মঙ্গলবার, ২৩-অক্টোবর ২০১৮, ০৫:৩৬ অপরাহ্ন

সবাই জেগে উঠুক ভেজালের বিরুদ্ধে

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০৯:১০ পূর্বাহ্ন

মীর আব্দুল আলীম: ছোট বেলায় চাচা বলতেন,“বাবারে! কম খাবি তো বেঁচে যাবি।” আমার চাচার মতে, কম খাবারে কম ভেজাল; আর তাতেই তাঁর দৃষ্টিতে বেঁচে যাওয়া। তিনি বেঁচে নেই, অর্ধজীবন পার না করতেই ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। চাচা কথার মমার্র্থ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। যখন কলেজে পড়ি তখন এক বন্ধুর সাথে খুব ভাব হয়েছে আমার। সে ছিলো আমার জানের দোস্ত। ফুসফুসে ক্যান্সারে প্রাণের দোস্তটা সেদিন মারা গেছে। চলতি সপ্তাহে আমার এলাকার (নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ) এক সাবেক জনপ্রিয় ইউপি চেয়ারম্যান মোবাইলে কান্না জড়িত কন্ঠে আমার কাছে ক্ষমা চাইছিলেন। কি হয়েছে বলতেই তিনি জানালেন, ডাক্তার তাঁকে জনিয়েছেন, ৮০ ভাগ লিভারই নাকি নষ্ট হয়ে গেছে তাঁর। খাদ্যে ভেজালের জন্যই এমন হচ্ছে। ভেজালে ছেয়ে গেছে গোটা দেশ। বোধ করি খাদ্যে এমন ভেজাল আর কোনো দেশে নেই।
ভয় হচ্ছে; ভীষণ ভয়! আমিও ক্যান্সারে আক্রান্ত নইতো? পরিবারের সদস্যরা ভালো আছেনতো? পাঠক আপনারাই বা কতটা সুস্থ্য আছেন? সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করি আপনারা সুস্থ্য থাকুন। কিন্তু যেভাবে ভেজাল খাবার খাচ্ছেন তাতে কতদিন সুস্থ্য থাকবেন? এ প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ইন্সিটিটিউট তিন বছরের খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে ৫০ শতাংশ খাদ্যে ভেজাল পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার ওলিংগং বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে গবেষণা জরিপ করে দেখেছে যে, দেশের মোট খাদ্যের ৩০ শতাংশে ভেজাল রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার ৬৬ শতাংশ রেস্তোরার খাবার, ৯৬ শতাংশ মিষ্টি, ২৪ শতাংশ বিস্কুট, ৫৪ শতাংশ পাউরুটি, ৫৯ শতাংশ আইসক্রিম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি। এসব খেয়ে দেশের মানুষ আর সুস্থ্য নেই। গোটা দেশটাই অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে।
মাঝে মাঝে ভাবী, এসব কী হচ্ছে দেশে। সব শেষ হয়ে যাচ্ছে না তো? দশম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেটার মাথার চুলে চোখ পড়তেই চোখ যেন ছানাবড়া। সাদা চুলে আটকে গেল চোখ। অসংখ্য চুলে পাক ধরেছে। ভাগ্নেটার চোখে মোটা পাওয়ারওয়ালা চশমা। বিছানায় কাতরাচ্ছেন ক্যান্সারে আক্রান্ত চাচি। ক্যান্সারে মারা গেছেন বড় মামা, চাচা। লিভার নষ্ট হয়ে অকালেই দুনিয়া ছেড়েছেন ভগ্নিপতি। খাবারে ভেজালের জন্যই এমন হচ্ছে। মাছ, ফলমূল, তরকারিতে কোথায় নেই এই জীবনহন্তারক ফরমালিন। তেলে ভেজাল, এমনকি নুনেও ভেজাল। কেউ কেউ তো বলেনই বিষেও নাকি ভেজাল। তাই যা হওয়ার নয়, তাই হচ্ছে। কিডনি নষ্ট হচ্ছে, ক্যান্সার আর হার্টস্ট্রোকে অহরহ মানুষ মরছে। আমাদের অতি আদুরে সন্তানরা অকালে ঝরে যাচ্ছে এসব অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে। সব খাবারে মেশানো হচ্ছে বিষ। আর সেই বিষ খেয়ে আমরা আর বেঁচে নেই। জীবিত থেকেও লাশ হয়ে গেছি। এ যেন জিন্দা লাশ! রোগে-শোকে কয়েকটা দিন বেঁচে থাকা এই আর কি। প্রতিনিয়তই তো বিষ খাচ্ছি। দৈনিক পত্রিকায় আমার কলামে লিখেছিলাম, 'আমরা প্রতিজনে, প্রতিক্ষণে, জেনে শুনে করেছি বিষপান।' আরেকটি কলাম-'কত কিছু খাই; ভস্ম আর ছাই।' তাইতো খাচ্ছি আমরা। আর এ বিষ খেয়ে দেশের মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
এক গবেষণা সূত্রে প্রকাশ, রাসায়নিক ও বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতি বছর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন দুই লাখ মানুষ। দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় মারা যাচ্ছে ১৭ জনের বেশি রোগি। বছরে মারা যাচ্ছে দেড় লাখ মানুষ। আর ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতি বছর সর্বস্বান্ত হচ্ছেন দেশের শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ। দেশে দুই কোটিরও অধিক লোক কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় অকালে মারা যাচ্ছে পাঁচজন। প্রতি বছর গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিচ্ছে ৫ লাখ। বৎসরে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয় অনিরাপদ ভেজাল খাদ্য।
এমন চিত্র কতইনা ভয়ংকর। ভেজাল খাদ্যের কারণে আমাদের জীবন এখন প্রায় খাদের কিনারে। এখনও কি আমরা আর ঘাপটি মেরে বসে থাকতে পারি? যারা বিবেকবান তারা অন্তত চুপ করে থাকার কথা নয়। আমরা জানি, বিষ খেয়ে মানুষ মরছে; চুপ করে কি করে থাকি? যারা ভেজাল খাবার মুক্ত দেশ গড়ার ক্ষমতা রাখেন তারা কি করে চুপ থাকতে পারেন? মনে রাখবেন, আপনি, আমি, আমরা, আমাদের সন্তান, পিতা-মাতা, স্বজন কেউ এখন আর নিরাপদ নন। সব কিছু শেষ হয়ে যাবার আগেই আমাদের ভাবতে হবে। প্লিজ, প্লিজ আপনারা দেশের জন্য কিছু করুন। দেশের মানুষের জন্য কিছু করুন। তানা হলে যে, সৃষ্টি কর্তার দরবারে আপনারা একদিন জবাবদিহি করতেই হবে।
'মাছে-ভাতে বাঙালির মাছে ফরমালিন আর ভাতের চালে প্রাণঘাতী ক্যাডমিয়াম!' বাঙালি মাছ-ভাত খেয়েই বাঁচে। সে জায়গায়ও বিষের ছড়াছড়ি। খাদ্য যদি অনিরাপদ হয় তাহলে দেশের মানুষ কী খাবে? এ দেশে নিরাপদ খাবার আদৌ কি আছে? কেবল মাছ-ভাত নয়, সব খাবারই তো ভেজালে ভরা। ভেজাল খেয়ে গোটা জাতি আজ রোগাক্রান্ত। অথচ অতি সহজেই এ দেশকে ভেজালমুক্ত করা সম্ভব। এটা বলবই, সরকার সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা নেই তাই দেশ ভেজালমুক্ত হচ্ছে না। ভেজাল রোধে কোনো সরকারই সচেষ্ট নয়। ফরমালিনের বাপারে বর্তমান সরকার শুরুতে কঠোর মনোভাব দেখালেও এখন থমকে গেছে। তাই ভেজাল খাদ্যে ভরে গেছে দেশ। আমরা যা খাচ্ছি তার অধিকাংশই ভেজালে ভরা। সেদিন রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া এক ছাত্রের প্রশ্ন ছিল এমন- 'বাবা! কচুতে মাছি, ফলে নেই কেন?' বাবার কাছে প্রশ্নটা করলেও উত্তরটা কিন্তু তার ঠিকই জানা। লোভনীয় ফলে মাছি ভন্ভন্ করার কথা কিন্তু কোথাও মাছি নেই। সে জানে বিষাক্ত ফরমালিন আর কার্বাইডের কারণে মাছিরা উধাও। পত্রপত্রিকা আর টিভি দেখে সে এসব জেনেছে। তাই বাবার কাছে ছেলের এমন রহস্যজনক প্রশ্ন। পিতা এ প্রশ্নে কি উত্তর দেবেন? ঐ শিক্ষার্থীর এমন প্রশ্নের জবাব দিতেও বিব্রত পিতা।
খাদ্যে ভেজাল মানে তো বিষ খাওয়ানোর শামিল। হত্যাকান্ডের মত বিষয়। দেশে খাদ্য নিরাপত্তা আইন থাকলেও এর সঠিক বাস্তবায়ন নেই কেন? ভেজালের ব্যাপারে যথাযথ আইন প্রয়োগ করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক এক গবেষণার তথ্য মতে, এদেশের ৪০ শতাংশেরও বেশি খাবারে ভয়ংকর সব রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হয়। যারা ভেজাল মেশায় তাদের ধরে আইনের আওতায় আনতে হবে। খাদ্যে ভেজালে জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করতে হবে। সেই সঙ্গে অপরাধীদের ধরে সাজা নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ভেজালের বিরুদ্ধে সরকারকে আরও অনেক বেশি সচেষ্ট হতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে একজন স্যানেটারি ইন্সিপেক্টর দিয়ে কখনই ভেজাল রোধ হবে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের গতি বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও সকল পৌরসভা তথা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সকল স্যানেটারী ইন্সপেক্টরকে যুক্ত করলে অতি দ্রুত ভেজালের বিরুদ্ধে উদ্যোগটি সফলতার মুখ দেখবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি ও বেসরকারি যেসব সংস্থা খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছে তাদের পাশে নাগরিক সমাজকেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। এটাই এখন দেশের প্রধান কাজ হওয়া উচিৎ। মানুষ বাঁচলে তবেইতো দেশ। যারা রাজনীতি করেন তাদের বলবো, দেশের মানুষ যদি সুস্থ না থাকে, দেশের মানুষ যদি বেঁচে না থাকে কাদের নিয়ে রাজনীতি করবেন আপনারা? অপ্রিয় হলেও সত্য যে, আজ নিরাপদ খাবারের সংকট মহামারী আকার ধারণ করেছে, যার বিষাক্ত ছোবলে বাংলাদেশ জর্জরিত। মানুষ নিরুপায় হয়ে খাবারের নামে বিষ গ্রহণ করছে। এমন বিষাক্ত খাবার আমরা জেনে শুনে বুঝে দেশের মানুষকে খেতে দিতে পারি না। এ অধিকার আমাদের নেই।
আমাদের দেশে ভেজালের যে সর্বগ্রাসী আগ্রাসন তা থামছে না কেন? দেশে সরকার, পুলিশ প্রশাসন, আইন-আদালত থাকা সত্ত্বেও ভেজালের দৌরাত্ম্য কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না। 'নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩' হয়েছে তাতেও কিছুই এসে যায় না, ভেজালকারীদের দাপট চলছেই। এভাবেই কি চলবে? একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা সভ্যতার মাপকাঠিতে এদিক থেকে জংলি যুগের চেয়েও পিছিয়ে আছি। কারণ আর যাই হোক, জংলি যুগের অধিবাসীরা ভেজালের মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হওয়ার কথা ভাবতেও পারত না। প্রশ্ন হলো কেন ভেজাল খাচ্ছি? ভেজাল দিচ্ছে কেন? ভেজাল রোধ করতে পারছি না কেন? জঙ্গি দমন করতে পারছে সরকার, শত ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে পদ্মা সেতু করতে পারছে, মেট্রো রেলে চড়ার স্বপন দেখছি আমরা। সবই হচ্ছে ভেজাল কেন রোধ হচ্ছে না?
ভেজাল ঠেকাতেই দেশে বিএসটিআই রয়েছে (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন)। জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরাই বা কি করছে? এ বিভাগটির সুফল আশান্বিত হওয়ার মতো নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভেজাল ও অননুমোদিত খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন ও বিক্রির দায়ে বিএসটিআই মাঝেমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। আদায় করে লাখ লাখ টাকা জরিমানাও। কিন্তু তাদের এ কর্মকান্ড অনেকটাই লোক দেখানোর মতো। ভেজালের দায়ে অভিযুক্ত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই জরিমানা পরিশোধের পর সবাইকে ম্যানেজ করে আবারো সেই একই অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। বরং ওদের প্রশ্্রয়ে অপকর্ম বাড়ছে। ভুক্তভোগীরা এর জন্য বিএসটিআইকেই দায়ী বলে মনে করেন। নিধিরাম সর্দারের মতো শুধু মামলা দায়ের ও জরিমানা আদায়ের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা। ফলে ভেজালের কারবারিরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাই মাছে মিলছে বিষাক্ত ফরমালিন, ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফেন, প্রোফাইল প্যারা টিটিনিয়াম (পিপিটি) পাউডার, বিস্কুটসহ বেকারি দ্রব্যে রয়েছে বিষসমতুল্য রং আর মুড়িতে মেশানো হচ্ছে কৃষিকাজে ব্যবহৃত ইউরিয়া সার। এর বাইরেও রয়েছে নানা রাসায়নিক সংমিশ্রণের কারসাজি।
ভেজালের বিরুদ্ধে দেশে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়, সভা-সেমিনার হয়; কিন্তু ভেজাল রোধ হয় না কেন? এ বিষয়ে দেশে আইন আছে; সেই আইনে কারও কখনো শাস্তি হয় না। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারে কখনোই সচেতন হয়ে ওঠে না। জনগণও না। দেশে বছরজুড়েই নানা ইস্যুতে আন্দোলন হয়, হরতাল-অবরোধ হয়; কিন্তু ভেজালের বিরুদ্ধে কর্মসূচি দেয়া হয় না কখনো। আন্দোলন তো দূরের কথা ভেজালের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করে না কেউ। তাঁরা (রাজনৈতিকরা) চাইলে কয়েক মাসেই ৮০ থেকে ৯০ ভাগ খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সম্ভব। প্রকৃতই ভেজালকারীদের সংখ্যা এত বেশি যে, ভেজালের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আমাদের রাজনৈতিকদের উল্টো না ভেজালে জড়িয়ে পড়তে হয় এ ভয়ে হয়তো তারা একদম রা..(শব্দ) করেন না। ফলে আজ ভেজাল খেয়ে আমাদের এ কি অবস্থা! হাসপাতালগুলোতে কত ধরনের রোগ-বালাই নিয়েই না ছুটছে মানুষ। মানুষ যত না বাড়ছে তুলনামূলক হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ছে। যে উপজেলায় আমার জন্ম সেখানে ১০ বছর আগে ২ লাখ লোকের জন্য ছিল সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দুটি হাসপাতাল। এখন তিন লাখ লোকের জন্য হাসপাতাল গড়ে উঠেছে ১১টি। আমি নিজেও একটি হাসপাতালের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছি। গত দশ বছরে ঐ হাসপাতালের আয় ৪ গুণ বেড়েছে। এটা কিন্তু ভালো লক্ষণ নয়। রোগবালাই রেড়েছে তাই রোগির ভিড় বেড়েছে। এ কথা সত্য যে ভেজাল খেয়ে মানুষ শুধু অসুস্থই হচ্ছে না, প্রতিদিন মরছে অসংখ্য মানুষ। ভেজাল রোধ না হলে, খাদ্যে ভেজালের গতি এমনটাই যদি থাকে তাহলে যে হারে মানুষ মরবে তা শুধু দেশবাসিকেই নয়, যারা সারাবিশ্বে স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন তাদেরও মাথাব্যথার কারণ হবে।
প্রশ্ন হলো, কীভাবে ভেজাল রোধ করা যায়? মাত্র ৬ মাসের কর্ম-পরিকল্পনায়ই ৮০ ভাগ ভেজালমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব বলে আমরা মনে করি। কিন্তু কীভাবে?
(১) দেশে ভেজাল বিরোধী জাতীয় কমিটি গঠন করতে হবে। এ কমিটিতে সৎ এবং যোগ্য চলতি দায়িত্বে থাকা এবং অবসরপ্রাপ্ত আমলারা থাকবেন। অবসরপ্রাপ্ত সৎ ব্যক্তিদের এ কমিটির আওতাভুক্ত করতে হবে। আর এ দায়িত্ব হতে হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।
(২) খাদ্যে ভেজালে জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করতে হবে। সেই সঙ্গে অপরাধীদের ধরে সাজা নিশ্চিত করতে হবে।
(৩) প্রকাশ্যে সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। সাজা হতে হবে শারীরিক এবং আর্থিক। প্রয়োজনে মৃত্যুদন্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।
(৪) র‌্যাবে সৎ কর্মঠ অফিসারদের ভেজালের বিরুদ্ধে অতিরিক্তি দায়িত্ব দিয়ে ৬ মাস মাঠে রাখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভেজালের বিরুদ্ধে র‌্যাবকে মূল ভূমিকায় রাখা যায়।
(৫) ৬ মাস পরীক্ষামূলক প্রতিটি উপজেলায় বিশেষ ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যকর থাকতে হবে। এ ভ্রাম্যমাণ আদালত ভেজালবিরোধী জাতীয় কমিটি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে একজন ম্যাজিস্ট্র্রেটের পাশাপাশি র‌্যাব পুলিশের ভূমিকা রাখবে।
(৬) অন্য কোনো ইস্যুতে যেহেতু সম্ভব নয়, অন্তত দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য এবং জীবনের কথা ভাবনায় এনে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে ভেজালের ব্যাপারে প্রথমে ঐকমত্য হতে হবে। মাত্র ৬ মাস তারা এ বিষয়ে অন্তত সভা-সেমিনার বৈঠক এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেবে সরকার। অন্যান্য দলীয় রাজনৈতিকদেরও তাতে সম্পৃক্ত করতে হবে। সব দলই দলীয় অন্য কর্মসূচির পাশাপাশি ভেজালের বিরুদ্ধে অন্তত ৬ মাস মাঠে সরব থাকবেন। এ অবস্থায় ভেজাল রোধ হবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।
সভ্যসমাজে খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি একেবারে অকল্পনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে এটি নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, কোথায় ভেজাল নেই, সেটি নিয়েই এখন গবেষণা করা দরকার। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে বর্তমানে দেশে শুধু ক্যানসার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখেরও বেশি। ক্রমেই এ সংখ্যা বেড়ে চলছে। দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যানসার নিয়ে বর্তমানে মানুষের মনে একটা ভয় তৈরি হয়েছে; কারণ একটাই ভেজাল খাবার। ভেজাল খাবার গ্রহণের ফলে দেশে রোগবালাই যে বেড়েছে তা হাসপাতাল গুলোতে ঢুকলেই বেশ টের পাওয়া যায়। একদিকে দেশে দারিদ্র কমছে, অন্যদিকে ভেজাল বাড়ছে। ছয় বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। দেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা লোকের সংখ্যা কমতে কমতে এখন ১২ দশমিক ৯ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণ এখন একটু পয়সা বেশি দিয়ে হলেও নিরাপদ খাবার চায়। রাষ্ট্র কি আমাদের হাতে নিরাপদ খাবার তুলে দিতে পারছে? আমাদের দেশের কিছু অশুভ ব্যবসায়ী এবং কৃষকের অজ্ঞতার কারণে সেটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই অসম্ভবকেই সম্ভব করতে হবে সরকারকে। জনগণের হাতে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বও বটে। সরকারকে তা করতেই হবে। মানুষ না বাঁচলে দেশ দিয়ে কি হবে। অসুস্থ্য জনগণ নিয়ে সুস্থ্য দেশ কি করে আশা করি আমরা?
ভেজাল রোধের দায়িত্ব কেবল সরকারের তা ভাবলে কিন্তু চলবে না। এ দায়িত্ব আপনার, আমার, আমাদের, সকলের। আমরা কেন ভেজাল খাব? আমরা কেন ভেজাল দিব? ১৬ কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্য জোগান সরকারের একার পক্ষে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভেজালমুক্ত খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধানে আমদের সোচ্চার হতে হবে। কষ্ট লাগে তখনই যখন ভাবি, এত বড় একটা ইস্যু নিয়ে আমাদের দেশের কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। কেউ কিছু বলছে না। কেউ কেউ প্রতিবাদ করলেও তা মিনেমিনে প্রতিবাদ হচ্ছে। আমরা সবাই যেন গোগ্রাসে এসব ভেজাল খাবার গিলছি আর চিকিৎসকের কাছে গিয়ে নিজের জীবনের সঞ্চয়গুলো তুলে দিচ্ছি। সব সঞ্চয় শেষ করলেই কি রেহাল মিলবে? পরিবারকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়ে একদিন পাড়ি দেবেন অজানা দেশে।
এভাবেইতো চলছে আমাদের জীবন! এভাবে আর চলে না। আমরা নিরাপদ খাদ্য পেতে চাই; আমরা নিরাপদ খাদ্য আমাদের সন্তানের মুখে তুলে দিতে চাই। আপনারা, আমরা, এ রাষ্ট্র সম্মিলিত ভাবে জেগে উঠুক ভেজালের বিরুদ্ধে। “ভেজাল দেবনা, ভেজাল খাবনা, ভেজাল কারবারীদের আর রক্ষা নেই” এই হউক আমাদের আজকের শ্লোগান।
(লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ই-মেইল-হবংিংঃড়ৎব১৩@মসধরষ.পড়স)
শীর্ষনিউজ২৪ডটকম/ওআর