বুধবার, ২০-মার্চ ২০১৯, ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন

নির্বাচনী ইশতেহার: শিশুদের জন্য চাই সুনির্দিষ্ট ঘোষণা 

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৬:৩৮ অপরাহ্ন

মো. আমানুল্লাহ: শিশুরাই আগামীর কর্ণধার। তাদের সঠিক পরিচর্যাও অত্যন্ত জরুরি। জাতিসংঘ শিশু সনদ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু। সে হিসেবে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৪৫ ভাগই শিশু। এরমধ্যে সুবিধাবঞ্চিত, ছিন্নমূল শিশুর সংখ্যাও কম নয়। ফুটপাত- রেলস্টেশন থেকে বস্তি পর্যন্ত এদের ঠাঁই। ঝুঁকিপূর্ণ নানা কাজেও এদের পাওয়া যায়। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে- কুলি, হকার, ফুল বিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক, রিক্সা শ্রমিক, বুনন কর্মী, মাদক বাহক, বিড়ি শ্রমিক, ঝালাই কারখানার, প্লাস্টিক কারখানা ও এ্যালুমিনিয়াম কারখানার শ্রমিক ইত্যাদি। এছাড়াও আরো বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে তাদেরকে নিয়োজিত করা হয়। আবার অনেককেই শিশু বয়স থেকেই ধরতে হচ্ছে সংসারের হাল। মোটর, রিকশা, সাইকেল নির্মাণ, বিদ্যুৎ, ইটভাটা, চা ষ্টল, হোটেল, রেষ্টুরেন্টে, রাজমিস্ত্রীর সাহায্যকারী, ওয়েলডিং কারখানায়, গার্মেন্টস, জুটমিল, কৃষিসহ বিভিন্ন কাজে শিশুরা জীবন জীবিকার পথ খোঁজে। শুধু তাই নয় ট্যাক্সি, ম্যাক্সি, টেম্পু, মাইক্রোবাসের হেলপার, কেউ কাঠমিস্ত্রির সহকারীর কাজও করছে। অভাবের তাড়নায় শিশুরা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার ফলে ওদের জীবনে অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে ওদের শারীরিক, মস্তিস্ক গঠনেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নত হতে পারে না। মেরুদন্ডহীন মানুষ জড় পদার্থের ন্যায় অচল। অনেক কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কারখানার মালিকরা শিশুদের অল্প টাকার বিনিময়ে কাজ করায়। এতে অকালেই অনেক শিশুরা ঝরে পড়ে। এসব শিশুরা যদি শিক্ষার সুযোগ পায় তাহলে তারা ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে অবগত থাকত। তারা যে কোন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে সক্ষম হতো। আমাদের দেশে কত ছিন্নমূল শিশু রয়েছে যারা দুবেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারে না। সমাজের উঁচু তলার মানুষ থেকে ভিন্ন কিছু মানুষ রয়েছে। যাদের দিন কাটে অনেক কষ্টে। ঠিকমতো খাবার যোগাতে পারে না। তারা কিভাবে শিক্ষাগ্রহন করবে? যদিও সরকার বিনামূল্যে বই বিতরণ করছে, উপবৃত্তি দিচ্ছে। তারপরও শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে। ঝরে পড়া শিশুদের নিয়ে পাঠদান করছে রস্ক প্রকল্পের প্রায় ১০হাজারের অধিক আনন্দ স্কুল। ঢাকার দক্ষিন সিটি কর্পোরেশন এলাকায় পথশিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে ইসলামিক রিলিফ ওয়ার্ল্ডওয়াইড বাংলাদেশ। এছাড়াও সেভ দ্যা চিলড্রেন, ব্র্যাক, লিডো, আপন ফাউন্ডেশন, আলোর পথে নব যাত্রা (আপন), হিউম্যান সেইফটি ফাউন্ডেশন, শিশু তরী সংস্থা, জুম বাংলাদেশ, সেইভ দ্যা ফিউচার ছাড়াও বেশ কিছু এনজিও ঝড়ে পড়া শিশুদের পাঠদান করে মূলধারায় আনার চেষ্টা করছে। তবে এই সব শিশুদেরকে শিক্ষা দানের জন্য সরকারকে আরোও ভূমিকার রাখতে হবে। এসব শিশুর অভিভাবকদের দারিদ্র দূরীকরণে আয় বৃদ্ধিমূলক প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। উন্নত দেশে দেখা যায় যে, শিশুর সমস্ত দায়িত্ব রাষ্ট্র বহন করে। তেমনি আমাদের দেশের অবহেলিত শিশুদের সমস্ত দায়িত্ব রাষ্ট্র নিলে সমাজে আর কোন অরাজকতার সৃষ্টি হয় না। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিশুদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোগগুলো পরিকল্পনা করার সময় তাদের মতামত শোনা। অন্যদিকে বর্তমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। তার অন্যতম উদাহরণ সম্প্রতি ভিকারুননিসা স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রীর আত্মহত্যা। এ ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে স্কুল শিক্ষায় ছাত্র-শিক্ষক যে ঘনিষ্ট মানবিক সম্পর্ক তৈরী হওয়ার কথা, তা অনুপস্থিত ছিল। আন্দোলনের মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি কড়া ব্যবস্থা নিয়েছে যা সমসাময়িক যথেষ্ট মনে হলেও আসলে তা যথেষ্ট নয়। সরকারের উচিৎ চাপমুক্ত পরীক্ষার পরিবেশ তৈরী করা। শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক ভাল আচরণের মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করা। আদব-কায়দা ও শিষ্টাচার দ্বারাই শিশুরা প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়। শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য রাসূলে করীম (সাঃ) তাদের সঙ্গে কোমল ব্যবহার নিজে করেছেন এবং অন্যদেরও সদাচার করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি চাইতেন শিশুরা যেন কোন সময় কষ্ট না পায় বা নির্যাতনের শিকার না হয়। শিশুদের যে কোনো মৌলিক চাহিদা মেটাতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত যত্লশীল। কোন শিশু দুষ্টুমি করলে তিনি তাকে কড়া শাসন না করে হাসিমুখে শুধরানোর কৌশল গ্রহণ করতেন। শিশুদেরকে সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠা এবং তারা যাতে নির্যাতিত না হয় সে ব্যাপারে সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে নিঃস্বার্থভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। শিশুরা যেভাবে নির্যাতিত হচ্ছে সেই অমানবিকতার বিরুদ্ধে আমাদের সবারই সোচ্চার হওয়া দরকার। বিশেষ করে কিন্ডার গার্ডেন স্কুলগুলোতে বইয়ের ভারের শিশুদের মেরুদ- বেঁকে যাচ্ছে। এব্যাপারে শিক্ষকদের সচেতন হওয়া। আইনী প্রতিকারের দায়িত্ব সরকারের হলেও নির্যাতন, নিপীড়ন, সহিংসতা ও বর্বরতা থেকে শিশুদেরকে রক্ষা এবং আগামী দিনের সম্ভাবনাময়, চরিত্রবান নাগরিক তৈরীর দায়িত্ব আমাদের সবার। এছাড়াও যারা শিক্ষায় দূর্বল বা ঝরে পড়েছে তাদের খুঁজে বের করা। ঝরে পড়াদের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া। সামাজিক নিরাপত্তা জালে অভিভাকদের অন্তর্ভুক্ত করতে স্থানীয় সরকারের উদ্যোগ নেয়া। ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’ পিতা-মাতা, শিক্ষকবৃন্দের যেমন আছে, তেমনি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করে তা নিশ্চিত করা। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা। 
(প্রকাশিত মতামত একান্তই লেখকের নিজস্ব। শীর্ষ নিউজের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)