শুক্রবার, ১৭-আগস্ট ২০১৮, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতি: শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্তের দাবি

প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতি: শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্তের দাবি

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০৬:৪৮ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: বন্ধ হয়নি প্রশ্নপত্র ফাঁস। পিএসসি প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি নিয়ে সারাদেশে লংকাকা- বয়ে যায়। এরপর ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরুর দিন থেকেও প্রতিদিনই প্রশ্নফাঁস হচ্ছে। পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই।  প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পেলে পরীক্ষা বাতিলের চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। কিন্তু ১ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নফাঁস হয়। মন্ত্রীও সেই প্রশ্ন দেখেছেন দাবি করে বলেন ‘এটা ভুয়া’। কিন্তু পরীক্ষা শেষে দেখা গেলো ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্ন হুবহু মিলে গেছে। ৩ ও ৫ ফেব্রুয়ারিসহ এপর্যন্ত সবকটি পরীক্ষারই প্রশ্নফাঁস হয়েছে। সর্বশেষ গত ১০ ফেব্রুয়ারি গণিত পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়েছে পরীক্ষা শুরুর দেড় ঘণ্টা আগে। এভাবে ধারাবাহিক প্রশ্নফাঁস ও ‘সহনীয় ঘুষ’ খেতে মন্ত্রীর পরামর্শ, মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তার ঘুষ কেলেঙ্কারি, মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী পতœীর সখ্যতা- মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের দুর্নীতিরই প্রমাণ মিলে। দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁস বন্ধে ব্যর্থতার এ দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর দ্রুত পদত্যাগ দাবি করেছেন অনেকে। অন্যথায় তাকে অপসারণের দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এদিকে ৪ ফেব্রুয়ারি প্রশ্নফাঁস নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। সেই সাথে মন্ত্রী জানান, কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে পরীক্ষা বাতিল হবে কিনা সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রশ্নফাঁসের জন্য সরকার বিরোধী শক্তিকে দায়ী করা হয়। ঘোষণা দেয়া হয় প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কারের। অর্থাৎ এসসসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস যে হয়েছে, সেটি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। এছাড়া, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে সারা দেশের সব কোচিং সেন্টার বন্ধ, পরীক্ষার আধা ঘণ্টা আগে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধ্য করা, নিজ স্কুলের পরীক্ষার্থীদের অন্য স্কুলে পরীক্ষাগ্রহণ করা, একই প্রশ্নে সারা দেশে এসএসসি পরীক্ষা নেয়াসহ নানা কর্মযজ্ঞ আর হম্বিতম্বি চালিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। অপরদিকে,  মন্ত্রণালয়ের নয়া প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলীও প্রশ্নফাঁস বন্ধকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। কিন্তু নাহিদের সঙ্গে এবার কেরামতও ব্যর্থ হয়েছেন প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে। এমন মন্তব্য এমপি, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের।
তারা বলছেন, এবার এসএসসির প্রশ্নফাঁস ‘সহনীয়’ মাত্রাও ছাড়িয়েছে। ফেসুবকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘প্রশ্নফাঁসের হাট’ বসেছে যেন। পণ্যের মতো আগাম বিজ্ঞাপন দিয়ে ওপেন বেচাকেনা হচ্ছে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। অথচ কাউকেই ধরতে পারছে না সরকার। সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিগ্রহণের কথা বলে আসছে। অথচ প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষব্যবস্থার ধ্বংস ঠেকাতে সরকার তথা শিক্ষামন্ত্রীর এ ব্যর্থতায় চরম সঙ্কট তৈরি করেছে। পরীক্ষা দেয়ার পর বাতিল হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে লাখ লাখ কোমলমতি শিক্ষার্থী। আবার বাতিল না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে অনেক শিক্ষার্থী। কারণ, ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সবাই না পেলেও পরীক্ষা বাতিল হলে একই পরীক্ষা দ্বিতীয়বার দিতে হবে তাদের। এটা শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করবে। অপরদিকে বাতিল না হলে মেধার সঠিক মূল্যায়ন হবে না। এ নিয়ে অভিভাবকরাও চরম অস্বস্তিতে আছেন। ক্ষোভের সঙ্গে অনেকে বলেছেন, পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হওয়া মানেই শিক্ষার্থীসহ গোটা জাতিকেই অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়া। এটা জাতির জন্য মহাসঙ্কট।
বিশিষ্টজনরা বলছেন, এটা পৃথিবীর অন্যকোনো দেশে হলে মন্ত্রীরা পদত্যাগ করতেন। কারণ, প্রশ্নফাঁস বন্ধে দুই মন্ত্রীই চ্যালেঞ্জগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ফাঁসকারীরা প্রশ্নফাঁস করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে ব্যর্থ প্রমাণ করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, প্রশ্নফাঁসকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোবাইল নম্বরও দিয়ে দিচ্ছেন। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর সে সব গ্রুপ বন্ধ করতে না পারা, বায়োমেট্রিক মোবাইল নম্বর দেয়ার পরও তাদেরকে সনাক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া বা অপরাধীদের একজনও গ্রেফতার না হওয়ার দায়ভার মন্ত্রীর কাঁেধই বর্তায় নিঃসন্দেহে। শুধু মন্ত্রীর ব্যর্থতার বিষয়ই নয়, এটা সরকারের উন্নয়ন ও অন্যান্য সফলাকেও ম্লান করে দিচ্ছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। ফলে সরকারকেই ইমেজ সঙ্কটে ফেলেছে শিক্ষামন্ত্রীর এ ব্যর্থতা ও দুর্নীতি। পরীক্ষার্থীসহ হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মানববন্ধন করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। এর পরও মন্ত্রীর পদ ধরে রাখাকে অনৈতিক বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে। তারা বলছেন, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলীর উচিৎ হবে তার চরিত্রে কালিমা লেপনের আগেই দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়া। অন্যথায় তিনিও বিতর্কিত হবেন। প্রশ্নফাঁসের দায়ভার বর্তাবে তার কাঁধেও।
বিরতিহীন প্রশ্নফাঁস!
প্রতিবছরের ন্যায় চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায়ও বিরতিহীনভাবে প্রশ্নফাঁস হচ্ছে। বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয়পত্রের পর ইংরেজি প্রথম এবং দ্বিতীয় পত্রেরও প্রশ্নফাঁস হয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা শুরুর প্রায় দুই ঘণ্টা আগে সকাল ৮টা ৪ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপে ইংরেজি প্রথমপত্রের প্রশ্নফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া ইংরেজি প্রথমপত্রের ‘ক’ সেটের প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্ন হুবহু মিলে গেছে। প্রশ্নপত্রটি হোয়াটসঅ্যাপের ‘ঊহমষরংয ১ংঃ ঢ়ধৎঃ ২০১৮’ নামে একটি গ্রুপ থেকে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষার মতো এদিনও সকাল ১০টায় ইংরেজি প্রথমপত্র পরীক্ষা শুরু হয়ে শেষ হয় দুপুর ১টায়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ইংরেজি প্রথমপত্র প্রশ্নও ফাঁস হওয়ার বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়সহ আমরা তদারকি করছি। এর আগে গত ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা প্রথমপত্র দিয়ে ২০১৮ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়। সেই দিন এসএসসির ‘খ’ সেট প্রশ্নফাঁস হয়। পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা আগে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) ফাঁস হয়ে যায়। এর পর ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে পরীক্ষা শুরুর প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে বাংলা দ্বিতীয়পত্রের প্রশ্নপত্র পাওয়া যায় ফেসবুকে। সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরুর আগে সোয়া ৯টার মধ্যেই উত্তরসহ ‘খ’ সেট বহুনির্বাচনী প্রশ্ন ফেসবুক গ্রুপে ফাঁস করা হলে তা ভাইরাল হয়। এছাড়া ফেসবুক মেসেঞ্জারে সকাল ৯টা ১৬ তে ‘হিমুর ছায়া’ নামের একটি আইডি থেকেও উত্তরসহ ‘খ’ সেটের প্রশ্ন ইমেজ আকারে অনেকের কাছে পাঠানো হয়। পরীক্ষা শেষে দেখা যায়, বহুনির্বাচনী প্রশ্নের সঙ্গে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের হুবহু মিল রয়েছে। এর আগে, বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই ১০০ ভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে দ্বিতীয়পত্রের প্রশ্নফাঁস করার বিজ্ঞাপন দেয়া হয় ফেসবুকের বেশ ক’টি গ্রুপে।
সূত্র বলছে, প্রশ্নফাঁস রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো ব্যবস্থা বা শিক্ষামন্ত্রীর হুঁশিয়ারি- কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা থেকে ২৫ মিনিট আগে ফেসবুকের একাধিক আইডি ও মেসেঞ্জার গ্রুপে উত্তরসহ এমসিকিউ প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়। ৩ ঘণ্টা পর পরীক্ষা শেষে প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ফেসবুকে পাওয়া প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায়। এর আগের দিন মধ্যরাতে প্রশ্ন ফাঁসের আগাম ঘোষণা দেয়া হয়। এদিকে প্রশ্নফাঁস ভয়ঙ্কর রূপ নেয়ায় দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট নাগরিকরা বলছেন, সরকারের এত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকতে প্রশ্নফাঁসকারীদের চিহ্নিত এবং ফাঁসের উৎস বের করতে না পারা হতাশাজনক। দিনের পর দিন প্রশ্নফাঁসের কারণে পাবলিক পরীক্ষার উপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে গেছে। এভাবে কোনো দেশের শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না। সরকারকে এবার কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় তালগোল পাকানো, দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্রের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার দায়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগ করা উচিত। তিনি পদত্যাগ না করলে তাকে বরখাস্ত করা উচিত বলেও মত দিয়েছেন কেউ কেউ। শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্তের দাবি উঠেছে খোদ জাতীয় সংসদেই।
২৫ টিভি ক্যামেরাসহ পরীক্ষার হলে শিক্ষামন্ত্রী
প্রথম দিন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিট পরেই রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল কেন্দ্র পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তার সঙ্গে হলে প্রবেশ করেন প্রায় ২৫ জন টিভি ক্যামেরাপারসনসহ বেশ কয়েকজন ফটো সাংবাদিক। অথচ পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় টিভি ক্যামেরা নিয়ে পরীক্ষার হলে না ঢোকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। শেষ পর্যন্ত নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতিও রাখলেন না মন্ত্রী। ১ ফেব্রুয়ারি এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিট পরেই এ কা- করেন শিক্ষামন্ত্রী। এ সময় শিক্ষার্থীরা প্রশ্নের উত্তর লেখা বাদ দিয়ে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীকে সালাম দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এসএসসি পরীক্ষার হল পরিদর্শনই নয়, হলে ঢুকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথাও বলেন শিক্ষামন্ত্রী। পরীক্ষা কেন্দ্রের এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যান মন্ত্রী। নিস্তব্ধ পরীক্ষা কেন্দ্র তখন সরব হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা কর্মী, সংবাদকর্মীসহ মন্ত্রীর সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদচারণায় শিক্ষার্থীদের তখন নাভিশ্বাস অবস্থা। পরীক্ষা শুরুর পর এভাবে প্রায় ১৫ মিনিট কেন্দ্রে অবস্থান করেন শিক্ষামন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘হলে প্রবেশ করেছি প্রশ্ন কেমন হয়েছে জানতে ও পরীক্ষার্থীদের বক্তব্য শুনতে।’
আধ ঘণ্টা আগে আসা নিয়ে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার দিন শিক্ষার্থীদের আধ ঘণ্টা আগেই কেন্দ্রে এসে আসনে বসার নিয়ম নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিভাবকরা। অভিভাবকদের দাবি, এটা কোনো নিয়ম হতে পারে না। এর ফলে ভোগান্তিই শুধু বেড়েছে। অনেক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘৩০ মিনিট আগে বাচ্চাদের কেন্দ্রে প্রবেশ বাধ্যতামূলক করা ঠিক হয়নি। কারণ ঢাকায় প্রচুর যানজট হয় পরীক্ষার আগে। কেন্দ্রে পৌঁছাতে তো সময় লাগে। সরকার প্রশ্নফাঁস রোধ করতে ব্যর্থ। এর দায় কেন নেবে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা?’ প্রসঙ্গত, এবার সারা দেশে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দিচ্ছে ২০ লাখ ৩১ হাজার ৮৯৯ জন। এসএসসি পরীক্ষা হচ্ছে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে। মোট ৩ হাজার ৪১২টি কেন্দ্রে পরীক্ষা হচ্ছে। লিখিত পরীক্ষা ২৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আর ব্যবহারিক পরীক্ষা ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ৪ মার্চ শেষ হবে।
ভুল প্রশ্নপত্রে এসএসসি পরীক্ষা
এদিকে কুড়িগ্রামের উলিপুরে ও গোপালগঞ্জে ভুল প্রশ্নপত্রে বাংলা প্রথমপত্র ও দ্বিতীয়পত্রের এসএসসি পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উলিপুর উপজেলা সদরের মহারানী স্বর্ণময়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে বাংলা প্রথমপত্র ভুল প্রশ্নে গ্রহণ করার ঘটনা সম্পর্কে ৩ ফেব্রুয়ারি ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অবগত করানোর জন্য কেন্দ্র সচিবকে চিঠি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এই কেন্দ্রের তিনটি কক্ষে শতাধিক শিক্ষার্থীর ফলাফল বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সূত্র জানায়, চলতি এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় উলিপুর মহারানী স্বর্ণময়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের ১২নং কক্ষে ২০১৬ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্র দিয়ে জোরপূর্বক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়া হয়। অথচ পরীক্ষার্থীরা ২০১৭ সালের সিলেবাস অনুযায়ী পরীক্ষা দেয়ার কথা। একই ঘটনা ঘটেছে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে। ২০১৬ সালের সিলেবাসের প্রশ্নপত্রে এসএসসি বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা দিয়েছে ৯৯ শিক্ষার্থী। ৩ ফেব্রুয়ারি উপজেলার রামদিয়া শ্রীকৃষ্ণ শশি কমল বিদ্যাপীঠ কেন্দ্রে এটি হয়। জানা গেছে, এদিন এসএসসি বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষায় উপজেলার ওই কেন্দ্রের দু’টি কক্ষে ভুলক্রমে পরীক্ষার্থীদের ২০১৬ সালের পুরনো সিলেবাসের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়। পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে পরীক্ষার্থীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে দায়িত্বরত শিক্ষককে জানায়। পরে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সত্যতা পান শিক্ষকরা। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষায় এই কেন্দ্রে ইনডেক্সবিহীন প্রভাষকদের মাধ্যমে পরীক্ষা পরিচালনা করার সময় ওএমআর সিটসহ বোর্ডে খাতা পাঠালে বোর্ড কর্তৃপক্ষ তলব করে। পরে কেন্দ্র সচিবসহ অভিযুক্ত শিক্ষকরা ক্ষমা চেয়ে পার পেয়ে যান।
পুরস্কার ঘোষণার পরও
এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়া প্রশ্নফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিতে পারলে কিংবা প্রশ্নফাঁসকারীর তথ্য দিলে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক শেষে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে, পরীক্ষা চলার সময় পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট কারো কাছে স্মার্টফোন পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া। তবে এ বৈঠকের পরেও প্রশ্নফাঁস অব্যাহত রয়েছে।  
বিশিষ্টজনদের দাবি
প্রশ্নফাঁস ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। সরকারের এত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকতে প্রশ্ন ফাঁসকারীদের চিহ্নিত ও ফাঁসের উৎস বের করতে না পারা হতাশাজনক। দিনের পর দিন প্রশ্নফাঁসের কারণে পাবলিক পরীক্ষার ওপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে গেছে। এভাবে কোনো দেশের শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না বলে মনে করেন দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলছেন, সরকারকে এবার কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় তালগোল পাকানো, দুর্নীতি রোধ ও প্রশ্নপত্রের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতার দায়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। তিনি পদত্যাগ না করলে সরকারের উচিত তাকে বরখাস্ত করা। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় সব বিষয়ের প্রশ্নপত্রই ফাঁস হয়েছে। এ নিয়ে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা এ পরামর্শ দিয়েছেন। তারা অপরাধীদের যেকোনো মূল্যে ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার সুপারিশও করেছেন। তারা বলেন, প্রশ্নফাঁস ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু এর শাস্তি পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশের বাধ্যবাধকতা ঠিক নয়। এই নিয়ম নিবর্তনমূলক। প্রশ্নফাঁসের উৎস খুঁজে বের করতে সরকারের সব সেক্টরের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠনেরও পরামর্শ দেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। প্রশ্নফাঁস রোধে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ক্লাসরুমে লেখাপড়া ফিরিয়ে আনা ও আইন করে কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দেয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীর সফলতা আছে। কিন্তু যারা প্রশ্নফাঁস করছে, তারা কী এতই দুর্র্ধর্ষ? যদি অন্য ক্ষেত্রে সরকার সফল হয়, তাহলে এক্ষেত্রে কেন ব্যর্থ হবে? প্রশ্নপত্র নিয়ে মনে হচ্ছে খেলাধুলা হচ্ছে। এখানে বিশাল বাণিজ্য জড়িত। নিশ্চয়ই পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরে কোনো সমস্যা আছে।’ অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। শিক্ষাখাতও সেই গ্রাসের ভেতরে। (শিক্ষা মন্ত্রীকে ইঙ্গিত করে) কারও কারও ঘরের ভেতরে দুর্নীতির প্রশ্রয়দাতার নামও উঠে আসছে। এসব লক্ষণ ভালো নয়। প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, এখন শিক্ষার চেয়ে পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। শিক্ষা যে গুরুত্বপূর্ণ খাত, তাও যেন ভুলে গেছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। শিক্ষা যেন ছেলেখেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ওনার স্বীকার করতে হবে যে, তিনি (শিক্ষামন্ত্রী) প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা খাতে দুর্নীতি বন্ধে ব্যর্থ হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক কথাসাহিত্যিক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, প্রশ্নফাঁস রোধ করা ও ফাঁসকারীদের ধরার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকারের। তাদের কেন ধরছে না? আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা কী এতই দুর্বল! যদি ধরতে না-ই পারে, তাহলে তাদের (গোয়েন্দা সংস্থা) রেখে লাভ কী? ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে যারা প্রশ্নফাঁস করছে তাদের ধরা কোনো ব্যাপারই নয়। যেকোনো হ্যাকারকে দায়িত্ব দিলেও অল্প সময়ে তারা ধরে দিতে পারবে। তাহলে এ ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কেন পারছে না?’ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এবারের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়েছে। এর আগেও হয়েছে। যে দায়িত্বটা (প্রশ্নফাঁস রোধ) মন্ত্রণালয়ের বা শিক্ষামন্ত্রীর, তা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে পরীক্ষার্থীর ওপর। তাদের সাড়ে ৯টার মধ্যে পরীক্ষার হলে ঢুকতে বলা হয়েছে। এটা একটা অমানবিক সিদ্ধাস্তা। পরীক্ষা শুরুর ১০ মিনিট পরও ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার হলে ঢোকার অধিকার আছে। কেননা যানজটসহ নানা বাস্তবতা আছে। বরং যে পরে ঢুকবে সে কম লিখবে। মন্ত্রণালয়ের এই নিয়মটাকে আমি নিবর্তনমূলক বলে মনে করি।’ মনজুরুল ইসলাম আরও বলেন, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্সের কথা বলে। কিন্তু যেখানে শিক্ষার্থী ও জাতির ভবিষ্যৎ নিহিত, সেখানে তার প্রতিফলন দেখছি না। বরং দিনের পর দিন প্রশ্নফাঁসের ঘটনা অস্বীকার হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁসে বাইরের লোক জড়িত নয়। এর দায় শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের ওপর চাপানো যাবে না। প্রশ্নফাঁস অবশ্যই রোধ করতে হবে। এজন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে দোষীদের বের করতে হবে। সব সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করে দোষীদের ধরতে হবে। কেননা জঙ্গিবাদের মতোই এটা বড় একটা অপরাধ। অপরাধীদের শাস্তি দিতেই হবে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, তিনি কী করবেন সেটা তার ব্যাপার। তবে প্রশ্নফাঁসের দায় শিক্ষামন্ত্রীকেই নিতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এমনই হতাশ যে এর (প্রশ্নফাঁস) প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানোর মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। এটা বন্ধ করার দায়িত্ব সরকারের। প্রযুক্তিবিদের সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ও দৃঢ় পদক্ষেপে এটা বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু তারা অপরাধীকে ধরছে না কেন? তক্কে তক্কে থাকা অপরাধীরা সুযোগ পায় কীভাবে?’ তিনি বলেন, ‘কঠিন সত্য হচ্ছে, প্রশ্নফাঁস হয়। সেটা ৩০ মিনিট আগেই হোক, আর এক ঘণ্টা আগে হোক। আর এ কারণে পরীক্ষার প্রতি অভিভাবকদের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। অনেককেই বলতে শুনেছি, পরীক্ষা দিয়ে লাভ কী?’ তার মতে, ‘প্রশ্নফাঁসের জন্য শিক্ষক-অভিভাবককে দোষারোপ করা হচ্ছে। অভিভাবককে বলা হচ্ছে আপনারা প্রশ্নের পেছনে ছুটবেন না। এমন সস্তা কথা বলাই যায়। কিন্তু যেখানে প্রশ্নফাঁস হচ্ছে, সেখানে অভিভাবকের প্রশ্নের পেছনে ছোটাই স্বাভাবিক। সরকারকে এমন কথা না বলে দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে হবে।’ রাশেদা কে চৌধুরী আরো বলেন, সাময়িক সময়ের জন্য হলেও কোচিং বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমি মনে করি আইন করে কোচিং স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া উচিত।
অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। এটা এখন প্রমাণিত। প্রশ্নপত্র যে হারে ফাঁস হচ্ছে তার প্রথম প্রতিকার হচ্ছে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। কোনো সভ্য দেশে পাবলিক পরীক্ষার একটা প্রশ্ন ফাঁস হলেই শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতেন। কিন্তু আত্মসম্মানবোধ, দায়িত্ববোধ এবং ন্যূনতম আত্মমর্যাদাবোধ থাকলে তার (শিক্ষামন্ত্রী) বহু আগেই পদত্যাগ করা উচিত ছিল। তিনি যদি পদত্যাগ না করেন তাহলে সরকারের উচিত তাকে অপসারণ করা। কেননা প্রশ্নফাঁসের বহুবিধ ঘটনার কারণে পাবলিক পরীক্ষার ওপর থেকে জনগণের আস্থা চলে গেছে। এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে তাকে বরখাস্ত করা উচিত। আসিফ নজরুল বলেন, ‘পদত্যাগ বা বরখাস্ত আরেকটি কারণে করতে হবে। সেটি হচ্ছে- তিনি ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে শুধু ব্যর্থই হননি। বরং তার কাছের লোক, তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি নিজে মন্ত্রণালয়ের এক অনুষ্ঠানে কর্মকর্তাদের সহনীয় মাত্রায় ঘুষ খেতে বলেছেন।’ প্রশ্নফাঁসের উৎস বের করতে এই শিক্ষাবিদ একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের তাগিদ দিয়ে বলেন, নিবিড়ভাবে ঘটনা পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধান করতে হবে। এজন্য ওই কমিটিতে সরকারের সব সেক্টরের লোক রাখতে হবে। তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁসের কারণে পরীক্ষা বাতিল করা শুরু করলেও একটা জটিলতা আছে।
শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণ দাবি সংসদে
প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধ করতে না পারা ও সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ নিতে ‘উৎসাহিত’ করার অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের অপসারণের দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে এ দাবি জানান। তার এই দাবির পর সংসদের বৈঠকে সভাপতির দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, ‘নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী এই দাবি শুনেছেন, তিনি তার বিবেচনায় যেটুকু করা প্রয়োজন, জাতির স্বার্থে অবশ্যই তা করবেন।’
সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যক্রম শেষে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, ‘প্রতিদিন পত্রিকায় দেখি, প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর। প্রশ্নপত্র ফাঁস মহামারী আকারে বিস্তার লাভ করছে। এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে রোববার (৪ ফেব্রুয়ারি) বলা হয়েছিল, প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিলে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। এরপর আজকেই (৫ ফেব্রুয়ারি) ‘তুষার শুভ্র’ নামের একটি ফেসবুক আইডিতে বলা হয়েছে, তাদের কাছে প্রশ্নপত্র রয়েছে। এটা নিতে হলে এত টাকা দিতে হবে। বিষয়টি পত্রিকায়ও এসেছে। তাহলে এটা কেন হচ্ছে?’ জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে। অনেক অর্জনও হয়েছে। কিন্তু আগামী প্রজন্মকে আমরা সত্যিকার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পেরে কেবল সনদ দেয়ার জন্য শিক্ষিত করি, তা হবে অর্থহীন। আমরা আগামী প্রজন্মকে দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চাই। নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাখ-লাখ শিক্ষার্থী বেরিয়ে আসছে, চাকরি পাচ্ছে না। এসব চাকরি-প্রার্থীরা বাংলা ও ইংরেজিতে চাকরির দরখাস্তও লিখতে পারে না। গোল্ডেন জিপিএ-প্রাপ্তরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। তারা বাংলা লিখতে পারে না, ইংরেজিও না। এই যদি পরিস্থিতি হয়, তাহলে আমরা কার কাছে দেশটি রেখে যাবো?’ সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়া উদ্দিন বাবলু সংসদে আরো বলেন, “শিক্ষামন্ত্রী কয়েকদিন আগে কর্মকর্তাদের বৈঠকে বলেছেন, ‘আপনারা ঘুষ খান, তবে সহনীয় মাত্রায় খাবেন। আমিও ঘুষ খাই, অনেক মন্ত্রী ঘুষ খায়।’ এটা বলার পরে উনি আর মন্ত্রী থাকতে পারেন? তিনি তো ঘুষকে উৎসাহিত করছেন। এই কথা যখন ছাত্ররা শুনবেন, মন্ত্রী ঘুষ খাওয়ার কথা বলছেন, তখন? যখন মন্ত্রী ঘুষের কথা বলেন, তখন তার কথা তো আর কেউ শুনবেন না। তার সচিব শুনবেন না, কেউ শুনবে না। তাহলে কী করে কঠোরভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করবেন, তা বোধগম্য নয়। তার একথা বলার পর ওই দিনই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত ছিল।” বিরোধী দলীয় এই এমপি বলেন, ‘আমি দাবি করছি, অবিলম্বে শিক্ষামন্ত্রী তার ব্যর্থতা, দুর্নীতি, অনিয়মের দায় স্বীকার করে নিয়ে পদত্যাগ করুন। না হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করছি, তাকে বরখাস্ত করে শিক্ষাখাতের উন্নতির জন্য গুণগতমান বৃদ্ধি করে আপনি নতুন মন্ত্রী নিয়োগ করুন। আমি আশা করবো, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।’
শিক্ষামন্ত্রী চোখ থাকিতেও অন্ধ!
প্রশ্নফাঁসের ধারাবাহিকতায় চলমান এসএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথমপত্র প্রশ্নফাঁস হওয়ার পর এ নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র এবং শিক্ষামন্ত্রীর জামাতা ডা. ইমরান এইচ সরকার। ফেসবুকে তার শ্বশুর শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, মন্ত্রীর স্ত্রী-কন্যাসহ তাকেও তুলোধুনো করেছেন অনেকে। তোপের মুখে তিনি জানিয়েছেন, (প্রশ্নফাঁস) নিয়ে তার পরামর্শ শোনার সময় তার শ্বশুরের (শিক্ষামন্ত্রী) নেই। এ নিয়ে (আলোচনা করার) অনেক চেষ্টা করে তার মনে হয়েছে সময় অপচয় হওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া ওই পোস্টে একজনের মন্তব্যের জবাবে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে ইমরান সরকার লিখেছেন, ‘আমার পরামর্শ শোনার উনার সময় কোথায়? উনিতো ব্যস্ত।’
গত ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথমপত্রের প্রশ্নফাঁস হয় বলে প্রমাণসহ সংবাদ প্রকাশ করে কয়েকটি গণমাধ্যম। এরপর ২ ফেব্রুয়ারি ইমরান এইচ সরকার তার নিজের ফেসবুক পেইজে দেয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘প্রশ্নফাঁসের মূলহোতা কে? সেটা খুঁজে বের করা সরকারেরই দায়িত্ব। কিন্তু আমরা আর চাই না আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যাক। আমাদের বাঁচান, আগামীর প্রজন্মকে বাঁচান।’ ওই পোস্টে হাজারও ফেসবুক ব্যবহারকারী কমেন্টে শ্বশুর-জামাতার মুখোশ উন্মোচন করে তাদের মতামত তুলে ধরেন। এমডি রাজু নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘এই দায়িত্ব নিয়ে আপনার শ্বশুর বসে আছে, আপনি উনারে কিছু পরামর্শ দিন।’ উত্তরে ইমরান লেখেন, ‘আমার পরামর্শ শোনার উনার সময় কোথায়? উনি তো ব্যস্ত।’ নোমান মোড়ল নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘এ ব্যাপারে (ফেসবুকে) স্ট্যাটাস না দিয়ে আপনার শ্বশুরের (শিক্ষামন্ত্রী) সঙ্গে আলোচনা করুন। জাতি উপকৃত হবে।’ জবাবে ইমরান বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেছি। সময়ের অপচয় ছাড়া কিছু না।’ মনজুর স্বপন নামের আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘আপনার শ্বশুর আর শাশুড়ি এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। আমাদের ভাবি সাহেবানও (শিক্ষামন্ত্রীর মেয়ে এবং ইমরান এইচ সরাকারের স্ত্রী) জেনে থাকতে পারে মূল হোতা কে বা কারা!’ উত্তরে ডা. ইমরান এইচ সরকার লেখেন, ‘সেটা তাদের বলাই ভালো। আমি ভাই নিরীহ মানুষ!’ আসাদুজ্জামান নূর নামে এক ব্যক্তি ইমরান এইচ সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘আগামী শুক্রবার শাহবাগে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের জন্য মঞ্চ গড়ে তুলুন। তাহলে বুঝবো আপনি সত্যিই দেশপ্রেমিক। জানি পারবেন না। তাহলে এখানে হুদাই লিখে হিরো সাজতে যাইয়েন না।’ এমন মন্তব্যের অবশ্য কোনো উত্তর দেননি ইমরান এইচ সরকার। সারওয়ার জাহান নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘আপনি অনেক কিছু নিয়ে প্রতিনিয়ত লিখলেও প্রশ্নফাঁস নিয়ে লেখেন না। যাক আজ লেখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। প্রশ্নফাঁস নিয়ে যত নাটক হচ্ছে সব নাটকের নায়ক কিন্তু আপনার শ্বশুর মশাই। আমরা যত লেখালেখিই করি তিনি বুঝেনও না শুনেনও না। তিনি চোখ থাকিতেও অন্ধ। আপনি তাকে একান্তে বুঝান যে, তার এখন উপযুক্ত সময় এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয়ার। তিনি শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি করায় যে পুরস্কার পেয়েছেন তা নিয়ে তাকে শান্তিতে ঘুমাতে বলেন এবং দেশকে মুক্তি দেন।’ এভাবেই হাজারও মন্তব্যের বেশিরভাগেই শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও তার মেয়ে জামাতা ডা. ইমরান এইচ সরকারসহ ওই পরিবারকে তুলোধুনো করে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।
অপরদিকে, ‘প্রশ্নফাঁসই যদি হয় নিয়তি, দুর্নীতিবাজ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নয় কেন’? ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস কেন? শিক্ষামন্ত্রী জবাব চাই’। লিখিত এমন প্ল্যাকার্ড নিয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা। ৩ ফেব্রুয়ারি ‘সচেতন অভিভাবক ও ভুক্তভোগী ছাত্রছাত্রীবৃন্দ’ ব্যানারে ওই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মানববন্ধন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ প্রকাশিত)