধ্যে তদন্তের নিয়ম রয়েছে। তবে প্রয়োজনে আরও বেশি সময় নেয়া যেতে পেরে।’ নাইম হাসান বলেন, ‘তদন্ত নেপাল করবে। আমাদের টিম তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।’ এর আগে গত ১৩ মার্চ এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান বলেছিলেন, ‘ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা তদন্ত কবে নাগাদ শেষ হবে, তা নির্দিষ্ট করা বলা মুশকিল।’
কীভাবে হয় বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত?
কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। ত্রিভুবন বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের সাথে দুর্ঘটনা কবলিত ফ্লাইটের পাইলটের কথোপকথনের একটি রেকর্ড ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ার পর দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত কীভাবে হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনার তদন্তে এই কথোপকথন ছাড়াও নানা দিক খুঁটিয়ে দেখা হবে। ভারতের এক্সিউটিভ পাইলট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট এবং বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ ভিকে ভাল্লাহ বলেছেন, ‘দুর্ঘটনার পর প্রধানত দুটো দিক দেখা হয়- যন্ত্র বিকল হয়েছিল, নাকি মানুষের ভুল হয়েছিল? সাধারণত যন্ত্রের কারণেই অধিকাংশ বিমান দুর্ঘটনা হয়।’ ভাল্লাহ বলেন, তদন্ত শুরু করা হয় বিমান টেক-অফ করারও অনেক আগের ঘটনাপ্রবাহ থেকে। ‘ফ্লাইটের আগে পাইলটকে কী ব্রিফ করা হয়েছিলো, আগের দিনগুলোতে ওই বিমানে কোনো ত্রুটি কখনো ধরা পড়েছিলো কিনা। ধরা পড়লে সেটা শোধরানো হয়েছিলো কিনা। বিমান ওভারলোড ছিলো কিনা...ইত্যাদি বহু কিছু। সংশ্লিষ্ট বহু মানুষের সাথে কথা বলা হয়। কিন্তু তদন্তের প্রধান দুটো সূত্র- ব্লাকবক্স এবং ফ্লাইই ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর)। ইউএস-বাংলা বিধ্বস্ত ফ্লাইটের ধ্বংসাবশেষ থেকে এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রই উদ্ধার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর ইকবাল হোসেন বলেন, ‘দুর্ঘটনার আগের সমস্ত কথোপকথন বা যান্ত্রিক গোলমালের সমস্ত তথ্য জমা থাকে এই দুটিতে। আগুনে পুড়লেও এগুলো নষ্ট হয় না এবং প্রধানত এই দুটো যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে বিমান দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় করা হয়।’ তিনি জানান, ব্লাকবক্স থেকে তথ্য বের করার সক্ষমতা অধিকাংশ দেশের এখনো নেই। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) সহায়তা নিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বিমান চলাচল সংস্থা- এফএএ এসব ব্যাপারে সাহায্য করে থাকে। কমোডর ইকবাল বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশ এবং নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এ ধরনের সক্ষমতা নেই। সুতরাং তারা হয়তো ব্লাকবক্স আইকাও বা এফএএ’র কাছে নিয়ে যাবে।’ তবে তদন্তের জন্য ব্ল্যাকবক্স কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানের কাছে দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংস্কার হবে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ত্রিভুবন বিমানবন্দর
পাহাড় ঘেরা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরটি কাঠমান্ডু উপত্যকায় এবং শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে। এই বিমানবন্দরেই বিধ্বস্ত হয়েছে ইউএস-বাংলার ফ্লাইটটি। একের পর এক বিমান দুর্ঘটনার কারণে এই বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রায়শই আলোচনা হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে তাদের সমালোচনা হয়েছে। নেপালের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এখন বলছে- ছয় বছর আগে ন্যাশনাল প্রাইড নামে যে প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরের পরিসর বাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছিল সেটা দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানির অবহেলার কারণে সম্পূর্ণ হয়নি। স্প্যানিশ একটি কোম্পানি সানহা আস কন্সট্রাক্টরের সাথে তিন মাস আগেই চুক্তি বাতিল করে নেপালের সরকার। ওই কোম্পানি ৬ বছরে মাত্র ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেছে। কিন্তু এসব তথ্য এতদিন প্রকাশ্যে আসেনি। এখন দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বলছে, বন্দরের চারটি অংশে তারা সংস্কারের কাজ করবে এবং ভিন্ন একটা কোম্পানির সাথে কাজ শুরু করে দিয়েছে তারা।
এভিয়েশন অথরিটির মহাপরিচালক সানজিভ গৌতম গণমাধ্যমকে বলেছেন, চীনা একটা কোম্পানি ট্যানেল, টার্মিনাল ভবন, টার্মিনাল ভবনের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করছে। তিনি বলেছেন, ‘এনক্লাসি ভবন এবং টার্মিনাল বিল্ডিংয়ের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এই কাজ ২০১৯ সালের মধ্যে শেষ হবে।’
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের পরিসর বাড়ানোর জন্য যে প্রকল্প নেয়া হয় সেটাতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ৬ বিলিয়ন রুপি সহায়তা করেছে। মূল পরিকল্পনায় এয়ারক্রাফট পার্কিংয়ের জন্য আরো ১৩টি স্থান বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। নেপালের বিমানবন্দরটিতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কোনো বিমান অবতরণের পর থেকে এ পর্যন্ত ৭০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। বিমানের পাশাপাশি সেখানে হেলিকপ্টারও বিধ্বস্ত হয়েছে। আর সর্বশেষ দুর্ঘটনার শিকার হলো ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটি।
এই দুর্ঘটনা দেশের বেসরকারি বিমানখাতকে প্রভাবিত করবে?
ইউএস বাংলার ফ্লাইটে যে বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটা বাংলাদেশে বিমান পরিবহনের ক্ষেত্রে ১৯৮৪ সালের পর এই প্রথম। বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে বিমান পরিচালনা খুব লাভজনক একটি খাত হিসেবে গড়ে ওঠেনি। এমনকি গত দুই দশকে বেশ কয়েকটি বিমান কোম্পানি চালু হলেও আবার বন্ধও হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি। এর মধ্যে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিধ্বস্ত হওয়ায় দেশের বেসরকারি বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলবে? এ প্রসঙ্গে দেশের একজন বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো গত ৪/৫ বছর ধরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রভাব আসবে। মানুষের মনে ভীতি, আশঙ্কা কাজ করবে। এর ফলে সাময়িকভাবে একটা স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।’ এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে বলে মনে করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টটা যদি ঠিকমত করতে পারে তাহলে আমি মনে করি যাত্রীদের আস্থার জায়গাটা ফিরে আসবে,’ বলছিলেন ওয়াহিদুল আলম।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিমান দুর্ঘটনার নজির রয়েছে। সেসব দেশে বিমান সংস্থা এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ মিলে কতটা আন্তরিকতার সাথে এ ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলা করছে- সেটার দিকে যাত্রীরা নজর রাখে। সেসব ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নেপালের দুর্ঘটনার ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।
বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে বিমানের ফিটনেস, নিরাপত্তা, পাইলটের দক্ষতা এবং সেবার মানদ- এসব কিছু মনিটর করে থাকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। আগে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলের জন্য বাংলাদেশ বিমানের ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন এ দেশের মানুষ। ১৯৯৬ সালে বেসরকারি খাতে প্রথম বিমান সংস্থা হিসেবে অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্সের যাত্রা শুরু হয়। এর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১২টি বিমান সংস্থা এলেও কেবল তিনটি টিকে আছে। এই দুর্ঘটনার পর তাদের টিকে থাকাটাও হুমকির মুখে পড়বে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
প্রসঙ্গত, নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশি কোম্পানি ইউএস-বাংলার বিএস-২১১ ফ্লাইটটি অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়। ১২ মার্চ স্থানীয় সময় বেলা ২টা ২০ মিনিটে এবং বাংলাদেশ সময় ৩টা ২০ মিনিটে বিমানটি ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে গিয়ে রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে পাশের ফুটবল খেলার মাঠে। এ সময় বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। বিমানটিতে চারজন ক্রু ও ৬৭ যাত্রীসহ মোট ৭১ জন আরোহী ছিলেন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৯ মার্চ ২০১৮ প্রকাশিত)