শুক্রবার, ১৭-আগস্ট ২০১৮, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

এসকে সিনহা থেকে ওয়াহহাব মিঞা

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০৬:৩৯ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা আওয়ামী লীগের অত্যন্ত পরীক্ষিত লোক ছিলেন। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারক থাকাকালে যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের ‘চোখের ভাষা’ বুঝেই রায় দিতেন তিনি। সেই সুবাদেই তাকে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছিল বলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মধ্যে প্রচারিত আছে। কিন্তু প্রধান বিচারপতির মহান এ দায়িত্ব পেয়ে কিছু ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেন এসকে সিনহা। বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অনড় ছিলেন তিনি। ষোড়শ সংশোধনী আইন বাতিলের রায় ও রায়ের পর্যবেক্ষণের কিছু মন্তব্য আওয়ামী লীগের বিপক্ষে যায়। এতে বিপদে পড়তে হয় প্রধান বিচারপতি সিনহাকে। নানা নাটকীয়তার পর শেষ পর্যন্ত পদত্যাগে বাধ্য হন দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা।
সূত্র বলছে, পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার ব্যবহার করে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে। অবশ্য আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাও এক সময় আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আওয়ামী লীগ আমলে ১৯৯৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনি। দুই বছর পর তার নিয়োগ স্থায়ী হয়। ২০১১ সালে আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। আগামী ১০ নভেম্বর তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। এর আগে, হাইকোর্টে আইন পেশায় থাকাকালীন আওয়ামী প্যানেল থেকে দু’বার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন ওয়াহ্হাব মিয়া। হাইকোর্টের বিচারপতি থাকাকালীন দলের আনুগত্য দেখিয়েছেন বলেও শোনা যায়। তবে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হওয়ার পর দলীয় খোলস মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। কিছু রায়ের ক্ষেত্রে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের চাওয়ার বিপক্ষে ছিলেন ওয়াহ্হাব মিঞা। আবার এসকে সিনহা বিপদে পড়লে আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা সরকারের পক্ষ নিয়ে প্রধান বিচারপতি হতে উঠে পড়ে লাগেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে। ভারপ্রাপ্ত হয়ে সরকারের বেশ কিছু ইচ্ছা পুরণও করেন তিনি। কিন্তু পূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে আবারও যে বেঁকে বসবেন না- সেই আস্থা নেই সরকারের। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আপিলের রায় ও ১৫৩ জন বিনা ভোটের এমপি নিয়ে আপিলের রায়ে ওয়াহ্হাব মিঞা- তার আগের অবস্থানে ফিরে গেলে সরকারকেই বেকায়দায় পড়তে হবে। সে ভয় থেকেই সরকার আস্থা রাখতে পারেনি এই জ্যেষ্ঠ বিচারপতির ওপর। তাই প্রধান বিচারপতি হওয়ার ইচ্ছে পূরণ হয়নি ওয়াহ্হাব মিঞার। তাকে ডিঙিয়ে দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর আগেও ওয়াহ্হাব মিঞাকে ডিঙিয়ে এসকে সিনহাকে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছিল। এবারও প্রধান বিচারপতি না করার ‘অপমান’ সহ্য করতে না পেরে লোকলজ্জা, অভিমান এবং ক্ষোভে শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেছেন। এমনটাই জানা গেছে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুপ্রিম কোর্টের একাধিক আইনজীবী বলেছেন, আওয়ামী লীগের লোক হলেও এসকে সিনহার মতো পদত্যাগই করতে হলো আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকেও।  
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আপিল বিভাগে আসার পর আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা বিভিন্ন মামলার রায়ে নিরপেক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন। বিশেষ করে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধাপরাধের মামলার রায়গুলোতে তিনি সাহসী ভূমিকা রাখেন। কয়েকটি রায়ে আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা অন্য বিচারপতিদের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। এমনকি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে তিনি খালাসও দিয়েছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল সম্পর্কিত বিতর্কিত রায়েও দ্বিমত পোষণ করেছিলেন বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা। ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের সেই রায়ে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির মধ্যে তিনজন একমত পোষণ করেন। একমত হওয়া তিনজন হলেন- তৎকালীন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি এসকে সিনহা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। অন্যদিকে রায়ে দ্বিমত পোষণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে থাকা তিনজন বিচারপতিই পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি হলেও এসকে সিনহাকে প্রধান বিচারপতি করা হয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে ডিঙিয়ে। নানা ঘটনা ও সরকারের চাপে পড়ে এসকে সিনহা পদত্যাগ করলে আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞার প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কিন্তু ফের জ্যেষ্ঠতা ডিঙিয়ে জুনিয়র বিচারপতি মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি করা হলো। অথচ দেখা গেছে, ওয়াহ্হাব মিঞা ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরই সরকারকে খুশী করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। প্রথম দিনই তিনি রাশিয়ার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার খুব প্রশংসা করেন। নিম্ন আদালতের বিচারকদের আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশ নিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার সঙ্গে সরকারের প্রচ- দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। একাধিকবার সময় দেয়ার পরও সরকার গেজেট প্রকাশ করেনি। মাঝে একবার একটি খসড়া তৈরি করলেও সেটা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণের আলোকে হয়নি। সরকার নিজেদের মতো করে একটি খসড়া তৈরি করে সেটি সুপ্রিম কোর্টে জমা দেয়। পরে সুপ্রিম কোর্ট এটাকে ফেরত পাঠায়। আইন মন্ত্রণালয়কে আপিল বিভাগের সঙ্গে বসতে বললেও আইন মন্ত্রণালয় সেটা করেনি। দেখা গেছে, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিদায়ের পর এক সপ্তাহের মধ্যেই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞার বাসভবনে গিয়ে গোপন মিটিং করে নিম্ন আদালতের বিচারকদের আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধির গেজেট চ’ড়ান্ত করেন। সরকার প্রণীত এই খসড়া মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়া সত্ত্বেও বিচারপতি আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা সেটাকে গ্রহণ করেছেন।
এ নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবীরা আপত্তি জানালেও আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা এ সবকে পাত্তাই দেননি। বিশিষ্টজনরা এতে ওয়াহ্হাব মিঞার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। এগুলোকে প্রধান বিচারপতি হওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখেছেন তারা। আইনজ্ঞ ও বিশিষ্টজনরা মনে করেন, আব্দুল ওয়াহ্হাব মিঞা প্রধান বিচারপতি হতেই ন্যায়নীতিকে বিসর্জন দিয়ে সরকারের নির্দেশনার আলোকে সব কিছু করেছেন। এক সময় তিনি ন্যায়পরায়ণ বিচারপতি হিসেবে নিজেকে দাঁড় করালেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান হয়ে তিনি প্রধান বিচারপতি পদের লোভে নীতির পথ থেকে সরে দাঁড়ান। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চেয়ে তিনি নিজের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিয়া সবচে বড় অন্যায় কাজটি করেছেন এসকে সিনহার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে। তখন পর্যন্ত এসকে সিনহা প্রধান বিচারপতি পদেই রয়েছেন। সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ রাতে ১১টা ৫৫ মিনিটের ফ্লাইটে সিনহা অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। পরদিন অর্থাৎ ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এসকে সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ সম্বলিত এক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। প্রধান বিচারপতি তো নয়ই, অন্য কোনও বিচারপতির বিরুদ্ধেও সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে এ ধরনের বিবৃতি প্রকাশ সম্পূর্ণ অন্যায়, আইন ও রীতিনীতি বহির্ভূত। যদি কোনও বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে তা অবশ্যই কাউন্সিল গঠন বা আইনানুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার কথা। কিন্তু তা না করে সুপ্রিম কোর্ট এক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থে বা রাজনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। সরকারকে এ সুযোগটি করে দিয়েছিলেন তখনকার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিয়াই। শুধুমাত্র পূর্ণ দায়িত্বে প্রধান বিচারপতি পদ পাওয়ার লোভেই যে তিনি এ কাজটি করেছিলেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
দীর্ঘ প্রায় চার মাস ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ওয়াহ্হাŸ মিঞা। কিন্তু শেষ অবধি সরকারের সুদৃষ্টি পেতে ব্যর্থ হন বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা। গত ২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এ প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। এ সংক্রান্ত প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ওয়াহ্হাব মিঞার জমাদার কামাল হোসেনসহ দু’জন বঙ্গভবনে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে একটি রিসিভ কপি নিয়ে আসেন। ওই পত্রে ‘ব্যক্তিগত কারণে’ পদত্যাগের কথা লিখেছেন বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা। এদিন দুপুর ১২টার আগেই ব্যক্তিগত সব ফাইলপত্র নিজ খাসকামরা থেকে সরিয়ে বাসায় নিয়ে যান ওয়াহ্হাব মিঞা। এর পরের কার্যদিবস অর্থাৎ ৪ ফেব্রুয়ারি, রোববার থেকে তিনি আর আপিল বিভাগে বসছেন না। জ্যেষ্ঠতমকে ডিঙ্গিয়ে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হলে আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা পদত্যাগ করবেন- এমন গুঞ্জন বেশ আগে থেকেই সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছিল। বাস্তবেও সেটিই ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ যেভাবে
গত ২ জানুয়ারি শুক্রবার বেলা সোয়া ২টায় রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির নিয়োগসংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেন। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের কিছুক্ষণ পরই আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংবিধানের ৯৫(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেছেন। শপথ গ্রহণের দিন থেকে তার নিয়োগ কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। পরের দিন ৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে দেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাকে রাষ্ট্রপতি শপথবাক্য পাঠ করান। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি রাতে গণভবনে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তারা রাতেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বসে প্রধান বিচারপতি হিসেবে সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে নির্ধারণ করেন বলে জানা গেছে।
এক নজরে সৈয়দ মাহমুদ হোসেন
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০০১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি নিযুক্ত হন সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। অবশ্য ২০০৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ৪ দলীয় জোট সরকারের সময় তার নিয়োগ স্থায়ী করা হয়। ফের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় আসলে ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি পদে উন্নীত হন তিনি। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের মেয়াদ ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি গঠিত দু’টি সার্চ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। বিচারক হিসেবে কাজ শুরুর আগে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ছিলেন। এর আগে, তিনি ১৯৮১ সালে কুমিল্লা জেলা আদালতে এবং ১৯৮৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত হন।
সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম সৈয়দ মুস্তফা আলী এবং মায়ের নাম বেগম কাওসার জাহান। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট হলেও কুমিল্লা শহরের আদালতপাড়ার টিঅ্যান্ডটি মোড়ে তার একটি পৈতৃক বাড়িও রয়েছে। তিনি বিএসসি ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়া লন্ডন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ওরিয়েন্টাল আফ্রিকান স্টাডিজ ও ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড লিগ্যাল স্টাডিজ থেকে ছয় মাসের কমনওয়েলথ ইয়াং ল’ইয়ার্স কোর্স করেন।
জ্যেষ্ঠতার ক্রমে সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের পরে রয়েছেন বিচারপতি মো: ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিচারপতি ইমান আলী অবসরে যাবেন। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী অবসরে যাবেন ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার অবসরে যাবেন ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি।
ফিরে দেখা
দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি শপথ নেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত বছর ১০ নভেম্বর ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা সিঙ্গাপুর থেকে পদত্যাগপত্র পাঠান।
যদিও সেটি তখন কার্যকর হয়নি।
এর আগে ১ আগস্ট উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নেয়া সংক্রান্ত ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশ করা হয়। এই রায়ে প্রধান বিচারপতির দেয়া বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন মন্ত্রী-এমপি, আওয়ামী লীগের নেতা ও সরকারপন্থি আইনজীবীরা। তারা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিও তোলেন। সমালোচনার মধ্যেই ১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা হঠাৎ করে এক মাসের ছুটির কথা জানিয়ে চিঠি দেন। অবশ্য, তার এই ছুটি নিয়ে শুরুতেই অনেক বিতর্ক হয়। বলা হয়, সরকার জোর করে এসকে সিনহাকে ছুটিতে পাঠিয়েছে। পরের দিন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্্হাব মিঞাকে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর আইনমন্ত্রী জানান, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ক্যানসারে আক্রান্ত। এ কারণ উল্লেখ করে তিনি ছুটির আবেদন জানিয়েছেন। পরে ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা। দেশ ছাড়ার আগে প্রধান বিচারপতি তার বাসভবনের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই। বিচার বিভাগের স্বার্থে আবার ফিরে আসব। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে একটি মহল প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছেন।’ তিনি একটি লিখিত বিবৃতিও সাংবাদিকদের দিয়ে যান। পরের দিন ১৪ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তার কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ কারণে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসতে চাননি আপিল বিভাগের বিচারপতিরা।
দেখা যায় এক মাসের ছুটি শেষ হওয়ার আগে বিচারপতি এসকে সিনহা অস্ট্রেলিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে যান। সেখানে উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে দফায় দফায় সমঝোতা বৈঠক হয়। বৈঠকে বিচারপতি এসকে সিনহা ১১ অভিযোগের বিষয়টি নিষ্পত্তি করে সম্মানজনকভাবে দেশে ফিরে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য এজলাসে বসতে চেয়েছিলেন। অবশেষে এক পর্যায়ে সরকারের তরফ থেকে দাবি করা হয়, এসকে সিনহা পদত্যাগ করেছেন। ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ওই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন। এর পর থেকেই প্রধান বিচারপতির পদটি শূন্য ছিল।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ প্রকাশিত)