বুধবার, ২৪-অক্টোবর ২০১৮, ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন

ঘুষে সহনশীলতা ও শিক্ষামন্ত্রীর কৈফিয়ত

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারী, ২০১৮ ০৮:৪২ অপরাহ্ন

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা: গত ২৪ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সারাদেশেই আলোচনার ঝড় উঠেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, মন্ত্রী মহোদয় সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তাদেরকে সহনশীল পর্যায়ে ঘুষ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে ঘুষকে শুধু উৎসাহই প্রদান করা হয়নি বরং রীতিমত বৈধতাও দেয়া হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। যা রাষ্ট্রের একজন নির্বাহীর জন্য মোটেই শোভনীয় হয়নি। তিনি এও নাকি বলেছেন, শুধু অফিসাররাই চোর নন বরং মন্ত্রীরাও চোর। যা বর্তমান সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকে রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এমনকি তিনি নিজেও চোর তার আত্মস্বীকৃতি রয়েছে তার বক্তব্যে। ফলে আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রের ভয়াবহ চিত্রটি শুধু জাতির সামনে নয় বরং বিশ্ব দরবারেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়টি স্বাধীনতার প্রায় ৫ দশক পরেও অধরাই রয়ে গেছে। বিষয়টি যদি ক্ষমতাসীনদের বাইরের কারো বক্তব্য থেকে প্রকাশ পেত তাহলে এসব কথার কথা বা বিরোধীতার খাতিরে বিরোধিতা বলার সুযোগ থাকতো। কিন্তু খোদ একজন মন্ত্রীর মুখ থেকে এমন খেদোক্তিকে একেবারে হালকাভাবে দেখার মত কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।  
বিষয়টি নিয়ে সারাদেশে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে বা এখনও হচ্ছে। কিন্তু বিপক্ষের তোপের মুখে পক্ষের লোকেরা খুব একটা সুবিধা করতে পারেন নি। কারণ, বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী মহোদয়ের আত্মস্বীকৃতি রয়েছে। তাই কথামালার ফুলঝুড়িতে তা যতই হালকা করার প্রয়াস চালানো হোক না কেন তা কোন মহলের কাছেই গ্রহণযোগ্য হওয়ার সুযোগ থাকছে না।  মন্ত্রীবরের এমন বক্তব্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা  যখন তুঙ্গে তখন তার নিরবতা পালনও বিষয়টিকে জোড়ারো ভিত্তি দিয়েছে। কয়েকদিন এ বিষয়ে তিনি কোন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি। যা প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতাই প্রমাণ করে।
তবে তার এ নীরবতা বেশীদিন স্থায়ী হয়নি বরং ২৭ ডিসেম্বর সচিবালয়ের নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে তার এই বক্তব্যের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দিয়ে দাবি করেছেন যে, কতিপয় গণমাধ্যমে তার বক্তব্য খন্ডিতভাবে প্রকাশিত হওয়ায় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে।  সেই বিভ্রান্তি দূর করতেই মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। এসময় তিনি দুটি বিষয়ের লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনও জবাব দেননি বলে জানা গেছে। যা তার অবস্থানের বিষয়ে নতুন করে প্রশ্নে সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ এই প্রেস ব্রিফিংকে মন্ত্রী মহোদয়ের মুখ রক্ষার ব্যর্থ চেষ্টা বলতে কসুর করছেন না।
আত্মপক্ষ সমর্থন করে লিখিত বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘গত ২৪ ডিসেম্বর শিক্ষা ভবনের একটি অনুষ্ঠানের সংবাদ বেশিরভাগ গণমাধ্যমে যথোপযুক্তভাবে তুলে ধরা হলেও কতিপয় পত্রিকা ও অনলাইন মিডিয়ায় আমার বক্তব্য খন্ডিতভাবে প্রকাশিত হওয়ায় জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তা থেকে মতামতও জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।’
২৪ ডিসেম্বর দেওয়া বক্তব্যে ‘মন্ত্রীরা চোর, আমিও চোর' এই কথার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “বিএনপি-জামায়াতের সময় আমরা শুনতাম ডিআইএ কর্মকর্তারা স্কুল পর্যায়ে ভিজিটে গিয়ে ঘুষ খেতেন। মন্ত্রী পর্যায়ে ঘুষ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। সে কারণে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে ধারণা ছিল, মন্ত্রীরা চোর, আমিও চোর। এটাই আমি বোঝাতে চেয়েছি।"
আর সহনশীল মাত্রায় ঘুষ খাওয়ার কথার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের সময় ঘুষ এত বেশি পরিমাণে লেনদেন হত যে মানুষ অতীষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। ফলে শিক্ষকরা বলতেন, ঘুষ খাবেন কিন্তু একটু সহনীয় হলে আমরা পরিবার নিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারি। সেই কথাই উদাহরণ হিসেবে এটা আমি বলেছিলাম। কিন্তু আমার সেই উদাহরণকে গণমাধ্যম খন্ডিতভাবে তুলে ধরেছেন।’
আমাদের দেশের রাজনীতিতে একটা অপসংস্কৃতি অনেক আগেই চালু হয়েছে। দেশের মানুষ জাতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ বা বক্তব্য আশা করলেও ক্ষেত্র বিশেষে বা কতিপয় রাজনৈতিক আচরণে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই হতাশ হয়েছি। অবিবেচনা প্রসূত ও লাগামহীন বক্তব্য দেয়া এবং বেকায়দা হলে এর জন্য গণমাধ্যম বা গণমাধ্যমকর্মীদের দায়ী করা আমাদের দেশের একশ্রেণির রাজনীতিকের রীতিমত মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছে। এর আগে সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী প্রয়াত সৈয়দ মহসীন আলী লাগামহীন বক্তব্য দিয়ে তোপের মুখে পড়ে গণমাধ্যমকর্মীদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ছেড়েছিলেন। এমনকি মন্ত্রী মহোদয় সাংবাদিকদের খবিশ, লম্পট, চরিত্রহীন আখ্যা সহ তাদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত আদালতের রায় নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে তোপের মুখে তার বক্তব্য বিকৃত করার জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের দায়ী করেছিলেন। শিক্ষামন্ত্রীর সর্বসাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিং শুধু অতীতের ধারাবাহিকতা মাত্র।  
যাহোক শিক্ষা মন্ত্রী দুর্নীতি বিষয়ক আত্মস্বীকৃতি ও তৎপরবর্তীতে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রেক্ষাপটে ‘শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ আসলে কী বলেছিলেন !’  শিরোনামে একটি প্রথম শ্রেণির জাতীয় দৈনিকে তার বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত বিবরণ থেকে জানা যায় সেদিন মাননীয় মন্ত্রী দীর্ঘ বক্তৃতায় যা বলেছিলেন গণমাধ্যমে তা খন্ডিতভাবে প্রকাশিত হলেও তার বক্তব্য প্রায় অবিকৃতভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। ফলে তার বক্তব্যের ধারাবাহিকতা মোটেই ক্ষুন্ন হয়নি বা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের বিকৃতি ঘটেনি।  জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর মতে, সেদিন তিনি তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘......আমি সব জায়গায় এমনকি মন্ত্রণালয়ে যোগ দেয়ার প্রথম দিন থেকেই বলে আসছি, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। অপচয় বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি থাকবে। কিন্তু ইইডির ব্যাপারে আমি বলছি, দয়া করে আপনারা ভালো কাজ করবেন, আপনাদের কাছে অনুরোধ, আপনারা ঘুষ খাবেন, কিন্তু সহনশীল হয়ে খাবেন। কারণ, আমার ওই সাহসই নাই বলা যে আপনারা ঘুষ খাইয়েন না...’।
‘......বুদ্ধিমান লোক তো জমি কিনে রাখছে পরে জমির দাম বাড়ছে তারপর বাড়ি বানাইছে। নানা জায়গায় এরকম হইছে, সব জায়গায় এ রকম হইছে। খালি যে অফিসার চোর তা না, মন্ত্রীরা চোর, আমিও চোর। আমি না হলেও দুনিয়াটা এভাবে চলে আসছে। এই অবস্থার মধ্যে আমাদের সবাইকে পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের খারাপ যে দিকগুলো সেগুলো ত্যাগ করতে হবে, ভালো দিকগুলো ফুটিয়ে তুলতে হবে।........’
মন্ত্রী মহোদয়ের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং জাতীয় দৈনিক প্রকাশিত তার বক্তব্যের পূর্ণ বিবরণ পর্যালোচনা করলে এতদোভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন বেশ কষ্টসাধ্যই বলতে হবে। কারণ, যে প্রেক্ষাপটে এবং যে প্রসঙ্গেই তিনি এসব কথা বলুন না কেন তিনি যে ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে সহনশীলতার আহবান জানিয়েছেন এতে সন্দেহ করলে তা সত্যের অপলাপই বলতে হবে। আর ‘ শুধু অফিসাররাই চোর নন, মন্ত্রীরাও চোর; এমনকি আমিও চোর’ এমন বক্তব্যের বিষয়েও মন্ত্রী মহোদয়ের আত্মপক্ষকে স্বীকৃতি দেয় না। অভিজ্ঞমহল মনে করছেন মন্ত্রী মহোদয় ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র চেষ্টা না করে বরং তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিলেই ভাল  করতেন। এ ধরনের নজীর তার সরকারের মধ্যেই রয়েছে। তিনি তার সহকর্মীর অনুসৃত নীতি গ্রহণ করলে দেশের মানুষ সেটিকে অনাকাঙ্খিত ভুল বলেই বিবেচনা করতেন। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বিষয়টিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।  
মন্ত্রীবরের এমন বক্তব্যকে সরকারের পক্ষেও সমর্থন করা হয়নি। তিনি তার মন্ত্রণালয়ে প্রেসব্রিফিং এ আত্মপক্ষ সমর্থন করে যে বক্তব্য দিয়েছেন এ বিষয়ে  সরকারের বা দলের কোন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি বরং এলজিআরডি মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন শিক্ষা মন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেছেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী চোর হতে পারেন কিন্তু আমরা কেউ চোর নই’। এলজিআরডি মন্ত্রীর এমন বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে দল বা সরকারও একমত নয় বরং শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে সরকার প্রধান ও সরকারকেই বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে এবং সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।  
মূলত দেশে যে অবক্ষয়ের জয়জয়কার চলছে তা জোরেসোরে চাউর হলেও কোন সরকারই তা স্বীকার করতে চায়নি। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের কতিপয় মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বিষয়টি সুষ্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বস্তুত অপরাধ প্রবণতা অতীতে ছিল, এখনও আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হলো তা নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু সরকারের একশ্রেণির কর্তাব্যক্তিদের আচরণে একথা বলার সুযোগ থেকে যাচ্ছে যে, সরকার সে জাতীয় দায়িত্ব পালন না করে বরং নিজেরাই অবক্ষয়, দুর্নীতি ও অনিয়মকে উস্কে দিচ্ছেন। এমনকি এসব এখন আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। শিক্ষামন্ত্রীর সরল স্বীকারোক্তি এর জ¦লন্ত প্রমাণ। শুধু শিক্ষামন্ত্রী নন বরং এর আগে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে টিআর ও কাবিখার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছিলেন। যা ক্ষমতাসীনদের বেশ বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। তথ্যমন্ত্রী সহকর্মীদের বেশ রোষানালেও পড়েছিলেন।  অবশ্য তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়ে বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু এর মাজেজাটা কারো কাছে অপ্রকাশ্য থাকেনি। দেশের মানুষ যা বোঝার তা অবশ্যই বুঝে ফেলেছেন।
এখানেই শেষ নয়। এর আগেও বর্ষীয়ান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত  ঘুষের পক্ষে সাফাই গেয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন। ঘটনাটা ছিল ২০১৪ সালের নভেম্বরের। তখন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন, স্পিড মানি মানে ঘুষ দেওয়া অবৈধ নয়। রিকশায় চড়ে টাকা দেওয়াটা বৈধ এবং কারো কাজ দ্রুত করে দিয়ে, উপহার নিলে সেটা অবৈধ মনে করা হয়। কিন্তু আমি মনে করি, কাজ দ্রুত করায় যদি কেউ কাউকে উপহার হিসেবে কিছু দেয় তবে তা অবৈধ নয়। উন্নত দেশে এটার বৈধতা দেওয়া হয়েছে ভিন্ন নামে। তারা এটার নাম দিয়েছে ‘স্পিড মানি’।’
দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব হলেও সরকার বোধহয় সে দায়িত্ব পালনে প্রায় ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে। দেশে অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হলেও সরকারের একশ্রেণির কর্তাব্যক্তিরা দুর্নীতি ও অনিয়মকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশে যেমন অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে, ঠিক তেমনিভাবে পুরো সরকারই বিতর্কিত হচ্ছে। জাতিকে আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জমান করতে একশ্রেণির নব্য আওয়ামী লীগারদের অব্যাহত প্রণোদনা প্রমাণ করে এর পেছনে অবশ্যই খারাপ কোন উদ্দেশ্য আছে। কারণ, জনগণকে অবৈধ উপার্জনে জড়িয়ে ফেলতে পারলে নিজেদের অপরাধের দায়টা কিছুটা হলেও লঘু হয়ে যায়। একজন দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি কখনোই অন্যের অন্যায়ের সমালোচনার সাহস দেখায় না। যদি দেখানোর সাহস দেখায় তবে দুর্নীতির প্রমাণ উপস্থাপন করে খুব সহজেই তাকে ঘায়েল করা সম্ভব হয়। যার সর্বশেষ প্রমাণ দিয়ে গেলেন সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
দেশে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া যেমন দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর নয়, ঠিক তেমনিভাবে তা সরকারের জন্যও বেশ বিব্রতকর। মূলত ১৯৯৬-২০০১ সালের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগ সামাল দিতে না পারায় ২০০১ সালের নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল তাদেরকে। আবার ২০০৯-২০১৪ সালের মহাজোট সরকারকেও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল প্রধানত দুর্নীতির লাগাম টেনে না ধরার কারণেই। ২০১৩ সালের বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিপর্যয় যেভাবে বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে একটা জনসমর্থনের জোয়ারের আভাস দিয়েছিল, তার সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বিরোধী দলগুলো। ফলে যা হবার তাই হয়েছে।
নিকট অতীতে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়ার কুখ্যাত একনায়ক সুহার্তোর ৩৩ বছরের অপশাসনের অবসানের পর তাঁর পরিবার ও আত্মীয়স্বজন এবং সরকারের মন্ত্রী ও জেনারেলদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের দুর্নীতি ও লুটপাটের যে ভয়াবহ প্রামাণ্যচিত্র বিস্তারিত দলিলসহ বিশ্বের সামনে উদ্ঘাটিত হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই উন্নয়ন-তত্ত্বে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ ধারণাটির অবতারণা করা হয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশের ৪৩ বছরের ইতিহাসে ক্ষমতাসীন প্রতিটি শাসক এ ধরনের ‘স্বজনতোষী পুঁজিবাদেরই’ পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছে, কোনো ব্যতিক্রমী নেতৃত্ব পাওয়ার সৌভাগ্য আজও এ জাতির ভাগ্যে জোটেনি। ফলে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্নগুলো আজও অনেকটাই অধরায় থেকে গেছে।
 গত আট বছরের ট্র্যাক রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন নেতাদের  আত্মীয়স্বজন এবং দলীয় নেতারা ও তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত ভাগ্যবান ব্যবসায়ীদের অবিশ্বাস্য ধন-দৌলত অর্জনের যে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো জনগণ জানে না মনে করার কারণ নেই। ব্যাংকের মালিকানা বণ্টন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বণ্টন, ঠিকাদারির টেন্ডার নিয়ে কাড়াকাড়ি, যত্রতত্র দখলদারি, চাঁদাবাজির স্মৃতি এখন জনমনে একেবারেই তরতাজা! কিন্তু সরকার এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি বরং এমন কিছু করেছে যা পরোক্ষভাবে অপরাধ ও অপরাধীদেরই পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। ফলে এসব দুর্নীতির নেতিবাচক প্রচারণার মোকাবিলায় সরকারের গত আট বছরের সাফল্যগুলোকেও ম্লান করে দিয়েছে।
মূলত সরকারের একশ্রেণির মন্ত্রীর অতিকথন মাঝে মধ্যেই সরকারকে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। অগ্রপশ্চাদ বিবেচনা না করে লাগামহীন বক্তব্য নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি করছে। এর আগে সাভারের সরকার দলীয় একজন এমপি ক্রসফায়ার সম্পর্কে বক্তব্য দিয়ে শুধু দেশে নয় বরং সারা বিশ্বেই হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে বেশ আলোচনায় এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। একই ধারাবাহিকতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং সবশেষে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ সেপথই অনুসরণ করলেন। সরকারের এসব কর্তাব্যক্তিদের এমন সব বক্তব্য অনকাঙ্খিত ও ক্ষমতাসীনদের জন্য বিব্রতকর হলেও তা পুরোপুরি উপেক্ষা করার মত মনে করছেন না অভিজ্ঞমহল। তারা মনে করছেন এসব সরল স্বীকারোক্তির মধ্যে একটা রূঢ় বাস্তবতাও থাকতে পারে। তারা মনে করেন শিক্ষা মন্ত্রীর বক্তব্যে ঘুষকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে কিন্তু তার কৈফিয়তটা গণমানুষের কাছে খুব একটা গ্রহণযোগ্য হয়নি।
[email protected]