শুক্রবার, ২৩-ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১০:১৮ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বোরাক রিয়েল এস্টেটের ‘ইউনিক হাইটস’ ২০তলা ভবন: জমির কাগজপত্র ভুয়া প্রমাণ হলো

বোরাক রিয়েল এস্টেটের ‘ইউনিক হাইটস’ ২০তলা ভবন: জমির কাগজপত্র ভুয়া প্রমাণ হলো

sheershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারী, ২০১৮ ০৮:৫৯ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: রাজধানীর রমনায় যে জমির উপর বোরাক রিয়েল এস্টেটের বিশাল ভবন গড়ে উঠেছে এর কাগজপত্র ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। এই জমির বর্তমান মালিক দাবিদারদের পক্ষে খতিয়ান নেই। নামজারি নেই। মালিকানার কাগজপত্র সঠিক না হওয়ায় রমনা ভূমি অফিস নামজারি ও খাজনা পরিশোধের আবেদন নাকচ করে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই জমির মালিক দাবিদাররা তাদের পক্ষে ভূমি উন্নয়ন কর অর্থাৎ খাজনা পরিশোধের অনুমতির জন্য নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে মামলা করেছিল। হাইকোর্ট বিধিসম্মতভাবে আবেদন নিষ্পিত্তির নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু, মালিক দাবিদারদের মালিকানা সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র না থাকায় খাজনা পরিশোধের আবেদন নাকচ করে দিয়েছে রমনা ভূমি অফিস।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রমনায় ভিআইপি রোড নামে পরিচিত কাজী নজরুল ইসলাম রোডে কয়েকশ’ কোটি টাকার ২৫ কাঠা খাস জমির অবৈধ দখলদার বৈধ করতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন মোঃ ইকরাম ও বোরাক রিয়েল এস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এর মাধ্যমে উন্নয়ন কর গ্রহণের আবেদন করেন তারা। তাদের করা ওই আবেদন নিষ্পত্তি করতে রমনা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে পাঠানো হয়। কিন্তু জমির প্রকৃত মালিকানা ইকরামের নয় বরং তাদের প্রদর্শিত কাগজপত্র ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় ভূমি অফিস ইকরামের কাছ থেকে কর গ্রহণ না করে তাদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। এতে, ওই সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা ইকরামের নয় বরং সরকারের খাস জমি বলেই প্রমাণিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত রমনা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপ্তিময়ী জামানের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরের কাকরাইল মৌজার সিটি ১৬০২ নং দাগের ০.৪১৩০ একর ভূমির উন্নয়ন কর গ্রহণের জন্য প্রার্থনা করা হয়। প্রার্থীদের আবেদনের ভূমি সরকারি খাসমহাল তৌজিভূক্ত ও লিজকৃত। ওই ভূমি বিগত ২২/০৫/১৯৫৬ তারিখে ৫৯১৬ নং লিজ দলিল মূলে জনৈক  ডা. আবদুল বাসেতের অনুকূলে ৩০ বছর মেয়াদী লিজ প্রদান করা হয়। লিজের মেয়াদ ০১/০৪/১৯৫৬ তারিখে শুরু হয়ে ৩১/০৩/১৯৮৬ তারিখে শেষ হয়। এর পর আর লিজ নবায়ন হয়নি বলে নথিপত্র পর্যালোচনায় ভূমি অফিসের কাছে প্রতীয়মাণ হয়েছে। যদিও ১০/০৫/২০১১ এর ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূঃমঃ/শা-৮/খাজব/১৩৫/২০১১/৫৮৯ নং স্মারকে জারিকৃত পরিপত্র মোতাবেক দীর্ঘ মেয়াদী (৩০ বছর) বন্দোবস্তকৃত খাসমহালভূক্ত অকৃষি খাসজমির ইজারা নবায়ন করার বিধান রয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, বর্ণিত লিজ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর নবায়ন না থাকায় ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ করা যাচ্ছে না। তাই সূত্রোক্ত আবেদন নথিজাতপূর্বক নিষ্পত্তি করা হলো। ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর এ আদেশে স্বাক্ষর করেন রমনা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপ্তিময়ী জামান। যার স্মারক সংখ্যা-সঃকঃ(ভূ)/রমনা/২০১৭-৬৩৫। এ আদেশের কপি আবেদনকারী ইকরাম ও বোরাক রিয়েল এস্টেটের নিযুক্ত আইনজীবী দেয়া হয়েছে। সেই সাথে এর অনুলিপি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঢাকার জেলা প্রশাসককেও দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট পিটিশন নং ১৩৫৩৩/২০১৭। যা গত ৫ নভেম্বর হাইকোর্টের নির্ধারিত বেঞ্চে শুনানি গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আদেশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে দেন।     
ওই জমির মালিক দাবিদার ইকরাম হাইকোর্টে আবেদন করেন ১০/০৭/২০১৬ ও ১৭/০৮/২০১৭ তারিখ। পরে ২৯ অক্টোবর বোরাক রিয়েল এস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ইকরামের পক্ষে মোহাঃ নূর আলী সংশ্লিষ্ট রমনার ভূমি অফিসে আবেদন করেন। কিন্তু লিজ ৩১ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও জমির নবায়ন না করায় এবং মো. ইকরাম ও নূর আলীর বৈধ মালিকানা না থাকায় অবৈধ ‘ইউনিক হাইটস’ ২০তলা ভবনের জমির নামজারি ও উন্নয়ন কর গ্রহণের আবেদন খারিজ করে দেয় ভূমি অফিস।
ভূমি অফিসের আদেশে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ১৯৮৬ সালের পর উল্লেখিত জমি বন্দোবস্তের ইজারা নবায়ন না করায় ওই জমি বর্তমানে সরকারের খাস জমি হিসেবেই বিবেচিত। এর কারণ, পাকিস্তান সরকার যার নামে ইজারা দিয়েছিল, সেই ব্যক্তি ও তার বৈধ কোনও ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী নেই। আর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ওই সম্পত্তি কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ইজারা দেয়ার রেকর্ডও নেই। অথচ সরকারের অতি মূল্যবান এই জমি ভূমি মন্ত্রণালয় ও রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ প্রভাবশালী কতিপয় ব্যক্তির যোগসাজশে ঘুষ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে একটি প্রতারকচক্র অবৈধভাগে ভোগ-দখল করে আসছে। এমনকি সেই জমিতে ২০তলা সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করে বেচা-বিক্রি চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র বলছে, এতে রাজউক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির প্রমাণ মিলে।
শীর্ষকাগজে সংবাদ প্রকাশের পর টনক নড়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের
‘জাল-জালিয়াতির জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে দেশের সুউচ্চ ভবন ইউনিক হাউটস’ শিরোনামে শীর্ষকাগজে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শীর্ষকাগজের গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ১৪তম বর্ষের ৩০তম সংখ্যার ওই প্রতিবেদনটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। পরে ১৯ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের খাস জমি-১ শাখা থেকে এ বিষয়ে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক মতামতসহ প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য নির্দেশ দেয়া হয় ঢাকা জেলা প্রশাসককে। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোঃ লুৎফর রহমান এ নির্দেশ দেন। যার স্মারক নং-৩১.০০.০০০০.০৪২.৪১.৯৯.১৭-৩৩২। কিন্তু এর পর প্রায় তিন মাস অতিবাহিত হলেও এ বিষয়ে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি।
প্রসঙ্গত, ডা. আব্দুল বাসেত ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। সেই সুবাদে ১৯৫৬ সালে তাকে ২৫ কাঠা আয়তনের বর্তমান রমনার কাকরাইল মৌজার ওই প্লটটি লিজ দেয়া হয়। যেখানে (বর্তমান বিটিসিএল হেড অফিসের সামনে) বোরাক রিয়েল এস্টেটের মাধ্যমে ২০ তলাবিশিষ্ট ‘ইউনিক হাইটস’ গড়ে উঠেছে। যদিও বিশেষ শর্তে ৩০ বছরের জন্য তৎকালীন ঢাকা জেলা প্রশাসক ২৫ কাঠা বা ০.৪১২৫ একর খাস জমির লিজ দলিল করেন। যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ৩১ বছর আগে। অপরদিকে, ওই লিজে শর্ত ছিল, নি¤œ তফসিলভুক্ত সম্পত্তি কিংবা উহার কোনও অংশ কোনও প্রকার হস্তান্তর করা যাবে না। এতে আরও শর্ত ছিল, নি¤œ তফসিলভুক্ত সম্পত্তি যে উদ্দেশ্যে লিজ দেয়া হয়েছে সেই উদ্দেশ্য ব্যতিত অন্য কোনও উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। লিজকৃত সম্পত্তি লিজদাতা অর্থাৎ সরকার প্রয়োজনে যেকোনো সময় ফেরত নিতে পারবে এবং লিজ গ্রহীতা উক্ত সম্পত্তির মালিকানা ও দখল হস্তান্তর করতে বাধ্য থাকবেন। অন্যথায় লিজদাতা অর্থাৎ সরকার লিজ গ্রহীতাকে উচ্ছেদ করে সম্পত্তির দখল গ্রহণ করতে পারবে। ১৯৮৬ সালে ওই লিজের কার্যকারিতা শেষ হলেও গত ৩১ বছরে লিজের কোনও নবায়ন হয়নি। ডা. আব্দুল বাসেতও এখন আর জীবিত নেই। তার বৈধ কোনও উত্তরাধিকারও নেই। কিন্তু জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মোঃ ইকরাম নামে এক ব্যক্তি ওই সম্পত্তি দানপত্রের মাধ্যমে মালিকানা দাবি করে আসছেন। যিনি ডা. বাসেতের ভাতিজা বলে দানপত্রে উল্লেখ রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ সরকারের আইন অনুযায়ী ভাতিজাকে দানপত্র দেয়ারও কোনও বৈধতা নেই। দানপত্রের ক্ষেত্রে আইনে ৮ জনের কথা বলা হয়েছে। তারা হলেন- মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, স্বামী ও স্ত্রী। তালিকায় ভাতিজা না থাকায় এ দানপত্রের কোনও আইনগত ভিত্তি নেই।
বোরাক রিয়েল এস্টেট এই সম্পত্তিতে ‘ইউনিক হাইটস’ নামে ২০তলাবিশিষ্ট সুউচ্চ ভবন নির্মাণের সময় সম্পত্তি সম্পর্কে যেসব কাগজপত্র তৈরি করেছে তাতে দেখা যায়, ১৯৮১ সালের ১৬ মার্চ ডা. আব্দুল বাসেত লিজ দলিলের শর্ত ভঙ্গ করে এই লিজ সম্পত্তি তার স্ত্রী বেগম সুফিয়া বাসেত ও ভাতিজা (ভাইয়ের ছেলে) মোহাম্মদ ইকরামকে (প্রত্যেককে সাড়ে ১২ কাঠা করে মোট ২৫ কাঠা) দান করেছেন। বর্তমানে যারা এই জমির মালিকানা দাবি করছেন, তাদের কাগজপত্রে আরও দেখা যায়, ডা. বাসেতের স্ত্রী বেগম সুফিয়া বাসেত মারা গেছেন ১৯৮৭ সালের ২০ জুলাই। এর আগে ১৯৮৬ সালের ১৫ মার্চ সুফিয়া তাকে দান করা সাড়ে ১২ কাঠা সম্পত্তি স্বামী আব্দুল বাসেতকে নোটারি পাবলিক তথা মৌখিক দানপত্রের মাধ্যমে পুনরায় ফেরত দিয়েছেন। সেই জমিও ডা. আব্দুল বাসেত ১৯৮৮ সালের ১৭ মার্চ ভাতিজা মোহাম্মদ ইকরামকে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে দান করেন। এভাবে পুরো সম্পত্তির মালিকানা বনে যাওয়ার ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে রেখেছেন ইকরাম। আর সেই ২৫ কাঠা জমি ইকরাম বোরাক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করেন। যাতে বিতর্কিত ‘ইউনিক হাইটস’ নামের বাণিজ্যিক ও আবাসিক ২০তলা ভবন তৈরি করে সরকারি সম্পদ লুটপাট চলছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ জানুয়ারি, ২০১৮ প্রকাশিত)